দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণ

দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণ

ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন ভারতে ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য ছিল যেগুলি পুরোপুরি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং সেখানে কোনোদিনই ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়নি। অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মাধ্যমে এই সব রাজ্যগুলি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইতিহাসে আমরা অনেকেই পড়েছি ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড ওয়েলেসলি বহু দেশীয় রাজ্যকে একপ্রকার বাধ্য করেছিলেন এই অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি স্বীকার করে নিতে।

ব্রিটিশ ভারতেই ‘গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫’ প্রথম পাশ হয় যে আইনে বলা হয় এই দেশীয় রাজ্যগুলি নিজেদের সম্মতিক্রমে অখণ্ড ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু দেশীয় রাজ্যের রাজারা প্রথমে এই যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তারা ক্রমেই এই ধারণায় বিশ্বাসী হয় এবং একে একে এই আইনি চুক্তিতে সম্মত হয়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা পাকাপাকিভাবে ভারতবর্ষ ছেড়ে যেতে সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়েই ভারতের সব দেশীয় রাজ্যগুলির ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পর্যবসিত হয়। তারা নিজেরা নিজেদের মতো করে সদ্যগঠিত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভাজিত হতে পারবে না। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ইণ্ডিয়ান ইণ্ডিপেণ্ডেন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী সকল দেশীয় রাজ্যের উপর ব্রিটিশের শাসন ও আধিপত্য খর্ব করা হয়।

এর ফলে দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা লাভ করে, যদিও তাদের মধ্যে অধিকাংশ রাজ্যই নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, আর্থিক সাহায্য ও অন্যান্য পরিকাঠামোর জন্য ভারত সরকারের উপর নির্ভরশীল ছিল। দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীন হওয়ার পরে দেশীয় রাজাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে তারা ভারত নাকি পাকিস্তান কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।

এর ফলেই ভারত সরকার ও দেশীয় রাজ্যের রাজাদের মধ্যে এই ‘ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার ফলে দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণ (Annexation of Princely states) ও বন্টন সহজ হয়। বহু দেশীয় রাজ্য এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এ সবই সম্ভব হয়েছিল স্বাধীন ভারতের কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রধান সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্য এবং এ কারণেই তাঁকে অনেকে আধুনিক ভারতের রূপকার বলে থাকেন।

লর্ড মাউন্টব্যাটেনের অধীনে সাংবিধানিক পরামর্শদাতা ভি. পি. মেননের সঙ্গে যৌথভাবে স্বাধীন ভারতের আয়তনের প্রায় ৪৮ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত এবং ভারতের তৎকালীন জনসংখ্যার ২৮ শতাংশের ধারক এইসব দেশীয় রাজ্যগুলিকে সুকৌশলে অখণ্ড ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেন। এই সব দেশীয় রাজ্যগুলি ব্রিটিশ ভারতের অংশ না হলেও, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ছিল।

এই লক্ষ্যে ‘ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন’-এর মাধ্যমে প্রধানত প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে দেশীয় রাজ্যগুলির উপর ভারত সরকারের কর্তৃত্ব আরোপিত হয় এবং অন্যান্য সকল বিষয়ে দেশীয় রাজ্যগুলিকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। বরোদা, বিকানীর, জয়পুর ইত্যাদি রাজ্যগুলি সবার আগে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও আরো কিছু রাজ্য ছিল যারা কোনোভাবেই ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়নি, বরং এক একটি রাজ্য পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি জানিয়েছিল।

ত্রিবাঙ্কুর, যোধপুর, জুনাগড়, জম্মু ও কাশ্মীর এবং হায়দ্রাবাদ এই রাজ্যগুলি নিয়েই সমস্যা সৃষ্টি হয়। দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে সেভাবে কোনো ঐক্য ছিল না। সেখানকার হিন্দু রাজারা মুসলিম প্রজাদের অবিশ্বাস করতেন, আবার মুসলিম শাসকরা অনেকক্ষেত্রেই মুসলিম লীগের প্ররোচনায় পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে চেয়েছিলেন।

অনেক দেশীয়া রাজাই মনে করতেন ভোপালের নবাবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মাউন্টব্যাটেন দেশীয় রাজ্যের রাজাদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেন এবং তাঁদের জানান যে ব্রিটিশ সরকার কোনোভাবেই দেশীয় রাজ্যগুলিকে পৃথক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেবে না এবং অন্যদিকে ব্রিটিশ কমনওয়েনলথের অঙ্গীভূত হওয়ার অনুমতিও দেবে না।

