বেথুয়াডহরী| নদীয়ার অভয়ারণ্য ঘেরা জনপদ বেথুয়াডহরী

বেথুয়াডহরী|   নদীয়ার  অভয়ারণ্য ঘেরা জনপদ বেথুয়াডহরী

 

বেথুয়াডহরী বা বেথুয়া, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার একটি সেন্সাস টাউন। এটি কৃষ্ণনগর সদর মহকুমার অন্তর্গত নাকাশিপাড়া ব্লকের অধীন। এই জায়গাটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যর কারণে বিখ্যাত। কথিত আছে এখানে বেথো (বেথুয়া) শাকের জলাভূমি (ডহর) ছিল। তা থেকেই জায়গার নাম বেথুয়াডহরী। বেথুয়াডহরী বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য (Bethuadahari Wildlife Sanctuary) হল নদীয়া জেলায় অবস্থিত একটি অভয়ারণ্য। বেথুয়াডহরী অভয়ারণ্যটি ৩৪ নং জাতীয় সড়কের পাশে বেথুয়াডহরী শহরের সন্নিকটে অবস্থিত।

এখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগের অধীন এই অভয়ারণ্যটি রয়েছে। ১৯৫৮-৫৯ সালে এই বনভূমির সৃজনকাজ শুরু হয়। ১৯৮০ সালে সরকারিভাবে বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হয়। এর মোট আয়তন ১.২১ বর্গকিমি বা ৬৭ হেক্টর। এখানে শাল, সেগুন, মেহগনি হিজল, অর্জুনের, গাব, টুন, নাগকেশর, পিয়াশাল ইত্যাদি উদ্ভিদ রয়েছে। বন্যপ্রাণ বিশেষত বিপন্ন পশু, পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রায় চার দশক আগে নদীয়ার নাকাশিপাড়ায় তৈরি হয়েছিল বেথুয়াডহরী অভয়ারণ্য।

৬৭ হেক্টর সবুজ এলাকাজুড়ে সোনাজঙ্ঘা, চিতল হরিণ, ময়ূর, মুনিয়া, চন্দনাদের রাজত্ব। এছাড়াও শিয়াল, বনবিড়াল, খরগোশ, ময়ূর, শুয়োর, বেজী, খরগোশ, গুই সাপ বা গো-সাপ প্রভৃতি বন্যপ্রাণ এই জঙ্গলে আছে। অরণ্যে ঢুকলে বোঝা যায়, এখানকার বাসিন্দাদের তালিকাটা আরও লম্বা। পাইথন, কচ্ছপ, ঘড়িয়াল- মিলেমিশে রয়েছে সবাই। সুন্দরবনের আয়লার সময় বিপন্ন হয়ে পড়া বিরল প্রজাতির সারস সোনাজঙ্ঘা আশ্রয় পেয়েছে এখানে। আর হয়ে উঠেছে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দৈত্যাকৃতির পাইথন কিম্বা শান্ত চিতল হরিণীর টানও কিছু কম নয়। ছাড়াও, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামে নামাঙ্কিত প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র, পাখিরালয় আছে এই বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যে।

এটি ঘিরে এই স্থানে একটি পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। বেথুয়াডহরী অভয়ারণ্যের এই বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণ ও গাছেদের সঙ্গে কাটিয়ে আসতেই পারেন নিরিবিলি একমুঠো অবসর। শাল সেগুন, মেহগনি, অর্জুন, নাগকেশর, পিয়াশাল গাছেরা মিলেমিশে সবুজ করে দেবে আপনার অবসর যাপন। কতরকমের জানা, অজানা পাখির ডাক ভুলিয়ে দেবে শহরের একাকীত্বের জীবন। এখানে এলে হরিণের দেখা পাওয়া যাবে নিশ্চিতভাবে। চিতল হরিণ এই জঙ্গলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সংরক্ষিত বনের ফটক দিয়ে ঢুকতেই জঙ্গলের মধ্যে আছে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামাঙ্কিত প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্রটি। প্রাণী সংরক্ষণ সম্বন্ধিত অনেক তথ্য পাওয়া যাবে এখানে।

