বিপদতারিণী ব্রত

বিপদতারিণী ব্রত

যিঁনি সমগ্র বিপদ থেকে রক্ষা করেন বা যিঁনি বিপদ সমূহ নাশ করেন তিনিই বিপদতারিনী। যিঁনি দুর্গা তিনিই বিপদতারিনী। তিঁনি পুরাণে কৌশিকীদেবী নামে খ্যাতা। আবার তিনিই জয়দুর্গা। দেবীর উৎপত্তি হয়েছিলো পরমেশ্বর ভগবান শিবের অর্ধাঙ্গিনী দেবী পার্বতীর কৃষ্ণ কোশ থেকে- তাই তিনি কৌশিকী। পুরাণ মতে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক দুই অসুরের হাতে দেবতারা পরাজিত হয়ে হিমালয়ে গিয়ে মহামায়ার স্তব করতে লাগলেন। সেই সময় পরমেশ্বরী ভগবতী পার্বতী সেই স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেবী তাদের স্তব শুনে বললেন –"আপনারা এখানে কার স্তব করিতেছেন?” সেই সময় ভগবতী পার্বতীর শরীর থেকে তার মতন দেখতে আর এক জন দেবী বের হয়ে আসলেন। জয় মা বিপত্তারিণী। ১৩ জুলাই মঙ্গলবার এবং ১৭ জুলাই শনিবার বিপত্তারিনী ব্রত উৎসব পালন করা হয়। 

সেই নব আবির্ভূতা দেবী জানালেন – “ইহারা আমারই স্তব করিতেছেন।” এই দেবী যুদ্ধে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুরের বধ করেছিলেন । এই দেবী মোহাচ্ছন্ন শুম্ভাসুরকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করে বলেছিলেন- “ঐকেবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা। পশ্যৈতা দুষ্ট ময্যেব বিশন্তো মদবিভূতয়ঃ।।" ("এই জগতে এক আমিই আছি। আমি ছাড়া আমার সাহায্যকারিনী আর কে আছে? ওরে দুষ্ট ভাল করে দেখ , ব্রহ্মাণী প্রভৃতি শক্তি আমারই অভিন্না বিভুতি বা শক্তি। এই দেখ তারা আমার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।”) আর একটি পৌরাণিক গাঁথানুসারে একদা ভগবান মহাদেব রহস্যচ্ছলে দেবী পার্বতীকে ‘কালী’ বলে উপহাস করেন। এতে দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে তপস্যার মাধ্যমে নিজের “কৃষ্ণবর্ণা” রূপ পরিত্যাগ করলেন। সেই কৃষ্ণবর্ণা স্বরূপ দেবীই হলেন , দেবীর পার্বতীর অঙ্গ থেকে সৃষ্টা জয়দুর্গা, কৌশিকীদেবী ও বিপদতারিনীদুর্গা।

আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষে পঞ্চমী তিথিতে করা হয় মা বিপত্তারিণীর ব্রত। ১২ মাসের যত ব্রত রয়েছে, তাঁর মধ্যে এটি বিশেষ একটি ব্রত হিসাবে পালিত হয়। প্রায় সব হিন্দু ঘরেই এই ব্রত পালন করা হয়। শনিবার বা মঙ্গলবারে এই ব্রত করা হয়। সঠিক নিয়ম মেনে শ্রেষ্ঠ উপাচারে যদি এই ব্রত পালন করা হয়, তা হলে খুব ভাল ফল পাওয়া যায়। এই পুজোয় দূর্বা ঘাসের সঙ্গে লাল সুতো বেঁধে হাতে পরার নিয়ম অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মেয়েরা বাম হাতে এবং ছেলেরা ডান হাতে এই সুতো বাঁধেন। মনে করা হয় এই সুতো হাতে বাঁধলে মায়ের কৃপায় সব বিপদের হাত থেকেই রক্ষা পাওয়া যায়। এই পুজোয় ফুল, ফল সব কিছুই ১৩টি করে অর্পণ করার নিয়ম রয়েছে। লাল সুতোয় ১৩টি গিঁট ও ১৩টি দূর্বা বাঁধার নিয়ম রয়েছে। পুজোর শেষে এই সুতো হাতে পরতে হয়। তবে অবশ্যই পুজোর শেষে মায়ের ব্রতকথা শুনতে হবে। এতে বেশি ভাল ফল লাভ করা যায়। বিপত্তারিণী ব্রত করার আগের দিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করা উচিত।

দেবী বিপত্তারিণীর রূপের সঙ্গে দেবী সংকটতারিণী বা মাতা সংকটার সাদৃশ্য রয়েছে। কোথাও তিনি শঙ্খ-চক্র-শূল ও অসিহস্তা স্বর্ণবর্ণা ত্রিনয়না, আবার কোথাও তিনি খড়গ-শূল-বরাভয়ধারিণী লোলজিহ্বা ঘোরকৃষ্ণা। পূজার উপকরণের পুষ্প, ফল, ইত্যাদি সবকিছুই ১৩টি করে নিবেদন করার নিয়ম। এমনকি হাতে ধারণ করার রক্তসুতোটিতেও ১৩টি গ্রন্থি দেওয়ার বিধান রয়েছে। ঘট‚ আমের পল্লব‚ শীষ সমেত ডাব‚ একটি নৈবেদ্য‚ তেরোরকম ফুল‚ দু ভাগে কাটা তেরো রকম ফল । আলাদা চুবড়িতে তেরোটা গোটা ফল‚ তেরো গাছি লালসুতো‚ তেরোটি দুর্বা‚ তেরোটি পান ও তেরোটি সুপুরি দিতে হয় ।

