বাঙ্গালীর গর্ব ১২৬ বছরের পদ্মশ্রী ডক্টর স্বামী শিবানন্দ

বাঙ্গালীর গর্ব  ১২৬ বছরের পদ্মশ্রী ডক্টর স্বামী শিবানন্দ

মানব কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন Swami Sivananda স্বামী শিবানন্দ। স্বামী শিবানন্দ ভারতীয় জীবনধারা এবং যোগব্যায়ামের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রামনাথ কোবিন্দ পদ্ম পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় চমক ছিল স্বামী শিবানন্দ। ১২৬ বছর বয়সী স্বামী শিবানন্দ পুরস্কার নিতে সুদূর বারাণসী থেকে খালি পায়ে এসে হাজির হন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও চেয়ার ছেড়ে উঠে শিবানন্দকে প্রণাম জানান।সেই মুহূর্তে পরিবেশ আবেগময় হয়ে ওঠে।  পুরস্কার গ্রহণের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দকে সামনে থেকে প্রণাম করেন স্বামী শিবানন্দ।  এসময় উপস্থিত অতিথিরা করতালি দিয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তখন প্রধানমন্ত্রী মোদিও সঙ্গে সঙ্গে মাটি স্পর্শ করে শ্রদ্ধা গ্রহণ করেন।

মঞ্চে পৌঁছানোর আগে ‘যোগ গুরু’ আবার হাঁটু গেড়ে বসেন। রাষ্ট্রপতি এগিয়ে গিয়ে শিবানন্দকে উঠতে সাহায্য করেন। এরপর তিনি পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র তুলে দেন যোগ গুরুর হাতে। স্বামী শিবানন্দ মানব কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। যোগব্যায়াম, তেলমুক্ত সেদ্ধ খাবার এবং নিজস্ব উপায়ে মানবজাতির নিঃস্বার্থ সেবার সঙ্গে সুশৃঙ্খল-সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের সহজ উপায় তাকে রোগ ও দুশ্চিন্তামুক্ত দীর্ঘতম জীবন দিয়েছে। তিনি প্রচারের পরিবর্তে নিজেকে একটি অনুকরণীয় পাঠ হিসাবে প্রদর্শন করেছেন।

বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জের উপজেলার হরিতলা গ্রামে ১৮৯৬ সালের ৮ আগস্ট  জন্মগ্রহণ করেন স্বামী শিবানন্দ। পিতা শ্রীনাথ গোস্বামী মাতা ভগবতি দেবী। মা, বাবা, কয়েক বছরের বড় দিদি আরতি সহ দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করতেন। চরম দারিদ্র্যতার কারণে ৪ বছর বয়সে উনাকে নবদ্বীপের বিখ্যাত সন্যাসী স্বামী  ওস্করানন্দর  কাছে দিয়ে দিয়ে দেন।

দুই বছর পর ৬ বছর বয়সে সন্যাসীর সাথে বাড়ীতে ফিরে এসে শুনেন দিদি না খেতে পেয়ে মারা গেছেন। বাড়ীতে আসার ৭ দিন পর মা-বাবা একই দিনে মারা যান। তিনি স্বামী ওস্করানন্দের সাথে পিতা-মাতার শ্রাদ্ধ শেষ করে ১৯০১ সালে নবদ্বীপ গমন করেন ও সেখানে পড়াশোনা শুরু করেন । পরবর্তীতে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি  এস পাশ করেন।

১৯২৫ সালে তিনি  বিলেত যাত্রা করেন সেখান থেকে পিএইচ ডি  ডিগ্রি লাভ করেন। ২৯ বছর বয়সী শিব লন্ডনে যান এবং টানা ৩৪ বছর ধরে সফর চালিয়ে যান। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ইত্যাদি দেশ ঘুরে যখন তিনি দেশে ফিরেছিলেন তখন ভারত তার ৯তম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করছিল।  ১২৬ বৎসর বয়সী পিএইচডি ধারী  স্বামী শিবানন্দ নিরামিষ ভোজী। যারা মনে করে প্রানীজ অামিষ না খেলে শরীরে খাদ্য উপাদান ঘাটতি হতে পারে তাদেরকে ভুল প্রমাণ করলেন শিবানন্দ মহারাজ। 

