আফ্রিকায় 'সবুজ সোনা' অ্যাভোকাডো

আফ্রিকায় 'সবুজ সোনা' অ্যাভোকাডো

পৃথিবীতে পুষ্টিকর ফলগুলোর মধ্যে অ্যাভোকাডো একটি। কেননা, এর মধ্যে আছে নানা ঔষধি গুণও। অ্যাভোকাডো একটি চমৎকার ফল। বেশিরভাগ ফলের মধ্যে মূলত কার্বোহাইড্রেট থাকে তবে অ্যাভোকাডোতে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পরিমাণ বেশি। অ্যাভোকাডো ফলের উপকারীতা অগণিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান নিয়ে আজকে আলোচনা করা হলো। অ্যাভোক্যাডোর অভ্যন্তরীণ হলুদ-সবুজ মাংসল অংশ খাওয়া হয়, তবে খোসা এবং বিচি ফেলে দেয়া হয়। এতে ২০ রকমের ভিটামিন এবং খনিজ সহ বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

লোভনীয় ফল অ্যাভোকাডোর চাহিদা পূরণে ফলন বাড়াচ্ছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। অন্য অঞ্চলে এই ফল চাষে পরিবেশগত সমস্যা হলেও আফ্রিকার এক্ষেত্রে এগুচ্ছে ভিন্ন চাষ পদ্ধতিতে। ‘‘একটি অ্যাভোকাডো গাছের আয়ু প্রায় ৫০ বছর। উগান্ডার মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬০ বছর। একটি অ্যাভোকাডো গাছ মানুষের পুরো জীবন উপকার করতে পারে।’’ এক সাক্ষাত্‍কারে একথা বলেন বেকার সেনেজেন্ডো। সেনেজেন্ডো বৃহত্তম অ্যাভোকাডো ফার্ম পূর্ব উগান্ডার মায়ুগ জেলার এক হাজার হেক্টর জমির মুসুবি খামারে কাজ করেন।

অ্যাভোকাডো খামারে কাজ করে তিনি তার জীবনের স্বপ্ন পূরণ করছেন বলেও জানান। অ্যাভোকাডো চাষ করে দারিদ্র্যকে দূরে রাখতে চান তিনি। বেড়ে চলা চাহিদার কারণে এই ফলে রপ্তানি বাজার বেশ আকর্ষণীয়। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাথাপিছু অ্যাভাকোডার চাহিদা বেড়েছে ৪০৬ শতাংশ। আফ্রিকাতেও অ্যাভোকাডো চাষ দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। আফ্রিকার কৃষকদের কাছে অ্যাভোকাডো এখন দারিদ্র মোচনের ফসল।

ফলটি সেখানে তাই পরিচিতি পাচ্ছে সবুজ সোনা নামে। আগামী দশকে শীর্ষ রপ্তানিকারী দেশগুলোর তালিকায় উঠে আসার লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে নাইজেরিয়া ও উগান্ডা। কেনিয়া ইতোমধ্যেই রয়েছে শীর্ষ দশের মধ্যে। তবে অ্যাভোকাডোর বাণিজ্যিক চাষের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে একারণে জলের স্বল্পতা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে বলে সংবাদে উঠে এসেছে। সেখানকার শীর্ষ দুই রপ্তানিকারক মেক্সিকো ও চিলির বাণিজ্যে এর ছায় পড়তে শুরু করেছে।

তবে এক্ষেত্রে আফ্রিকার অ্যাভাকোডা চাষীদের রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যত। ছোট আকারে এবং বৃষ্টির উপর নির্ভর করায় লাতিন আমেরিকার তুলনায় আফ্রিকায় অ্যাভাকোডা চাষ সুবিধাজনক এবং পরিবেশগতভাবে ক্ষতি কম হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও চাষীরা। বড় খুচরো বিক্রেতাদের প্রতিযোগিতা বাড়ায় বাজারে কফির দাম পড়ে যাওয়ায় আফ্রিকার কৃষকদের আয় কমে গিয়েছিল। কৃষকদের কাছে তাই আশার আলো এখন অ্যাভাকোডা। 