ফলে যতদিন না তারা ভারত কিংবা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে দেশীয় রাজ্যগুলির কোনোরকম সম্পর্ক থাকবে না। এমতাবস্থায় যোধপুরের শাসক হানওয়াত সিংহ জয়সলমীরের রাজার সঙ্গে একত্রে মহমদ আলি জিন্নার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে মহম্মদ আলি জিন্নাও যোধপুর আর জয়সলমীরকে যেন তেন প্রকারেণ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করায় আগ্রহী ছিলেন। মাউন্টব্যাটেন এই সময় যোধপুরের শাসককে বোঝান যে একটি হিন্দু রাজ্য হয়ে মুসলিম শাসিত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় যোধপুর। কেরালায় সেই সময় তিনটি দেশীয় রাজ্য ছিল – ত্রিবাঙ্কুর, কোচিন ও মালাবার। ব্রিটিশ ভারত ত্যাগ করার সময় ত্রিবাঙ্কুরের শাসক স্যার সিপি রামস্বামী আইয়ার ত্রিবাঙ্কুরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন।

এর ফলে ঐ অঞ্চলে একটি রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলতে থাকে। ইতিমধ্যে স্যার সিপি রামস্বামীর উপর অতর্কিত আক্রমণের কারণে জীবন সংশয় দেখা দিলে তিনি ত্রিবাঙ্কুর ত্যাগ করেন এবং ত্রিবাঙ্কুর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। জুনাগড় ছিল গুজরাটের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে তার কোনো সংযোগই ছিল না।

জুনাগড়ের নবাব তৃতীয় মহম্মদ মহবত খানজি মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে বিরোধিতা করে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চান এবং সমুদ্রপথে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চান। জুনাগড়ের ক্ষেত্রে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল হলেও সেখানকার শাসক ছিলেন মুসলিম। ১৯৪৭ সালের আগে জুনাগড়ের দেওয়ান নাবি বক্স মুসলিম লীগের শাহ নওয়াজ ভুট্টোকে স্টেট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে যোগ দিতে বলেন।

দেওয়ানের অনুপস্থিতিতে ভুট্টো কার্যালয়ের সমগ্র আধিপত্য দখল করে পাকিস্তানের সঙ্গে জুনাগড়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে উদ্যোগী হয়। ফলে জুনাগড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। পার্শ্ববর্তী দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীনতা ঘোষণা করায় জুনাগড়ের সৈন্যবাহিনী সেইসব রাজ্যগুলি দখল করে। এই মুহূর্তে ভারত সরকার মনে করে যে জুনাগড়কে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হতে দিলে গুজরাট অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু প্রজা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করে।

এমতাবস্থায় ভারতের পক্ষ থেকে জুনাগড়ে একটি গণভোটের ব্যবস্থা করা হয় যেখানে প্রজারা মত প্রকাশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে জুনাগড় ভারত বা পাকিস্তান কার অন্তর্ভুক্তিকে স্বীকার করবে। ইতিমধ্যে জুনাগড়ে তেল ও কয়লা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, বিমান ও ডাক ব্যবস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড়ের সীমান্তে দখল নেয় এবং ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর তারিখে ভারতীয় সেনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের পরে জুনাগড়ের নবাব খানজি পাকিস্তানে পলায়ন করেন।

১৯৪৮ সালে গণভোটে জুনাগড়বাসীদের মতের সপক্ষে জুনাগড় অবশেষে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কাশ্মীরের তৎকালীন রাজা হরি সিং দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম থাকায় পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রজারা। এই পরিস্থিতিতে হরি সিং পাকিস্তানের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি করে যাতে পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, ভ্রমণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি উভয়ের মধ্যে অক্ষুণ্ন থাকে।

১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে পাখতুনরা কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করলে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং। কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে এই শর্তেই মাউন্টব্যাটেন সাহায্য করতে রাজি হন। ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে হরি সিং-এর সম্মতিতে কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীরের উত্তর ও পশ্চিম অংশের দখল নেওয়ায় সেই অংশটি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর নামে পরিচিত হয় এবং চীনও ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময় কাশ্মীরের কিছু অংশের দখল নেয় যা বর্তমানে অক্ষয় চীন নামে পরিচিত। হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রে এক বিরাট রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘর্ষ এবং আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এই দেশীয় রাজ্যটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

হায়দ্রাবাদ সংযুক্তিকরণের ক্ষেত্রে সেখানকার নিজাম শাসকদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে চূর্ণ করে রাজাকার সেনার সঙ্গে ভারতীয় সেনার প্রত্যক্ষ সংঘাত বাধে। ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা ‘অপারেশন পোলো’ নামে পরিচিত। অবশেষে ১৯৪৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিজাম রাজা সবথেকে বড়ো ও শক্তিশালী দেশীয় রাজ্য এই হায়দ্রাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হন এবং আত্মসমর্পণ করেন।