ব্রুস লি এর জীবনী

ব্রুস লি এর জীবনী

  চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিস্ময় ছিলেন মার্শাল আর্টিস্ট ব্রুস লি Bruce Lee। তিনি ‘দ্য ড্রাগন’ নামেও খ্যাত ছিলেন আপামর বিশ্বে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে মার্শাল আর্টের অনুপ্রবেশ এবং তার যুগপৎ সফলতা ও জনপ্রিয়তা এসেছিল ব্রুস লি-র হাত ধরেই। এই ধরনের চলচ্চিত্র-ঘরানাকে বিশ্বের সামনে নিয়ে আসার অন্যতম কৃতিত্ব তাঁরই। এমনই ঈর্ষনীয় শারীরিক গঠন ছিল তাঁর, এতই শক্তিশালী এক মানুষ ছিলেন তিনি যে, মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর খবরে সারা বিশ্ব চমকে গিয়েছিল।

এত অল্প বয়সে এমন সুস্থ, সবল, চেহারার একজন মানুষ কিভাবে হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তা নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি। নানারকম গুজবও বাতাসে ছড়িয়েছিল তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের গন্ধও পেয়েছিলেন এর মধ্যে। বাহ্যিক আঘাত তাঁর শরীরে পাওয়া যায়নি কিছু, বরং মস্তিষ্কের রোগের কারণেই মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়। কিন্তু এই কারণটি সন্তোষজনক মনে হয়নি অনেকের কাছেই। আজও ব্রুস লি মৃত্যু রহস্য নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বিস্তর।

১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই ব্রুস লি -র আকস্মিক মৃত্যুতে জনগণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে। কিন্তু কয়েকটি তথ্য পরপর সাজালে দেখা যাবে ব্রুস লি-র মৃত্যুকে ঠিক আকস্মিক বলা চলে না। মৃত্যুর দশ সপ্তাহ আগে ১০ মে নতুন চলচ্চিত্র ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’-এর সংলাপ প্রতিস্থাপনের কাজ করাকালীন ব্রুস লি অসুস্থ হয়ে পড়েন ডাবিং রুমের মধ্যেই। টেকনিশিয়ানরা ডাবিং রুমের বাতানুকূল যন্ত্রটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন যাতে তার শব্দে সাউন্ডট্র্যাকটি নষ্ট না হয়। এই ঘরে আধ ঘন্টা থাকার পরেই ব্রুস অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং তাঁর খিঁচুনি শুরু হয়। তৎক্ষনাৎ থাকে নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

সেসময় অত্যন্ত বেদনাদায়ক মাথাব্যথা এবং খিঁচুনি থেকে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন যে ব্রুস সেরিব্রাল এডিমা নামক মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত। ডাক্তাররা তখন ব্রুসকে ম্যানিটোলের সাহায্যে চিকিৎসা করে সুস্থ করেছিলেন। কিন্তু এই ভয়ংকর রোগের বীজ তাঁকে ছেড়ে যায়নি, বরং এই রোগই মারণ রোগ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়। এইবারে মৃত্যুর দিনের ঘটনা পরম্পরাটি লক্ষ্য করা যাক। ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই সকাল থেকেই নতুন ছবির মুক্তির কাজে ব্যস্ত ছিলেন ব্রুস। সকালবেলা ছবির প্রযোজক রেমন্ড চৌ-এর সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি।

রেমন্ড পরে জানিয়েছিলেন যে, সকালে ব্রুস-এর মধ্যে কোনোরকম শারীরিক অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায় নি, বরং সে বেশ উৎফুল্ল মেজাজেই ছিল। সেই মিটিংয়ের পরে ব্রুস গিয়েছিলেন তাঁর সহকর্মী (যদিও এ-নিয়েও মতভেদ আছে, কেউ কেউ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও বলে থাকেন) তাইওয়ান অভিনেত্রী বেটি টিং পেইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে বেটি টিং পেই এবং ব্রুস লি ছাড়া কেউ আর ছিল না। তাঁরা ঠিক করেন যে, নতুন সিনেমার চুক্তির বিষয়ে চুড়ান্ত কথাবার্তার জন্য প্রযোজক রেমন্ড চৌ-এর সঙ্গে নৈশভোজে দেখা করবেন।