 পথের দু’ধারে বৃক্ষসারি মাথায় ছাতা ধরে বনপথকে করেছে ছায়াপথ। আর এই ছায়াপথ সোজা নিয়ে আসে তিন রাস্তার মোড়ে – বাঁ দিকে ঘড়িয়ালের পুকুর তাদের অখন্ড অবসর যাপনে বিন্দুমাত্র হেলদোল দেখা দেয় না পর্যটকদের আগমনে। রোদ পোহায় তারা যতক্ষণ ইচ্ছে ততক্ষণ। কুমীরের মতোই অনন্তকাল বসে থাকে নিশ্চল হয়ে। আর ডান দিকে কচ্ছপের পুকুর। পথের সামনেই বিরাট খাঁচার মধ্যে আছে ময়ূর, খরগোশ, নীলগাই ও নানা পাখি।

এদের বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে জঙ্গলে এসে অনেকেরই খাঁচার ভেতর আটকে থাকা প্রাণী দেখতে মন সায় দেয় না। জঙ্গলের পথে ঘুরতে ঘুরতে, মনের ক্যানভাসে আঁকা হতে থাকে বন্য-বৈচিত্র, হাতে থাকা ক্যামেরায় ছবি তুলতেই পারেন ঘড়িয়াল, কচ্ছপ ও ময়ূরের পেখম মেলা নয়নাভিরাম দৃশ্যের। রৌদ্র ও ছায়ার লুকোচুরির মাঝে জঙ্গলের গন্ধ বুকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গাছের ফাঁকে, ধূসর-সবুজ পথে প্রজাপতি তার রঙ নিয়ে আসে পাখায় পাখায়। ঘিরে ধরে আচমকাই। জঙ্গলের নিয়ম মেনে চললে এমন অনেক অপরূপ দৃশ্যেরই সাক্ষী হতে পারেন আপনি। ‘সেলিম আলি বনপথ’ দিয়ে এগিয়ে চলার সময়ে চোখে পড়বে চিতল হরিণ ও হরিণীর দল।

বনভূমিটি মূলত হরিণের জন্য সংরক্ষিত। বিকেল পাঁচটা ও সকাল সাতটার সময় এই জঙ্গলে হরিণদের খেতে দেওয়া হয় এবং সাধারণ পর্যটকদের তখন জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে দেওয়া হয় না। ওইসময়ই হল হরিণ দেখতে পাওয়ার আদর্শ সময়। যদি জঙ্গলের মধ্যে বনবাংলোয় থাকা যায় তাহলে হরিণ দেখতে পাওয়া যাবেই। সন্ধেবেলায় বনবাংলোর আশেপাশে চলে আসে হরিণের দল। ঘর থেকে মাত্র দু'পা দূরে মন ভাল করা একটি প্রাকৃতিক ভ্রমণ কেন্দ্র। কিন্তু এতদিন ধরে তাও দেখে উঠতে পারেননি হয়তো অনেকেই। তাই এবারের শীতে আপনার ডেস্টিনেশন হতেই পারে, নদীয়ার বেথুয়াডহরী অভয়ারণ্য।একেবারে জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝেই জঙ্গলবাসীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ।শিয়ালদহ থেকে লালগোলাগামী ট্রেনে বেথুয়াডহরী আড়াই থেকে সোয়া তিন ঘণ্টার পথ। স্টেশন থেকে অভয়ারণ্য ৪ কিমি টোটো বা রিকশায় যেতে পারেন। সড়কপথে কলকাতা থেকে বেথুয়াডহরীর দূরত্ব ১৩৬ কিমি। এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে যেতে পারেন। গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন। পথ বারাসত-জাগুলিয়া-চাকদা-রানাঘাট-কৃষ্ণনগর হয়ে।