বারীন্দ্রকুমার ঘোষ | সশস্ত্র বিপ্লবী Barindra Kumar Ghosh

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ | সশস্ত্র বিপ্লবী Barindra Kumar Ghosh

 উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার সাংস্কৃতিক ‘নবজাগরণ’ ঘটেছিল। বাংলা তখন সারা ভারতের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। প্রাচ্য সভ্যতার আদর্শ ও পাশ্চাত্য সভ্যতার বাস্তবতার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সেই ‘ইয়ং বেঙ্গল’-এর অন্যতম উত্তরসাধক ছিলেন ডঃ কৃষ্ণধন ঘোষ, Barindra Kumar Ghosh বারীন্দ্রকুমার ঘোষের বাবা। মা স্বর্ণলতাদেবী ছিলেন মনীষী রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। দাদা ছিলেন ঋষি অরবিন্দ। সুতরাং উত্তরাধিকারসূত্রেই বারীন্দ্রকুমার পেয়েছিলেন স্বদেশ প্রেমকে। শৈশবে এক বছর বয়স অবধি লন্ডনের ক্রয়ডনে থাকার পর মা এবং দিদির সঙ্গে তিনি ফিরে এলেন ভারতবর্ষে।

তাঁদের পৈতৃক বাড়ি যদিও ছিল হুগলী জেলার কোন্নগরে, কিন্তু তাঁরা থাকতেন দেওঘরে। দেওঘর বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন বারীন্দ্রকুমার। তখন জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভাব ঘটেছে রাষ্ট্রগুরু স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যােয়র। শহর কলকাতা থেকে অনেক দূরের সেই দেওঘরেও এই জাতীয়তাবাদের ঢেউ এসে লেগেছিল।

কিশোর বারীন্দ্রকুমারের মধ্যে বোধহয় ঘুমন্ত ছিলেন ভবিষ্যতের এক মহান বিপ্লবী! তিনি বিশিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকদের সংস্পর্শে এলেন, যাঁরা নিজেরাই ছিলেন জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ।ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ  ৷

বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ভাই বারীন্দ্রকুমার ‘যুগান্তর’ সাপ্তাহিকীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।  ১৮৮০ সালের ৫ জানুয়ারি ব্রিটেনের ক্রয়ডনে বারীন্দ্রকুমার ঘোষের জন্ম হয় ৷ বাবা ডঃ কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন পেশায় চিকিৎসক এবং সার্জেন্ট। মা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন  ব্রাহ্ম ধর্মীয় সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন পন্ডিত রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। বিপ্লবী এবং পরবর্তী জীবনে একজন অধ্যাত্মবাদী অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন বারীন্দ্রকুমারের তৃতীয় ভাই।

তাঁর দ্বিতীয় ভাই মনমোহন ঘোষ ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি একাধারে কবি ও কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। সরোজিনী ঘোষ নামে তাঁদের এক বড় বোনও ছিল।  বারীন্দ্রকুমারের প্রাথমিক পড়াশোনা দেওঘরের শুরু হয়। ১৯০১ সালে প্রবেশিকা পাস করার পর তিনি পাটনা কলেজে যোগ দেন।

তিনি বরোদা থেকে সামরিক প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছিলেন। বারীন্দ্রকুমারে প্রথাগত পড়াশোনা এর থেকে বেশী এগোয়নি। এই সময়ে অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষভাগ কিংবা বিশ শতকের গোড়ার দিকে তিনি তাঁর দাদা অরবিন্দ ঘোষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট হন৷ ১৯০২ সালে বারীন্দ্রকুমার কলকাতায় ফিরে এসে যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহায্যে বাংলায় বেশ কিছু বিপ্লবী সংগঠন শুরু করেন।

১৯০৬ সালে তিনি ‘যুগান্তর’ নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক প্রকাশ শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে এই একই নামে একটি বিপ্লবী সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি তাঁর দাদা অরবিন্দ ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিকের সহায়তায়। যুগান্তরের জনপ্রিয়তায়, বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে, বারীন্দ্রকুমারের গতিবিধি ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সন্দিহান করে তোলে।

