চাণক্য নীতির মতে সফল হতে হলে কি কি উপায় অবলম্বন করা উচিৎ

চাণক্য নীতির মতে সফল হতে হলে কি কি উপায় অবলম্বন করা উচিৎ

 চাণক্য কে ভারতীয় ইতিহাসের সব থেকে বড় ডিপ্লোম্যাট অর্থাৎ কূটনীতিক হিসেবে এখনো মনে করা হয় । তিনি অনেক বড় পন্ডিত, কূটনীতিক, দার্শনিক এবং অর্থনীতিবিদ ছিলেন । চাণক্যের শিক্ষার বর্ণনা চাণক্য অর্থশাস্ত্র-এ আছে । আজও অনেক ইউনিভার্সিটি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থশাস্ত্র সিলেবাসে পড়ানো হয় মহান পণ্ডিত চাণক্যের নীতি । মৌর্য রাজবংশের উৎপত্তি এবং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-র রাজা হওয়ার পেছনে সব থেকে বড় অবদান ছিল চাণক্যের । তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ছিলেন এবং একটি বই লিখেছিলেন । যার নাম “চাণক্য নীতি” (chanakya niti)  । এই “চাণক্য নীতি” –তে ১৭ টি অধ্যায়ে রয়েছে এবং সেখানে অনেক কিছুর মধ্যে জীবনে চলার পথের উপযোগী বেশ কিছু নীতির কথা বলা হয়েছে । 

 আচার্য চাণক্য বলেছেন- একজন মানুষকে কখনো খুব বেশি সৎ হওয়া উচিত না । আচার্য চানক্য এই নীতিতে বোঝাতে চেয়েছেন, একজন ব্যক্তি যদি খুব সহজ এবং সৎ হয়, তাহলে তাঁর চারপাশে ঘুরে বেড়ানো মুখোশধারী লোকেরা সবার প্রথমে তার ক্ষতি করবে । সৎ ব্যক্তি সবার সাথে বিনা স্বার্থে মেশে এবং বিনা দ্বিধায় তাদের সাহায্য করে ও তাদের আপন করে নেয় । অসৎ লোকেরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে । প্রয়োজন হলে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ক্ষতি করে । আচার্য চাণক্য এটা বলছেন না যে, আমাদেরকে অসৎ হতে হবে । তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, যারা মিথ্যা ছলনা করে, যারা ধান্দাবাজ, সেরকম লোকেদের সাথে কখনো সৎ ভাবে মেলামেশা করা উচিত না । তাদের সাথে গোপনে ব্যবসা বা কোন প্রকার লেনদেন, এমন কি প্রেম ভালোবাসা করা উচিত না । কারণ, তারা যেকোনো সময় বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে।

 আচার্য চাণক্য বলেছেন আমাদের সমস্ত গোপনীয়তা কখনো কারো সাথে শেয়ার করা বা বলা উচিত না । সে যদি খুব কাছের মানুষও হয় তাহলেও না । কারণ, আমরা যদি সেই কথা শুধুমাত্র নিজের ভেতরের না রাখতে পারি, তাহলে সেই দ্বিতীয় জনের উপরে কি ভরসা রয়েছে ? কি গ্যারান্টি আছে যে, সে কথাটি শুধুমাত্র নিজের ভিতর রাখবে । নিজের গোপন কথা অন্যকে বলার ভুল ধ্বংসের কারণ হতে পারে । আমরা অনেকেই, আমাদের ভিতরে জমে থাকা গোপন কথা স্পেশাল বা বিশেষ কারো সাথে অথবা খুব কাছের কেউ এর সাথে বিশ্বাস করে প্রকাশ করে ফেলি । বলার সময় আমরা ভাবি, তারা হয়তো কথাগুলো কাউকে বলবে না । কিন্তু সবাইকে ভরসা করা উচিত না । কারণ, তারা আপনার গুপ্তকথা অন্যদের বলে দিতে পারে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই ঘটে । যার ফলে আপনার সম্পর্কে অপরের কাছে নেগেটিভিটি প্রকাশ পাবে এবং আপনার সেই দুর্বলতা নিয়েই আপনাকে ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে । তাই, সব সময় নিজের সিক্রেটস নিজের মধ্যেই রাখা ভালো ।

