অম্বুবাচী

অম্বুবাচী

 অম্বুবাচী Ambubachi সনাতন হিন্দুধর্মের একটি বাৎসরিক উৎসব। আষাঢ় মাসে মৃগ শিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবী তথা ধরিত্রী মা ঋতুময়ী হন। এই সময়েই অম্বুবাচী পালন করা হয়। বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে, “কিসের বার কিসের তিথি, আষাঢ়ের সাত তারিখ অম্বুবাচী।” এদিন থেকেই অম্বুবাচী শুরু হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, সূর্য যে বারের যে সময়ে মিথুন রাশিতে গমন করেন, তার পরবর্তী সেই বারের সেই কালে অম্বুবাচী হয়।

অর্থাৎ পৃথিবী এই সময়ে ঋতুমতী হন। অম্বুবাচী কীভাবে পালন করা হয়? অম্বুবাচীর তিন দিন পর্যন্ত কোনো ধরনের মাঙ্গলিক কাজ করা যায়না। চতুর্থ দিন থেকে মাঙ্গলিক কাজে কোনো বাধা থাকেনা। অম্বুবাচীর সময় হাল ধরা, গৃহ প্রবেশ, বিবাহ ইত্যাদি শুভ কাজ করা নিষিদ্ধ থাকে ও এই সময়ে মঠ-মন্দিরের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকে।

পঞ্জিকা মতে আষাঢ় মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখ, এই চার দিন গ্রাম-বাংলার মহিলারা এই অনুষ্ঠান পালন করেন। অম্বুবাচী চলাকালীন সব ধরণের চাষাবাদ বন্ধ থাকে। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে পিঠা-পায়েস বানানোর রীতি রয়েছে। এই অনুষ্ঠানে বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে ব্রত রাখে। অম্বুবাচীর আগের দিন রান্না করা খাবার তারা তিন দিন ধরে খান। ঐ তিন দিন তারা কোন গরম খাবার খান না।

এই তিন দিন কামরুপ কামাখ্যায় পূজা হয়। সমস্ত দেবী মন্দির বন্ধ থাকে। কামরুপ কামাহ্মায় মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে লাল রং এর তরল (ভক্ত রা বলে মা এর রজস্রাবের রক্ত) বের হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামে অবস্থিত বিখ্যাত কামাখ্যা মন্দিরে এই উপলক্ষে দেবীর ঋতুকাল সমাগত মনে করে উৎসব পালন করা হয়। সূর্যের দক্ষিণায়নের দিন থেকে তিন দিন অর্থাৎ আষাঢ়ের ৭ তারিখ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে এই পার্বণের পালন কাল। ওড়িশায় এই পার্বণকে সরাসরি ‘রজ উৎসব’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।  

আমাদের সামাজিক জীবনেও এই ধর্মীয় আচারটির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। যে তিন দিন অম্বুবাচী পালন করা হয় সেই দিনগুলিতে কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান, যেমন, গৃহপ্রবেশ, বিবাহ, উপনয়ন ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় না। শুধু তা-ই নয়, কিছু কাজ যেমন, বেদ পাঠ, ভূমি কর্ষণ, বীজ বপন, দেব-পিতৃ তর্পণও বন্ধ রাখা হয়। অম্বুবাচী উপলক্ষে গ্রামবাংলার বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে ব্রত রাখেন।

অম্বুবাচীর আগের দিন তাঁরা তিন দিনের প্রয়োজনীয় খাবার রান্না করে রাখেন। এই সময় আগুনের আঁচে গরম করা কোনও খাবার তাঁরা খান না। তবে কোথাও কোথাও সূর্যের তাপে খাবার গরম করে নেওয়ার প্রথাও প্রচলিত আছে। আবার যাঁরা ব্রহ্মচর্য পালন করেন, তাঁরা এই সময়ে আমিষ খাবার খান না। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল খেয়ে তাঁরা ব্রত উদ্‌যাপন করেন। বাংলার পাশাপাশি অন্য প্রদেশেও ‘অম্বুবাচী ব্রত’ প্রচলিত রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশাতে এটি ‘রজ উৎসব’ নামে পালিত হয়।

এই সময়ে কৃষকেরা ছুটি পালন করেন। মেয়েদের কৃষি ও গৃহকর্ম থেকে পুরোপুরি বিরত রাখা হয়। অম্বুবাচীর দিনগুলি তাঁদের কাছে বিশ্রামের দিন। এই সময়ে তাঁরা নতুন জামা-কাপড় পরেন। সিঁদুর-আলতায় সুসজ্জিত হন। ‘মিথুন সংক্রান্তি’ বা ‘রজ পর্ব’ নামে পরিচিত এই উৎসবও তিন দিন ধরে পালিত হয়। তিন দিনের প্রথম দিনটিকে বলা হয় ‘পহিলি রজো’। দ্বিতীয় দিন থেকে মিথুন মাস শুরু হয়।

অর্থাৎ, বর্ষার প্রারম্ভ হয়। পুরাণ মতে, ভূদেবী এই সময় রজঃস্বলা হন। তৃতীয় দিনটি হল ‘ভূ দহ’ বা ‘বাসি রজো’। চতুর্থ দিনে বসুমতী স্নান। অর্থাৎ, ধরিত্রী মা বা ভূদেবীর স্নান। ভূদেবী হলেন জগন্নাথের স্ত্রী। পুরীর মন্দিরেও জগন্নাথের পাশে রূপোর ভূদেবীর মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। অম্বুবাচীকে কেন্দ্র করে প্রধান উৎসবটি হয় অসম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরে। এখানে রয়েছে কামাখ্যা মন্দির। মন্দিরের গুহা আকৃতিবিশিষ্ট মাঝের কক্ষে কোনও মূর্তি নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বিশ্বাস, ফি বছরে এই সময়ে দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী হন।

তাই অম্বুবাচীর সময়ে তিন দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। এই সময় দেবী দর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অম্বুবাচী নিবৃত্তির দিন দেবীর স্নান ও পূজা শেষ হওয়ার পরে দর্শনের অনুমতি মেলে। এই দিনই মন্দিরের পান্ডারা আগত ভক্তদের উদ্দেশে লাল বর্ম শোভিত বস্ত্র উপহার দেন। কথিত রয়েছে, এই লাল বস্ত্র ধারণ করলে ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ হয়। আবার এই দিন থেকেই মন্দিরের চারপাশে খোল-করতাল সহযোগে শুরু হয় কীর্তন। মেলার আকার নেয় কামাখ্যা মন্দির চত্বর।

অম্বুবাচী ২০২২  অম্বুবাচী ২০২২ পালিত হবে আগামী ০৭ আষাঢ় ১৪২৯, ২২ জুন ২০২২, বুধবার।