বান্দরবান জেলা

বান্দরবান জেলা

বাংলাদেশের Bangladesh চট্টগ্রাম Chattogram বিভাগের একটি পার্বত্য জেলা বান্দরবান। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল বান্দরবান (Bandarban)।  এই অঞ্চলটি ১৫৫০ সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। তবে এর প্রায় ৬০০ বছর আগে ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা এই অঞ্চল অধিকার করেন। ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা এই এলাকা দখল করেন।

১৪০০ শতকের দিকে চাকমা রাজা এই অঞ্চল দখল করেন। ১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা এই অঞ্চল আক্রমণ করে কিছু এলাকা পুনর্দখল করেন, এবং ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকারে রাখেন। মুঘল সাম্রাজ্য ১৬৬৬ থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত এলাকাটি সুবা বাংলার অধীনে শাসন করে। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই এলাকা নিজেদের আয়ত্তে আনে।

১৮৬০ সালে এটি ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসাবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা এই এলাকার নাম দেয় চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসাবে বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। মূলত চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস রেগুলাসন ১৯০০ দ্বারা এই অঞ্চল আনুষ্ঠানিকভাবে আরাকান রাজ্যের অংশ থেকে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আওতায় আসে এবং চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল ও বোমাং সার্কেল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রত্যেক সার্কেলে সার্কেল চীফ বা রাজা নিযুক্ত করা হয়।

বান্দরবান জেলা ছিল বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত। বোমাং রাজ পরিবার ১৬ শতক থেকেই এই অঞ্চল শাসন করছিল। তাই এ জেলার আদি নাম বোমাং থং। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সমগ্র বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়।বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি পার্বত্য জেলা বান্দরবান। বান্দরবান বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ে ঘেরা ছবির মত এক অপরূপ পটভূমি। দেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এই জেলাতেই অবস্থিত।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী জেলা এই বান্দরবান। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ হওয়ার পর ১৯৫১ সালে পুর্ব পাকিস্তানের মহকুমার মর্যাদা পায় বান্দরবান জেলা। সেই সময় এই জেলা রাঙ্গামাটি জেলার প্রশাসনিক ইউনিট ছিল।  মার্মা ভাষায় বান্দরবানের প্রকৃত নাম “রদ ক্যওচি ম্রো”। এই জেলার উত্তরে রাঙ্গামাটি জেলা, দক্ষিণে আরাকান (মায়ানমার), পূর্বে ভারত এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা অবস্থিত। এই জেলায় অবস্থিত পর্বত শ্রেণীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মিরিঞ্জা, ওয়ালটং,তামবাং এবং পলিতাই। 

সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং বাঁকখালী এই জেলার উল্লেখযোগ্য নদী। সাঙ্গু এখানকার প্রধান নদী। জেলার জীবন-জীবিকার সঙ্গে সাঙ্গু নদী অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে বান্দরবান জেলার অবস্থান তৃতীয়। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে থানচি উপজেলা সর্ববৃহৎ (১০২০.৮২ বর্গ কিমি) এবং সবচেয়ে ছোট উপজেলা রোয়াংছড়ি (৪৪২.৮৯ বর্গ কিমি)।

আয়তনের বিচারে বান্দরবান জেলাটি প্রায় ৪৪৭৯.০৩ বর্গ কিলোমিটার স্থানজুড়ে অবস্থিত। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে বান্দারবান জেলা সমগ্র বাংলাদেশে চৌষট্টিতম জনবহুল জেলা। এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৩,৮৮,৩৩৫ জন।  এই জেলায় মারমা, চাকমা, মুরং, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, বোম, খেয়াং, চাক, পাংখো, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি,ও তংচংগ্যা সহ মোট ১১টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে যাদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায় মারমা। এঁদের সংখ্যা প্রায় ৭৫,৮৮০জন।

১৫১৮ সালের বাংলাদেশ ভ্রমণকারী পর্তুগীজ বনিকের বর্ণনাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা ভাষাভাষীদের বসবাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বর্তমানে এই জেলায় ৪৭% উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং ৫৩% অ-উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাস করছে। বান্দরবান জেলার নামকরণ সম্পর্কে প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে এই অঞ্চলে একসময় বাঁদরদের আধিক্য ছিল যারা শহরের প্রবেশ মুখে ছড়ার পাড়ে পাহাড়ে নুন খেতে আসত। অবিরাম বৃষ্টির ফলে ছড়ার জল বৃদ্ধি পেলে বাঁদররা ছড়া পেরিয়ে পাহাড় যাওয়ার জন্য একে অপরকে ধরে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হয়।

বাঁদরদের ছড়া পারাপারের এই দৃশ্য স্থানীয় মানুষের নজরে এলে ছড়াটি’ ম্যাঅকছি ছড়া’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মার্মা ভাষায় ‘ম্যাঅক’ মানে বাঁদর আর ‘ছি’ অর্থে ‘বাঁধ’ বোঝায়। পরবর্তী সময়ে বাংলা উচ্চারণে এই নাম পরিবর্তিত হয়ে বান্দরবান নাম হয়। বর্তমানে সরকারি দলিল পত্রে বান্দরবান হিসাবেই এই জেলার নাম লেখা আছে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়; যথা – চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল, এবং বোমাং সার্কেল।