সেসময় ব্রুস হঠাৎ মাথাব্যথা অনুভব করেছিলেন। উপায়ান্তর না দেখে বেটি টিং পেই যন্ত্রণানাশক ওষুধ ইকুয়েজিক দিয়েছিলেন ব্রুস লিকে। সেই ওষুধ খেয়ে ব্রুস শুয়ে পড়েন। কয়েক ঘন্টা পরে বেটি টিং পেই তাঁকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য ডাকলেও যখন কোনো সাড়া পাননি, তখন রেমন্ড চৌ-কে খবর দেন তিনি। রেমন্ড নিজে এসেও ব্রুসের চেতনা ফিরিয়ে আনতে যখন ব্যর্থ হন, তখনই তাঁরা ডাক্তারকে ফোন করেন। কেউ কেউ বলেন সন্ধে ছটার সময় রেমন্ড বেটি টিং-য়ের অ্যাপার্টমেন্টে আসেন। সেখানে তিনজনে পরবর্তী সিনেমা নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

চৌ নিজেই এক বয়ানে বলেন যে, সিনেমা আলোচনাকালে ব্রুস তাঁর নির্ধারিত চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, এবং একসময় হঠাৎ খুব ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। হয়তো তখনই তাঁকে ইকুয়েজিক দেওয়া হয়েছিল। আরেকটি মতে, সকালে রেমন্ডের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়েই এই সিনেমা নিয়ে আলোচনা ও ব্রুসের অভিনয়ের ব্যপারটি ঘটেছিল, তারপর তিনি বেটি টিং পেইয়ের বাড়িতে আসেন এবং নৈশভোজে প্রযোজকের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। আবার ব্রুসের স্ত্রী লিন্ডার মতে, বাড়িতে দুপুর দুটোর সময় লি দেখা করেন রেমন্ড চৌ-এর সঙ্গে।

চারটে পর্যন্ত কাজ চলে তাঁদের এবং তারপর তাঁরা একসঙ্গে চলে যান বেটি টিং পেইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে নতুন চলচ্চিত্র বিষয়ে আলোচনার পর চৌ একটি ডিনার মিটিংয়ে যোগ দিতে চলে যান। তারপরই লি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বেটি টিং তাঁকে ইকুয়েজিক দেন। এসব তথ্য নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে। ডাক্তার এসে নিজেও প্রায় মিনিট দশেক চেষ্টার পর লি-এর জ্ঞান ফেরাতে ব্যর্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয় নিকটবর্তী হাসপাতালে ব্রুসকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু চিকিৎসার অবকাশ পাওয়া যায় নি।

অ্যাম্বুলেন্সে এলিজাবেথ হসপিটালে পাঠানোর আগেই ব্রুসের মৃত্যু হয়। নিজের বাড়িতে নয়, ৬৭ বিকন হিল রোডে তাইওয়ানের সেই অভিনেত্রী বেটি টিং পেইয়ের বাড়িতেই মৃত্যু হয় ব্রুস লি-র। মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে এমন সুস্থ, স্বাভাবিক এবং শক্তিশালী একজন মানুষের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে জলঘোলা হয়েছিল বিস্তর। বিশ্বের সব বড় বড় প্যাথলজিস্টদের একত্র করা হয়েছিল ব্রুস-এর ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য।

প্রাথমিকভাবে যে ডাক্তারি ব্যাখা পাওয়া যায় তা হল, মাথাব্যথার কারনে যে যন্ত্রণানাশক ইকুয়েজিক দেওয়া হয়েছিল তাঁকে, সেই ওষুধের প্রভাবে সেরিব্রাল এডিমা সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর অর্থাৎ মস্তিষ্কের তরল ফুলে গিয়ে মস্তিষ্কের আকার প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায় যার ফলে কোমায় চলে যান তিনি এবং তাঁর মৃত্যু হয়। অবশ্য মৃত্যুর এই কারণ নিয়েও অনেকে সন্তুষ্ট নন। নানারকম গুজব, নানা মতামত রটেছে চারদিকে। কেউ কেউ বলেন চীনা গুন্ডাদের হাতে নিহত হন তিনি, আবার কেউ বিশ্বাস করেন বিষপ্রয়োগ করে বেটি টিং পেই নিজেই তাঁকে হত্যা করেন কারণ সেই অভিনেত্রী নাকি কোনো এক সিক্রেট সোসাইটির হয়ে কাজ করতেন, যারা কিনা ব্রুসকে হত্যা করতে চাইত।

আবার হংকং থেকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রিপোর্টে বলা হয়েছিল ব্রেন এডিমার কারণ তাঁর শরীরে পাওয়া মারিজুয়ানার মতো মাদকদ্রব্যের অতিরিক্ততা। যদিও মাদকদ্রব্যের সঙ্গে ব্রেন এডিমার তেমন কোনো সংযোগ নেই। রেমন্ড চৌ-এর প্রযোজনা সংস্থা থেকে একটি অফিসিয়াল বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল যে, ব্রুস লি তাঁর স্ত্রী লিন্ডাকে নিয়ে বাগানে বেড়ানোর সময় ভেঙে পড়েন এবং তাঁর মৃত্যু হয়। যদিও একজন প্রতিবেদক আবিষ্কার করেছিলেন লি-কে অ্যাম্বুলেন্স যেখান থেকে তুলেছিল, সেটি বেটি টিং পেইয়ের ঠিকানা। ব্রুস লি-কে নাকি রেমন্ডরা কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও একটি মতে আসলে তাঁর লাশটিকেই নাকি হাসপাতালে নিয়ে যান রেমন্ডরা।