 এছাড়াও আচার্য চাণক্য বলেছেন, কখনোই কারো সাথে নিজের কাজ অথবা যে কাজ করতে চলেছেন তা শেয়ার করবেন না । যা করতে যাচ্ছেন তা গোপন রাখুন যতক্ষণ না কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত । কারণ আপনি যে কাজটি করতে চলেছেন তাতে অপরে সেই কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে । আপনাকে ডিমোটিভেট করে আপনার কাজটি বন্ধ করার চেষ্টাও করতে পারে । প্রায় সব লোক অন্যদের কাজে বা সফলতায় জেলাস ফিল করে । মোটামুটি ভাবে তারা কখনোই চায় না, আপনি যে কাজটি করতে চলেছেন, তাতে আপনি সফল হন । তাই যা করতে যাচ্ছেন, তা শুরু করার আগে, ভালো করে ভেবে চিন্তে, ধাপে ধাপে এগোন ভাল । এছাড়া মনের কথা নিজের মধ্যে রাখো ভাল । যখন কাজটিতে সফল হবেন, তখন সবাই এমনিতেই আপনার কাজের ব্যাপারে জানতে পারবে । সুতরাং কাউকে আগে থেকে বলার প্রয়োজন নেই আপনি কি করতে চলেছেন ।

 আচার্য চাণক্য বলেছেন, প্রতিটি বন্ধুত্বের পিছনে কোন না কোন রকম self-interest বা স্বার্থ অবশ্যই থাকে । এরকম কোনো বন্ধুত্ব নেই, যেখানে self-interest বা স্বার্থ নেই । এটা বাস্তব এবং সত্যি । একটি কথা, বেশিরভাগ লোক নিজের স্বার্থের জন্য আপনার সাথে বন্ধুত্ব করবে । যখন আপনি কাউকে নতুন বন্ধু বানান, তখন ঠিক বোঝা যায় না, এই বন্ধুত্বের পেছনে ঠিক কি স্বার্থ রয়েছে ? কিন্তু যদি একটু ধ্যান দেওয়া যায়, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আপনার বন্ধু আপনার কাছে ঠিক কী চায় ? একটু লক্ষ্য করলে ধীরে ধীরে তাদের উদ্দেশ্য আপনার সামনে আসবে । তবে এটা বলছি না যে, আমাদের কারো সাথে বন্ধুত্ব করা চলবে না । সমাজে বসবাস করা এবং থাকতে গেলে নিশ্চয়ই বন্ধুত্ব করতে হবে । তবে করার আগে অপরের স্বার্থের দিকে খেয়াল রাখতে হবে । কখনোই কাউকে খুব বেশি বিশ্বাস করা বা পুরোপুরি ভরসা করা উচিত নয় । আমরা অনেক সময় খুব বেশি ভরসা করে আমাদের সব মনের কথা অন্যকে বলে ফেলি এবং শেষে তারা সেই কথা ধরেই আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে । তাই বন্ধুত্ব করুন, তবে কাউকে খুব বেশি বিশ্বাস না করে ।

 আচার্য চাণক্য বলেছেন, যে আপনার সামনে মিষ্টি কথা বলে এবং পেছনে আপনার বদনাম করে, সেরকম লোকেদের থেকে দশ হাত দূরে থাকা উচিৎ । কারণ তারা হল একটি বোতলে থাকা বিষ । এই রকম লোকেরা আপনার সামনে মধুর হাড়ি রাখলেও পিছন থেকে ছুরির আঘাত হানতে পারে । তারা পেছেনে বদনাম করবে এবং সবার কাছে আপনার ইমেজ ডাউন করার চেষ্টা করবে । এছাড়া বিশ্বাসঘাতকতা করার কথা না হয় বাদই গেল । তাই সেরকম বন্ধুর থেকে সবসময় দূরে থাকুন । তাদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখাই ভালো । কারন, তাহলে তারা আপনার সাথে কথা বলার সুযোগ পাবে না এবং আপনার বদনাম করতে পারবে না ।

নীতি শাস্ত্রে আচার্য চাণক্য বলেছেন, যদি আমাদের সামনে একজন দুষ্ট ব্যক্তি এবং একটি সাপ থাকে, তাহলে আমাদের সেই সাপটির কাছে যেতে হবে । কারণ সেই সাপ শুধু তার নিজের আত্মরক্ষার জন্য দংশন করে । দুষ্ট ব্যক্তি, যে কোন সময় সুযোগ পেলে, আমাদের ক্ষতি করবে । তারা সেই সুযোগের আশাতেই বসে থাকে । একটা জিনিস, যা আমাদের মানুষদের, অন্যান্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে, তা হল, আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা । আমাদের চিন্তা দুই ধরনের হয় – ভালো চিন্তা এবং খারাপ চিন্তা । যাদের মাথায় সবসময় খারাপ চিন্তা থাকে, তারা সব সময় তাদের আশে পাশের লোকদের কি ভাবে ক্ষতি করা যায়, সেটাই ভাবে এবং ক্ষতিও করে । তাই আপনি যদি একজন দুষ্ট ব্যক্তিকে নিজের সাথে রাখেন, তাহলে সেই ব্যক্তি আপনার ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজবে এবং আপনার ক্ষতি করবে ।

