বীরেন কুমার বসাকঃ নদীয়ার কৃতি সন্তান পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপক বীরেন বসাক

বীরেন কুমার বসাকঃ  নদীয়ার  কৃতি সন্তান পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপক  বীরেন বসাক

বস্ত্রশিল্পের ইতিহাসে বাংলার শাড়ির স্থান যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোধহয় আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের রুচি আর চাহিদার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে বালুচুরি, বেনারসি, বুটিক থেকে জামদানি শাড়ি। সেই দৌড়ে বাংলার ফুলিয়াও কম যায় না। বহু বছর ধরেই টেক্কা দিয়ে আসছে। বাংলার তাঁতের শাড়ির আঁতুরঘর মানেই গঙ্গার ধারের ফুলিয়ার কথা বলতে হয়।

কৃত্তিবাস ওঝার জন্মস্থানও বটে এই ফুলিয়া। ফুলিয়ার বয়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা রামায়ণের স্রষ্টা কৃত্তিবাস। কৃত্তিবাসের জন্মভিটেতে রয়েছে কৃত্তিবাস স্মৃতি গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা। তার পাশেই রয়েছে একটি বটগাছ। যে বৃক্ষের শীতল ছায়ায় বসে কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন। সেই মহাকবির জন্মস্থানের তাঁতশিল্পী পদ্মশ্রী সম্মানিত হতে চলেছে বীরেন কুমার বসাক।

তার ৪৮ বছরের কর্মজীবনে পেয়েছেন একাধিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, এইবার জামদানি তাঁতের শাড়ির উপরে নিপুন কাজের সুবাদে পদ্মশ্রী সম্মানিত হচ্ছে বীরেন কুমার বসাক। এর আগেও তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁত শিল্পের উপরে, আজ পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়াই তার কর্মজীবনের অনেকটাই সাফল্য বলে মনে করছেন তাঁত ব্যবসায়ী বীরেন কুমার বসাখ। সূক্ষ্ম সুতোর কাজে ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার তাঁতশিল্পী।

বইয়ের পাতা থেকে একটা গোটা মহাকাব্য শাড়িতে ফুটিয়ে তোলা আর যাই হোক চারটিখানি কথা নয়! কিন্তু যে বাঙালি শিল্পীর হাতের জাদুতে এও সম্ভব হয়েছে তিনি বীরেন কুমার বসাক। বীরেন কুমার বসাক। ফুলিয়ার চটকতলার এই তাঁতশিল্পী ঝাঁকের কই হননি। মাত্র আট বছর বয়সেই মাকুড় কেরামতি বুঝে যান। তাই বাবা বঙ্কবিহারী বসাকের সঙ্গে যখন কলকাতায় বাড়ি বাড়ি তাঁত শাড়ি ফেরি করতে আসতেন, তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন এ শহরের পালস।

মানুষকে নতুন নতুন ডিজাইন দিলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না, এই সত্যটা প্রয়োগের কাজটা নীরবে শুরু করেছিলেন। কীভাবে আরও নতুন নকশা তৈরি করা যায় তার জন্য শাড়িতে নানা রকম সুতো দিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা হয়। এর জ‌ন্য রাজ্যের নানা জায়গায় প্রদর্শনীতে পৌঁছে যেতেন বীরেনবাবু। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন নকশাগুলি। আর বাড়িতে ফিরে সেইসমস্ত ভাবনা শাড়িতে তুলতে থাকেন। আর এই ছকভাঙা পথ নতুন রাস্তা খুঁজে দেয়। আর মহাজনের থেকে এনে শাড়ি করা নয়, বীরেনবাবুর নিজেই শাড়ি বানানো শুরু করেন। তাঁর নিজস্ব ভাবনার এইসব শাড়ি নিয়ে আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে।

এত স্বীকৃতি, সম্মান। দেশজুড়ে চাহিদা। এর মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করার কাজটা চালিয়ে যাচ্ছেন পঁয়ষট্টি বছরের এই ‘তাঁতযোদ্ধা’। ‌এলাকার মেয়েদের বিনা পয়সায় নানা রকম নকশা শেখান বীরেনবাবু। তাঁর কথায়, কাজ এখনও অনেক বাকি। তাঁর দাদা ধীরেন বসাক ও ছেলে অভিনবও এই লড়াইয়ে সামিল। আসলে শান্তিপুর, ফুলিয়া জুড়ে দ্রুত বাড়ছে পাওয়ার লুম।

যন্ত্রচালিত তাঁতে খুব দ্রুত শাড়ি তৈরি হয়। ফলে দামও কম। এর পাশাপাশি দালালদের জন্য ফুলিয়া, শান্তিপুরে এসে অনেকে কম দামের শাড়ি বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। এতসব উতরাইয়ের মাঝে দাদা‌-ভাই-ছেলে মিলে হস্তচালিত তাঁতের পুনরুজ্জীবনে নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছেন। চারশো টাকা থেকে শুরু হয় কুড়ি লক্ষ টাকার শাড়ি পাওয়া যায় বীরেনবাবুর তাঁতঘরে। যে শাড়িগুলি প্রতিটিই হাতে বোনা।

হাতের কাজের মধ্যে যে স্নিগ্ধতা, সূক্ষ্মতা রয়েছে তা ভাল জানেন তাঁর ক্রেতারা। তাই নতুন কিছুর তাঁরা ঢুঁ মারেন বীরেন বসাকের কাছে। ফুলিয়া, হবিবপুর, শান্তিপুর, করিমপুর মিলিয়ে এই মুহূর্তের এই তাঁত উদ্যোগীর হাত ধরে প্রায় ৫ হাজার তাঁতশিল্পীর কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবেও কয়েকশো মানুষও উপকৃত।  

প্রতি বছরই প্রজাতন্ত্র দিবসের সময় পদ্মভূষণ–পদ্মবিভূষণ পুরস্কার প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২১ সালের পদ্মশ্রী সম্মান প্রাপকদের তালিকায় শান্তিপুরের তাঁতশিল্পী বীরেনকুমার বসাকের নাম উঠে আসে। তাতে তিনি আনন্দিত হয়ে বলেন, ‘‌আমি অত্যন্ত খুশি এবং এই পুরস্কার দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার কাছে এই পুরস্কার কঠোর পরিশ্রমের একটা স্বীকৃতি।