বকুল গাছঃ ভেষজ গুণ সম্পন্ন ও উপকারি গাছ বকুল

বকুল গাছঃ ভেষজ গুণ সম্পন্ন ও উপকারি গাছ বকুল

দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে বকুল গাছ জন্মায়।  বকুলগাছ দেখতে মাঝারি আকারের। সাধারণত ১৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বয়স্ক গাছ ৩০ থেকে ৪০ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। পাতাগুলো মসৃণ, গাঢ় সবুজ ও ঢেউ খেলানো, আকারে ৫ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। বকুল ফুল আকারে খুব ছোট, বড়জোর ১ সেন্টিমিটার। ফুলগুলো যখন ফোটে, তখন দেখতে হলুদাভ সাদা বা ক্রিম রঙের হয়। বকুল ফুল মাটিতে ঝড়ে পড়ার দৃশ্য নয়নাভিরাম।

এ ফুল রাতে ফোটে এবং সারা দিন ধরে টুপটাপ ঝরতে থাকে। ভারি সুগন্ধি এই ফুল। শুকনো ফুলের সুগন্ধটা অনেক দিন থাকে; তাই এই ফুলের মালা অনেক দিন ঘরে রেখে দেওয়া যায়। বকুলগাছে ছোট ছোট কুলের মতো ডিম্বাকৃতির ফল হয়। এটিই বকুল ফল। ফলগুলো কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে লাল বর্ণ ধারণ করে। পাখিরা বকুল ফল খেয়ে থাকে। অনেক সময় বাচ্চাদেরও এ ফল খেতে দেখা যায়। বকুল ফলের স্বাদ কষযুক্ত হালকা মিষ্টি। গাছে এই ফল আসে বর্ষাকালে।

বকুল ফলে একটি করে ডিম্বাকৃতির বাদামি বীজ থাকে। তবে কখনো কখনো দুটি বীজও দেখা যায়। এই বীজ থেকে এক ধরনের তেল পাওয়া যায়। ভারি সুন্দর গাছ এই বকুল, ঘন সবুজ পাতায় ঠাসা, মাথাটা গোলগাল কিংবা লম্বাটে। কখনোই পাতা ঝরে উদোম হয় না বলে এটি আদর্শ ছায়াতরুও। শিক্ষাঙ্গন, মন্দির, রাস্তার পাশে, উদ্যান ও বাড়িতে বকুলগাছ লাগানো হয়।

বকুল ফুল, ফল,  পাতা, গাছের ছাল, কাণ্ড, কাঠ—সব কিছুই কাজে লাগে। এগুলো দিয়ে বিভিন্ন অসুখ নিরাময়ের ওষুধ তৈরি করা হয়। বকুল ফুলের রস হৃদ্যন্ত্রের অসুখ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। বকুল কাঠ দিয়ে বাড়ি-ঘর তৈরি করা যায়। বকুল ফুল নিয়ে উল্লেখযোগ্য অনেক গান আছে।বকুল ফুল, কাচা ফল, পাকা ফল, পাতা, গাছের ছাল, কাণ্ড, কাঠ সব কিছুই কাজে লাগে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাবে এর ব্যবহার রয়েছে।

১. বকুল ফুলের রস হৃদযন্ত্রের অসুখ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়।
২. শুকনা ফুলের গুঁড় দিয়ে তৈরী ঔষধ “আহওয়া” নামক এক ধরনের কঠিন জ্বর, মাথা ব্যথা এবং ঘার, কাঁধ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে সৃষ্ট ব্যাথার নিরাময়ে ব্যবহার হয়।


৩. শুকনা ফুলের গুঁড় মাথা ঠান্ডা রাখে ও মেধা বাড়াতে উপকারী।
৪. শুকনো বকুল ফুলের গুঁড় নাক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিলে মাথা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
৫. বকুল গাছের ছাল দিয়ে কাটা ছেঁড়ার ক্ষত পরিষ্কার করা যায়। এছাড়াও বকুল গাছের ছাল ও তেঁতুল গাছের ছাল সিদ্ধ করে পাচনের মাধ্যমে তৈরি তরল ঔষধ ত্বকের নানারকম রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়।