যুগান্তর দলটি অনুশীলন সমিতির মধ্য থেকেই গঠিত একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের ভারতীয় মাটি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি শুরু করা। বারীন্দ্রকুমার এবং যতীন্দ্রনাথের পাশাপাশি অনেক তরুণ বিপ্লবী এই দলে যোগ দিয়েছিলেন৷ বিপ্লবীরা কলকাতার মানিকতলায় যুগান্তর দলের প্রধান কার্যালয়ে বারীন্দ্রকুমার অন্যান্য বিপ্লবীদের নিয়ে বোমা তৈরি শুরু করেন। বারীন্দ্রকুমারের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা আলিপুর বোমা মামলা।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিপ্লবী ক্ষুদিরাম কিংসফোর্ড হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন৷ তদন্ত চলাকালীন আলিপুর বোমা মামলার আসামী হিসেবে ২ মে অরবিন্দ ঘোষ এবং বারীন্দ্রকুমারকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিকভাবে বারীন্দ্রকুমারকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রচেষ্টায় তাঁর সাজা কমিয়ে আরও বেশ কিছু আসামী সহ আন্দামানের সেলুলার কারাগারে তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়৷  তৎকালীন সময়ে এই সেলুলার কারাগার ছিল বিভীষিকার আরেক নাম। সর্বত্র পুলিশের নজরবন্দী।

ছোটো ছোটো অজস্র কুঠরিতে এক একজন বিপ্লবীকে রাখা হত। সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাকি দেশবাসীর মন থেকে বিপ্লবীদের গৌরবগাথা মুছে ফেলা। এখানে থাকা বন্দিদের সাথে চলত অমানুষিক অত্যাচার। ভাতের মাড় ছাড়া আর কিছুই খাবার হিসেবে দেওয়া হত না। ভাগ্য ভালো হলে কোনও কোনও দিন সব্জি দেওয়া হত। এরপর থাকত নারকেল ঘানিতে কাজ।

নারকেল থেকে প্রত্যেক বন্দিকে কুড়ি থেকে পঁচিশ কিলো তেল বানাতে হত। ক্লান্তি আসলেও চাবুক এবং লাঠির ঘা থেকে বাঁচতে কাজ করতেই হত। এছাড়া কুঠরির দেওয়াল থেকে ঝুলিয়ে লাঠি মারা ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। এটাই ছিল সেলুলার জেলে বন্দি থাকা বিপ্লবীদের রোজকার জীবন। ১৯২০ সালে আন্দামানের জেল থেকে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ মুক্তি পান৷

কলকাতায় ফিরে এসে সাংবাদিকতা শুরু করলেও অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সাংবাদিকতা ছেড়ে কলকাতায় একটি আশ্রম গঠন করেন৷ ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা ছেড়ে পন্ডিচেরিতে চলে যান, সেখানে তাঁর দাদা অরবিন্দ ঘোষের ‘শ্রী অরবিন্দ আশ্রম’ এ বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করেন৷ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আধ্যাত্মিকতা ও সাধনার দিকে নিজের মনস্থির করেন৷

১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা শুরু করেন ‘দ্য ডন্ অফ ইন্ডিয়া’ (The Dawn of India)  নামে। পাশাপাশি তিনি ‘দ্য স্টেটম্যান’ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত হন৷ ১৯৫০ সালে বাংলা দৈনিক ‘বসুমতি’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন বারীন্দ্রকুমার৷  বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

তাঁর নানা লেখা ইংরেজি ও বাংলায় বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘দ্বীপান্তরের বাঁশি’, ‘পথের ইঙ্গিত’, ‘আমার আত্মকথা’, ‘অগ্নিযুগ’, ‘ঋষি রাজনারায়ণ’ ‘শ্রী অরবিন্দ’ ইত্যাদি। তাঁর লেখা স্মৃতিকথা “The tale of my exile – twelve years in Andamans” নামে প্রকাশিত হয় যা সেই সময়কার জীবন্ত দলিল। বারীন্দ্রকুমার ঘোষের আত্মজীবনী ‘বোমার যুগের কাহিনী’ নামে প্রকাশিত হয়।  ১৯৫৯ সালের ১৮ এপ্রিল বারীন্দ্রকুমার ঘোষের মৃত্যু হয়। বারীন্দ্রকুমার চেয়েছিলেন দেশবাসীকে বিপ্লব প্রচেষ্টার কথা জানাতে, তাই স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছিলেন, ‘মাই মিশন ইজ ওভার’