সকালে উঠে একটু পদ্মাসন আর ভুজঙ্গাসন৷ বিছানা থেকে হরিণের মতো লাফ দিয়ে নেমে দৈনিক কাজকর্ম৷ দুপুরে ভাতঘুমের বদলে শিষ্যদের সঙ্গে সঙ্গে একটু আড্ডা৷ জীবনের ক্রিজে তিনি একশো কুড়ি নট আউট! উত্তরপ্রদেশের বেনারসে বাস শিবানন্দ বাবার৷ সেখানেই কিছু ভক্তকে নিয়ে আশ্রম খুলেছেন তিনি৷ গড়গড় করে মুখস্থ বলেন ঠিকানা৷ “৪/২০ কবীর নগর, দুর্গা কুণ্ড৷ কারিমাতা মন্দিরের কাছেই আমার আশ্রম৷

পরিবার নিয়ে ঘুরে যাবেন৷” এই আশ্রমেই হাতে করে ভক্তদের শেখান জীবনে দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য৷ রবীন্দ্রনাথ যখন মারা যান তখন তিনি ৪৫-এর সুপুরুষ৷ পাসপোর্ট বলছে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর চেয়েও এক বছরের সিনিয়র শিবানন্দ বাবা৷ নেতাজিকে দেখেছেন? মুচকি হাসেন বাবা৷ চিড়িয়াখানার প্রয়াত কচ্ছপ অদ্বৈতর পর তিনিই প্রবীণতম৷ কীভাবে হেরে গেল বিজ্ঞান? একশো ছাব্বিশ বছরের শিবানন্দের ঝকঝকে চোখ, তরতাজা কিডনি, ফুসফুস চমক দিচ্ছে চিকিৎসকদের৷

বাবা বলছেন, “তেল ছাড়ো, সুস্থ থাকো৷” রোজকার খাবার থেকে তেল বাদ দিয়েছেন তিনি৷ রয়েছেন স্রেফ টাটকা সবজি সেদ্ধতে৷ সেই জাদুতেই চাক্ষুষ করেছেন প্রথম ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের সি কে নাইডুর ব্যাটিং থেকে হাল আমলের বিরাট কোহলিকেও৷ সাদা ধুতি, ফতুয়া, পায়ে স্লিপার বছরে বারো মাস বাবার নিত্য সঙ্গী এগুলি৷ ইতিমধ্যেই দেশের প্রবীণতম নাগরিক হিসাবে ভারতীয় রেলের ফ্রি পাস পেয়েছেন তিনি৷ বয়স নিয়ে পাছে কেউ সন্দেহ করে তাই সঙ্গেই রাখেন পাসপোর্টের ফটোকপি৷

একশো ছাব্বিশ বছরে তাঁর শরীরে কোলেস্টেরল, সুগার, প্রেশার কিচ্ছু নেই৷ চিকিৎসকরা বলছেন, “তেল-মশলা না খেয়ে উনি এতদিন সুস্থ আছেন৷ বিষয়টি চমকপ্রদ৷ তবে কিছু ফ্যাট শরীরের পক্ষে খুব উপকারি৷ সমস্ত খাবার থেকে তেল বাদ দিন, এমনটা বলতে পারি না৷” স্বামী শিবানন্দ ১২৬ বছর বয়সে করোনার টিকা গ্রহণের পর দেশবাসীকেও টিকা নিতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি ২০১৯ সালে বেঙ্গালুরুতে যোগরত্ন পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হন। গত ৫০ বছর ধরে স্বামী শিবানন্দ পুরীতে অন্তত ৬০০ জন কুষ্ঠ আক্রান্ত ভিক্ষুককে ব্যক্তিগতভাবে সেবা করেছেন। ওই ব্যক্তিদের কাছে তিনি ‘জীবন্ত ঈশ্বর’ হিসেবে খ‌্যাত বাঙ্গালীর গর্ব  ১২৬ বছরের পদ্মশ্রী ডক্টর স্বামী শিবানন্দ।