৬. বকুল গাছের কাণ্ড থেকে পাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক ধরনের ঔষধ তৈরি করা হয় যা দাঁতের সমস্যা নিরাময়ে অনেক উপকারী। এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় ফিলিপাইনে। এছাড়াও এ ঔষধ জ্বর ও ডায়রিয়া থেকে আরোগ্য লাভের জন্যে ব্যবহার করে ফিলিপাইনের অধিবাসীরা। স্থানিয় লোকেরা এ তরল জল দিয়ে গার্গল করে গলার অসুখের নিরাময়ের জন্যে। মুখ ধোয়ার তরল ঔষধ যা মাড়ি শক্ত করে।
৭. বকুলের পাতা সিদ্ধ করে মাথায় দিলে মাথা ব্যাথা কমে যায়। পাতার রস চোখের জন্যেও উপকারী।
৮. কাঁচা ফল প্রতিদিন ২-৩ টি করে চিবিয়ে খেলে দাঁতের গোড়া শক্ত হয়।
৯. ভারতে এ ফুল দিয়ে তৈরি তরল, সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।


১০. ফুল দিয়ে মালা গাঁথার প্রচলন অনেক পুরনো দিন থেকে চলে আসছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীরা এই ফুলের মালা চুলে পরে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে।
১১. পাকা ফল খাওয়া যায়। মালয়’রা বকুল ফল সংরক্ষণ করে রাখে এবং আচার তৈরি করে।
১২. অনেক এলাকায় বকুল গাছের কাণ্ড বা নরম ডাল দাঁত মাজার জন্যে ব্যবহার করে।
১৩. বকুল কাঠ অনেক দামি আর দুষ্প্রাপ্য কাঠ। এর কাঠ অনেক শক্ত হয় কিন্তু খুব সহজে কাটা যায় আর খুব সুন্দর ভাবে পালিশ করা যায়. এ কাঠের রঙ গাঢ় লাল। 

এলাকা ও দেশ ভিত্তিক নাম

বাংলা ভাষায় - বকুল, বহুল, বুকাল, বাকুল, বাকাল। তবে বকুল নামেই বেশি পরিচিত।

ইংরেজি - Spanish cherry, Medlar, and Bullet wood

সংস্কৃত ভাষায় - আনাঙ্গাকা (Anangaka), বকুল (Bakul), বকুলা (Bakula), বকুলাহ (Bakulah), ছিড়াপুস্প (Chirapushpa), কিরাপুস্প (Cirapuspa), ধানভি (Dhanvi), দোহালা (Dohala), গুধাপুস্পকা (Gudhapushpaka), কন্ঠা (Kantha),কারুকা (Karuka), কেশারা (Kesara), কেশারাপা (Kesarapa), মধুগন্ধা (Madhugandha), মধুপাঞ্জারা (Madhupanjara), মধুপুস্প (Madhupushpa), মাকুলা (Mukula)

হিন্দি - বকুল, বলসারি,मौलसरी , মাউলসারাউ (Maulsarau), মাউলসের (Maulser), মাউলসিরি (Maulsiri), মোলসারি (Molsari), মুলসারি (Mulsari), তেন্ডু (Tendu), মাউলসারি (Maulsari), মোলসিরি (Molsiri), মোরসালি (Morsali).

তামিল ভাষায় - மகிழம்பூ Magizhamboo, আলাগু (Alagu), ইলাঞ্চি (Ilanci), ইলাঞ্জি (Ilanji), কেসারাম (Kesaram), কোসারাম (Kosaram), ম্যাগিল (Magil), ম্যাগিলাম (Magilam), ভাগুলাম (Vagulam), মগাদাম (Mogadam), ম্যাগিশ (Magish), মাকিলাম্পু (Makilampu), মাকিলাম ভিটটু (Makilam vittu), কেছারাম (Kecaram), মাকিলাম মারাম (Makilam maram), মাকুলাম্পু (Makulampu), ভাকুলাম্পু (Vakulampu), ম্যাগিঝ (Magizh), মাগাদাম (Magadam), ম্যাগিঝাম (Maghizham), মোগিদাম (Mogidam), ভাকুলাম (Vakulam), মাহিলা (Mahila), মাকিঝাম্পু (Makizampu).

মনিপুরী - বোকুল লৈ (Bokul lei)

মালয়েশিয়া - বিতিছ (Bitis), ইলেঙ্গি (Elengi), মেংকুলা (Mengkula), বাকুলাম (Bakulam), ইলাঙ্গি (Elangi), ইলান্নি(Elanni), এলেঙ্গি (Elengi), ইলান্নি (Ilanni), ইরান্নি (Iranni), মাকুরাম (Makuram), মুকুরা (Mukura), এলানি (Elani), এলেঙ্গি (Elengii), এলেঞ্জি (Elenjee), এরিনি (Erini), মাকিরা (Makira), মাকুরা (Makura)

ইন্দোনেশিয়া - তাঞ্জাং (Tanjung), কারিকিশ (karikis)

থাইল্যান্ড - কুন (Kun), কাইও (Kaeo)

মায়ানমার - কায়া