বেটি টিং পেইয়ের ব্যক্তিগত ডাক্তার চু-এর নির্দেশে নাকি নিকটবর্তী হাসপাতালের পরিবর্তে ২৫ মিনিট দূরত্বের এলিজাবেথ হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ব্রুসকে। রেমন্ড কিন্তু ব্রুসের স্ত্রী লিন্ডাকেও খবর পাঠিয়েছিলেন। ব্রুস লির মৃত্যুতে রেমন্ড এবং বেটি টিং পেইয়ের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠলেও সেইসব তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়ে গেছে। মৃত্যুর আরেকটি কারণ হিসেবে হিট স্ট্রোকের কথা বলা হয়। জুলাই মাসে ছিল অতিরিক্ত গরম এবং লি তাঁর বগল থেকে ঘামগ্রন্থিগুলো সরিয়ে দিয়েছিলেন যাতে ক্যামেরার সামনে তাঁকে অতিরিক্ত ঘামতে না দেখা যায়।

ফলে প্রচন্ড গরমের কারণে, যথাযথ ঘাম নিঃসরণ প্রক্রিয়া ব্যহত হলে হিটস্ট্রোক সেরিব্রাল এডিমাকে বাড়িয়ে তোলে এবং ব্রুস লি-র মৃত্যু হয় বলে মনে করেন কেউ কেউ৷ কারণ সামান্য পেইনকিলার বা মারিজুয়ানার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে ব্রুস লি-র মতো সুস্থ সবল মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে মনে করেন না অনেকেই। ব্রুসের এক বন্ধু চাক নরিস দাবি করেছিলেন যে, নিজের শারীরিক গঠন ধরে রাখতে কোনো পেশি শিথিলকারক ড্রাগ গ্রহণ করার ফলে লি-এর মৃত্যু হয়েছিল। আবার এমন গুজবও রটেছিল যে কোনো এক পতিতার হাতে নিহত হন ব্রুস লি।

সেই গুজব দাবি করেছিল যে, লি একটি শক্তিশালী অ্যাফ্রোডিসিয়াকের (এমন কোনো খাদ্য বা পানীয় যা যৌন চাহিদাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়) প্রভাবে ছিলেন, যার কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন তিনি। ফলে উক্ত পতিতা আত্মরক্ষার্থে লি-কে হত্যা করেছিল। ব্রুস লি মৃত্যু রহস্য ঘিরে এতরকম জল্পনা-কল্পনার মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল লি পরিবারের অভিশাপের তত্ত্বটি। আসলে ব্রুস লি-র পুত্র ব্র্যান্ডন লিও অভিনয় জগতে প্রবেশ করে সফলতা পেয়েছিলেন। কিন্তু শ্যুটিংয়ের সেটে চিত্রগ্রহণের সময় একটি বন্দুক থেকে নির্গত গুলিতে বিদ্ধ হয়ে মারা যান ব্র্যান্ডন।

কর্মকর্তারা তাঁর পিতার মতোই ব্র্যান্ডনের মৃত্যুকেও দুর্ঘটনা বলে ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীকালে কেউ একজন আরও একটি তথ্য আবিষ্কার করেছিল যে, ব্রুস লি-র জন্মের আগে তাঁর বড়ভাইও নাকি রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছিল। এরফলে সেই অভিশাপের তত্ত্বটা আরও বেশি অক্সিজেন পেয়েছিল। ব্রুস লি-র মৃতদেহ সিয়াটলে ফিরিয়ে এনে সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়। আজও ব্রুস লি মৃত্যু রহস্য অস্পষ্টতার অন্ধকারেই রয়ে গেছে।  

আরো পড়ুন      জীবনী  মন্দির দর্শন  ইতিহাস  ধর্ম  জেলা শহর   শেয়ার বাজার  কালীপূজা  যোগ ব্যায়াম  আজকের রাশিফল  পুজা পাঠ  দুর্গাপুজো ব্রত কথা   মিউচুয়াল ফান্ড  বিনিয়োগ  জ্যোতিষশাস্ত্র  টোটকা  লক্ষ্মী পূজা  ভ্রমণ  বার্ষিক রাশিফল  মাসিক রাশিফল  সাপ্তাহিক রাশিফল  আজ বিশেষ  রান্নাঘর  প্রাপ্তবয়স্ক  বাংলা পঞ্জিকা