পুজোর শেষে পুরোহিতকে যথাসাধ্য দান-ধ্যান ও দক্ষিণা দিতে হয় এবং পুজোর শেষে মন দিয়ে ব্রত কথা শুনতে হয়। ব্রতের আগের দিন নিরামিষ আহার করলে ব্রতের ফল ভাল হয় বলে মনে করেন অনেকে ৷ ব্রতের দিন পুজো করে ব্রতকথা শুনে ফল-মিষ্টি বা লুচি খেয়ে উপোস ভাঙেন ভক্তরা ৷ এরপরেই লাল সুতোয় তেরোটি গিঁট দিয়ে তেরোটি দূর্বা বাঁধতে হয়। উচ্চারণ করতে হয় বিপত্তারিণীর মন্ত্র ৷গ্রামাঞ্চলে বিপত্তারিণী পূজা চারদিন ধরে চলে। প্রথম দিনে দেবীর “আরাধনা” (পূজা) করা হত। মেয়েরা দণ্ডী কাটে। তারপর দুই রাত্রি ধরে রাতে বাংলা লোকগান, ভজন ও কীর্তন চলে। চতুর্থ দিনে বিসর্জন হয়। বিপত্তারিণী পূজা উপলক্ষে মেয়েরা উপবাস করে।

মন্ত্র

মাসি পূন্যতমেবিপ্র মাধবে মাধবপ্রিয়ে। ন বম্যাং শুক্লপক্ষে চ বাসরে মঙ্গল শুভে। সর্পঝক্ষে চ মধ্যাহ্নে জানকী জনকালয়ে। আবির্ভূতা স্বয়ং দেবীযগেষু শোভনেষুচ। নমঃ সর্ব মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমস্তুতে।।

দেবীর ধ্যান মন্ত্রঃ- ওঁ কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং মৌলীবন্ধেন্দুরেখাম্ । শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্ । সিংহাস্কন্ধাধিরুঢ়াং ত্রিভুবন – মখিলং তেজসা পুরয়ন্তীম্ । ধ্যায়েদ্ দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ ।।

এর অর্থ- কালাভ্র আভাং (এর অর্থ দুই প্রকার হয়, একটি স্বর্ণ বর্ণা অপরটি কালো মেঘের ন্যায়), কটাক্ষে শত্রুকূলত্রাসিণী, কপালে চন্দ্রকলা শোভিতা, চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল ধারিণী, ত্রিনয়না, সিংহোপরি সংস্থিতা, সমগ্র ত্রিভুবন স্বীয় তেজে পূর্ণকারিণী, দেবগণ-পরিবৃতা। সিদ্ধসঙ্ঘ সেবিতা জয় দুর্গার ধ্যান করি। এই জয়দুর্গা বা কৌশিকীদেবী, বিপদতারিনীদুর্গা। পঞ্চদেবতার একজন। দেবীর অনেক রূপ দেখা যায়। উত্তর ভারতে অষ্টাদশ রূপের ধ্যান ও পূজা হয়, কোথাও দশভুজা রূপে পূজা হয়, কোথাও আবার চতুর্ভুজা স্বর্ণ বর্ণা আবার কোথাও কৃষ্ণ বর্ণা রূপে পূজিতা হয় । জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে মঙ্গল ও শনিবারে মায়ের পূজো হয় । যেখানে ১৩ প্রকার ফল, পুস্প, মিষ্টি, পান সুপারী অর্পণ করা হয়। তবে, বাংলাদেশে দেবীর পূজার নিয়ম বিধি সম্পূর্ণ আলাদা।

দেখে নিন নিয়মগুলো কী কী—

• বিপত্তারিণী ব্রত পালন করতে ১৩টি ফল, ১৩টি ফুল, ১৩টি সুপারি এবং ১৩ রকম নৈবেদ্য প্রয়োজন হয়।

• এই ব্রত পালন করার দিন চালের কোনও খাবার খাওয়া যাবে না। যেমন ভাত, চিড়ে, মুড়ি প্রভৃতি।

• এই দিন মহিলাদের অবশ্যই আলতা, সিঁদুর পরতে হবে।

• এই ব্রতে লাল সুতোয় ১৩টি গিট বাঁধতে হয় এবং সেই সুতোয় ১৩টি দুর্বা বেঁধে দিতে হয়।

• এই দিন বাড়ির অন্য সদস্যরা অবশ্যই নিরামিষ আহার গ্রহণ করবেন।

• ব্রত শেষ হওয়ার পর খাদ্য গ্রহণ করার যে নিয়ম সেটাও ১৩টা খেতে হবে।

এই ব্রতের উপকারিতা

এই ব্রত পালন করলে সংসার বিপদমুক্ত থাকে। মা বিপত্তারিণী আমাদের সকল বিপদ থেকে দূরে রাখেন।