প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন সার্কেল চীফ নিযুক্ত হন। বান্দরবান সেই সময়ে বোমাং সার্কেলের অর্ন্তভুক্ত ছিল। বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কারণে এই জেলার আদি নাম ছিল বোমাং থং। এই জেলা ১৯৫১ সালে মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় যা সেই সময়ে রাঙ্গামাটি জেলার প্রশাসনিক ইউনিট ছিল। পরর্বতীকালে ১৯৮১ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন লামা মহকুমার ভৌগলিক ও প্রশাসনিক সীমানাসহ সাতটি উপজেলার সমন্বয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

বান্দরবান জেলায় মোট ৭টি উপজেলা রয়েছে যথা- আলীকদম, থানচি,নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি এবং লামা। বান্দরবান জেলায় সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাভাষাই প্রচলিত। স্থানীয় বাঙালিরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। এছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে এখানে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খেয়াং, খুমী, পাংখুয়া ইত্যাদি প্রচলিত। এই জেলার ভ্রমণ উপযোগী স্থানের মধ্যে নীলাচল সর্বপ্রধান বলা যেতে পারে। নীলাচলকে ‘বাংলাদেশের দার্জিলিং’ বলা হয়।

এছাড়া বালাঘাটায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির যেখানে “বুদ্ধ ধাতু জাদি” নামে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ মুর্তিটি অবস্থিত। বম ও ম্রো উপজাতীদের গ্রাম, জীবননগর কিয়াচলং বগা ও প্রান্তিক হ্রদ এখানকার মনোরম দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম। এছাড়া জাদিপাড়ার রাজবিহার ও উজানীপাড়ার বিহার, মেঘলা সাফারী পার্ক যেখানে রয়েছে দুটি সম্পূর্ণ ঝুলন্ত সেতু, শৈল প্রপাত,বাকলাই, চিনরি ঝিরি প্রভৃতি পাহাড়ি ঝর্ণা এবং বাংলাদেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এখানকার অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান।

বীর বিক্রম ইউ. কে. চিং এই জেলার বিখ্যাত ভূমিসন্তানদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বাংলাদেশের একমাত্র উপজাতি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া বাঙালি গনিতবিদ বিভূতিভূষণ সেন এই জেলারই সন্তান। এই জেলার উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী খাবার মুন্ডি। নুডলসের মতো এই খাবার বান্দরবান শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে পাওয়া যায়। হিল জুস ও তামাকের জন্যও এই জেলা বিখ্যাত।

এখানকার স্থানীয় উৎসব বলতে মারমাদের বর্ষবরণ উৎসব ‘সাংগ্রাই’ বিখ্যাত। এছাড়া ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা পূর্ণিমা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, দুর্গা পূজাও এখানকার অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। প্রাচীন রাজ প্রথা ও রাজ পূণ্যাহ্ অনুষ্ঠান এখনো এ জেলাতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।   জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৬১.৯৫%, অকৃষি শ্রমিক ৭.০০%, শিল্প ০.৪৮%, ব্যবসা ৯.৯২%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ১.১১%, নির্মাণ ১.০৮%, ধর্মীয় সেবা ০.২৬%, চাকরি ৮.১২%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.৩৭% এবং অন্যান্য ৯.৭১%। 

কৃষিজ দ্রব্যের মধ্যে আনারস, কলা, পেঁপে, কমলা, লেবু ও আলু সর্বোচ্চ উৎপাদিত ফসল। তবে এই অঞ্চলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য প্রচুর বিন্নি চাল উৎপাদন। সাদা, লাল ও কালো এই তিন রকমের বিন্নি চালের উৎপাদন এই অঞ্চলে দেখা যায়। তাছাড়া, এই অঞ্চলের জুমের ভুট্টার স্বাদ বেশ সুস্বাদু। 

 শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৩১.৭%; পুরুষ ৩৮.২%, মহিলা ২৩.৭%। কলেজ ৫, কারিগরি কলেজ ১, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৪৬, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩০২, কমিউনিটি বিদ্যালয় ২৮, কিন্ডার গার্টেন ৭, মাদ্রাসা ১০। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: বান্দরবান টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়,

বান্দরবান সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আলীকদম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নাইক্ষ্যংছড়ি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, রোয়াংছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রুমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, থানচি উচ্চ বিদ্যালয়, বান্দরবান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা প্রচলিত। স্থানীয় বাঙ্গালিরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। এছাড়াও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খেয়াং, খুমী, পাংখুয়া ইত্যাদি প্রচলিত। 

বান্দরবান জেলায় যোগাযোগের প্রধান দুইটি সড়ক চট্টগ্রাম-বান্দরবান মহাসড়ক এবং চন্দ্রঘোনা-বান্দরবান সড়ক। সব ধরনের যানবাহনে যোগাযোগ করা যায়।  এছাড়া জেলার আভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়কগুলো হল চিম্বুক-রুমা, বান্দরবান-রোয়াংছড়ি-রুমা, আজিজনগর-গজালিয়া-লামা, খানহাট-ধোপাছড়ি-বান্দরবান, বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি-আলীকদম-বাইশারী-ঘুমধুম এবং চিম্বুক-টংকাবতী-বার আউলিয়া। প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম সিএনজি চালিত অটোরিক্সা।