এই প্রসঙ্গে নাইরোবির ওয়ার্ল্ড এগ্রোফরেস্ট্রি সেন্টারের বিজ্ঞানী স্যামি কারসান বলেন, ‘‘অ্যাভোকাডো ফলটি আসলে স্বর্গের একটি উপহার, কৃষকরা কফি চাষের বিকল্প হিসাবে অ্যাভোকাডো চাষ করতে পারেন।’’ নাইজেরিয়ার দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য মতে, গত বছর নাইজেরিয়ার অ্যাভোকাডো সোসাইটির (এএসএন) সদস্যদের সাথে এক বৈঠকে নাইজেরিয়ার   প্রক্তন প্রেসিডেন্ট ওলুসেগুন ওবাসানজো অ্যাভোকাডোকে নাইজেরিয়ার নতুন তেল’ বলে মন্তব্য করেছেন। 

অ্যাভোকাডো ফলাতে তেমন বেশি জলের প্রয়োজন হয় না। ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী এক কিলো অ্যাভোকাডো ফলাতে ২,০০০ বা ৫২৮ গ্যালন জলের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া উগান্ডা এবং নাইজেরিয়ার, অ্যাভোকাডো খামারগুলোর বেশিরভাগই যেসব জায়গায় বৃষ্টি হয় সেসব অঞ্চলে। নাইজেরিয়ার অ্যাভোকাডো সোসাইটির বুনমি নিজের জমিতে অ্যাভোকাডো চাষ করছেন। আগামীতে ইউক্রেন ও যুক্তরাজ্যে নিজের ফলানো অ্যাভোকাডো রপ্তানি করার আশা করছেন তিনি।

 হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়   রক্তচাপ কমাতে, ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে এবং ধমনী ফলকের ধীর বিকাশ ঘটাতে অ্যাভোক্যাডো খুবি উপকারী। তাছাড়া অস্বাভাবিক হার্ট স্পন্দন, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা হ্রাস করতে অ্যাভোকাডোর তুলনা নেই। প্রতিদিনের একটি অ্যাভোক্যাডো হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে।

হজমে সহায়তা করে     প্রতিদিনের খাবার তালিকায় অ্যাভোকাডো রাখলে আপনার খাবার খুব ভালোভাবে হজম হবে। সেই সাথে কোষ্ট্যকাঠিন্যের মত সমস্যা দূর হবে। একটি অ্যাভোকাডোতে ১০ গ্রামের মত ফাইবার থাকে। ফাইবার হজমে সহায়তা করে।

রোগ প্রতিরোধ করে   অ্যাভোকাডোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি রয়েছে। আর ভিটামিন বি শরীরকে রোগ জীবাণু থেকে রক্ষা করে। এছাড়া অ্যাভাকাডোতে যে ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং উদ্ভিজ্জ খনিজ রয়েছে তা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।

ঘুম ভালো হয়     অ্যাভোকাডোতে যে ম্যাগনেসিয়াম থাকে তা শরীরের ক্লান্তি দূর করে এবং ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।

ওজন কমায় অ্যাভোকাডো হলো ওজন কমানোর উপযোগী খাবার। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে অ্যাভোকাডো খেলে ২৩% বেশি তৃপ্তি পাওয়া যায় এবং যারা এই ফলটি খান না তাদের তুলনায় পরবর্তী ৫ ঘন্টায় তাদের খাওয়ার ইচ্ছা ২৮% কম হয়। সুতরাং আপনার ডায়েট চার্টে অ্যাভোকাডো যোগ করলে এটি স্বাভাবিকভাবেই আপনাকে কম ক্যালোরি খেতে সহায়তা করবে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত করবে।

দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে   অ্যাভোকাডোতে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্যারোটিনয়েড থাকে- লুটেন এবং জেক্সানথিন। লুটেইন এবং জেক্সানথিন উভয়ই চোখের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। এই দুটি ক্যারোটিনয়েড আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে, তবে একসঙ্গে আরো ভালো কাজ করে। এর ফলে চোখে ছানিও পড়ে না।

চুল ও ত্বকের যত্নে     পেন্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি ৫) প্রায় প্রতিটি ত্বক এবং চুলের যত্নের তৈরি প্রসাধনীতে থাকে। অ্যাভোকাডোতে প্যান্টোথেনিক অ্যাসিডের ৪৫% আরডিএ থাকে। যা ত্বক ময়েশ্চারাইজ করতে সহায়তা করে এবং ত্বকে লাবণ্য আনতে সাহায্য করে। অ্যাভোক্যাডো হলো পুষ্টিতে ভরপুর একটি চমৎকার ফল যা আধুনিক ডায়েটের সকল ধরনের পুষ্টির অভাব পূরণ করতে সহায়তা করে।