গুরু চাণক্য আরও বলেছেন, যে সাপের বিষ নেই, সেই সাপের উচিত, তার কাছে বিষ রয়েছে সেটা দেখানো । সাধারণত, যারা শক্তিশালী হয়ে থাকে, তারা দুর্বলের উপর নিজের শক্তির প্রকাশ করে এবং তাদের ছোট করার চেষ্টা করে । এটা থেকে আমাদের একটা শিক্ষা পাওয়া যায়, দুর্বল হওয়ার মধ্যে কোনো খারাপ কিছু নেই । তবে কখনোই নিজের দুর্বলতা কারো সামনে নিয়ে আসবেন না । কারণ যদি কেউ আপনার দুর্বলতার বিন্দুমাত্র আভাস পায়, তাহলে সে আপনার দূর্বলতাকে ব্যবহার করে আপনাকে সবার সামনে ছোট করার চেষ্টা করবে । তাই আপনি কোন কাজে অভিজ্ঞ না দুর্বল, সেটা অপরকে বুঝতে না দেওয়াই শ্রেয় । কেউ যদি আপনার দুর্বলতা নিয়ে মজা করে, অপমান করে ছোট করে, তাহলে তার বিরোধিতা করুন । এর ফলে সামনের জনের মন ভেঙ্গে যাবে । বুঝতে পারবে আপনাকে অপমান করা বা ছোট করা ঠিক না । পরবর্তী কালে আপনাকে ছোট করতে দু বার ভাববে ।

খারাপ লোক আর কাটা এক ধরনের হয় । তাদের উভয়ের ধর্ম এক । যেভাবে কাটা আমাদের পায়ের নিচে ফুটলে, আমাদের ব্যথা লাগে, আমরা আহত হই এবং আমাদেরকে আগে চলতে বাধা দেয় ঠিক সেই প্রকার, খারাপ ও দুষ্ট ব্যক্তি আমাদের ক্ষতি করে, সফলতার রাস্তায় বাধার সৃষ্টি করে । আমাদের সফল হতে দেয় না । সেই সমস্ত লোকের সাথে থাকলে সবসময় আপনার ক্ষতি করবে । সেই সমস্ত লোকেদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া উচিৎ আপনি দুর্বল না । তবে ভাল পথ হল তাদের এড়িয়ে যাওয়া । পাশাপাশি তাদের হিংসা না করে, তাদের থেকে দূরে থাকা । তাহলে তারা আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না ।

 আচার্য চাণক্য বলেছেন, একজন মূর্খ ব্যক্তির সাথে আমাদের কখনোই বন্ধুত্ব করতে নেই । কারণ, তারা সেই সমস্ত দু’পায়ে ভর দিয়ে চলা পশু, যারা তাদের নিচু এবং বোকার মত কথা বলে আমাদের মনে আঘাত করে । অল্প জ্ঞান অথবা কোন জ্ঞান না থাকায় তারা কখনোই আপনার ভাবনা চিন্তা কে বুঝতে পারবে না । আপনার ভালো কথাকে অন্য কিছু ভেবে, নিজের ছোট মনে বিচার করে, খারাপ ভাষায় আপনাকে অপমান করবে । তাই মূর্খ ব্যক্তিকে তার নিজের ভালোর জন্যে হলেও কোন ভালো কথা বললে, সেই কথাকে খারাপ ভেবে আপনাকে অপমান করে আপনাকে কষ্ট দেবে । তাই আচার্য চাণক্য বলেছেন, বন্ধুত্ব সব সময় নিজের মতন, নিজের লেভেলের কারো সাথে করা উচিত । এমন লোক বাছা উচিৎ যারা আপনার চিন্তা, কথা বোঝার ক্ষমতা রাখে । যদি একজন মূর্খ ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব করেন, তাহলে অপমান আর দুঃখ-কষ্ট ছাড়া কিছুই পাবেন না ।

 পরবর্তী নীতিতে আচার্য চাণক্য বলেছেন, সবসময় অপরের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করা ভাল । কারণ আমাদের কাছে এত সময় নেই, যে আমরা প্রথমে ভুল করব এবং পরে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজটি করব । যদি আপনি এটা ভেবে থাকেন যে, জীবনের প্রতিটি শিক্ষা, নিজের থেকে শিখবেন, তাহলে আপনার ভাবনায় অনেক ভুল আছে । যদি আপনি আপনার নিজের ভুল থেকে শিক্ষণীয় কিছু শিখতে চান তাহলে আপনি হয়তো সেই বয়সে গিয়ে সব কিছু বুঝতে পারবেন, যখন আর কিছু করার মতো শক্তি ও সময় থাকবে না আপনার কাছে । আমাদের প্রত্যেকেই প্রায় একই রকম কম বেশি ভুল কাজ করি । তারপর যে কাজটি ভুল করা হয়েছে, সেই কাছে থেকে শিক্ষা নিলে আমাদের সময় বাঁচবে এবং সঠিক পথে সফলতার দিকে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারা যাবে ।