ব্রাসেলস স্প্রাউটঃ নতুন লাভ জনক সম্ভাবনাময় সবজি ব্রাসেলস স্প্রাউট

ব্রাসেলস স্প্রাউটঃ নতুন লাভ জনক সম্ভাবনাময় সবজি  ব্রাসেলস স্প্রাউট

উন্নত বিশ্বে ব্রাসেলস স্প্রাউট একটি জনপ্রিয় সবজি। সবজি জাতীয় এ উদ্ভিদটির প্রত্যেক পাতার গোড়ায় কিছুটা বাঁধাকপির ন্যায় একটি করে ছোট কুঁড়ি হয়। এ কুঁড়িটিই ব্রাসেলস স্প্রাউট, যা খাওয়া হয়।  বৈজ্ঞানিক নাম Brassica oleracea। মূলত শীতপ্রধান  দেশের সবজি হলেও সম্প্রতি এর চাষ শুরু করেছেন অনেকেই। ব্রাসেল স্পাউট দেখতে অনেকটা বাধাকপির মত। ব্রাসেলস স্প্রাউট শীতকালীন ফসল। এটা মুলত একটা মুকুল। একটি ডাঁটায় অনেকগুলো ব্রাসেল স্প্রাউট নিচ থেকে শুরু করে উপর পর্যন্ত ধরে। এটি বাধাকপি ও ব্রকলি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

ব্রাসেলস স্প্রাউটে ফাইবার, পটাসিয়াম , ওমেগা -3, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ভিটামিন এ , ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস ও খনিজ পদার্থ আছে । ব্রাসেল স্পাউট কোলন ক্যান্সার . রেটিনার ক্ষতি প্রতিরোধ , ত্বকের সৌন্দর্য, দৃষ্টি তীক্ষ্নতা ফুসফুস এবং মুখের ক্যান্সার,হাড়ের গঠন ও শক্তিশালীকরণ,লোহিত রক্ত ​​কণিকা গঠন করে। ব্রোকলির ন্যায় এই সবজিও বেশ পুষ্টিগুন সম্পন্ন , এতে ব্রাসিকা পরিবারের অন্যান্য সবজির মতই রয়েছে গ্লুকোসিনোলেট (glucosinolet) এবং অধিক পরিমানে , এই উপাদান শরীরের কোষ গুলোকে ক্যানসার রোধে সাহাজ্য করে। 

এটা কোষের জীন গুলোকে ক্ষতিকারক কারসিনোজেনের ( carcinogens) এর প্রভাব থেকে প্রতিরক্ষা করে , তাছাড়াও এর রয়েছে অ্যান্টি -ইনফ্লামেটরি গুন যেটা শরীরে প্রদাহ কমায় এবং এই প্রদাহের সাথে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক ! ইদানীং হার্ট অ্যাট্যাকের সাথে শরীরের অতিমাত্রায় প্রদাহ বা ইনফ্লামেশনকে দায়ী করা হচ্ছে , হৃদযন্ত্রের রক্তনালিকায় চর্বি বা কোলেস্টেরল জমে যেই প্ল্যাক সৃষ্টি হয় , শরীরে প্রদাহ বেড়ে গেলে সেই প্ল্যাকে আকস্মিক পরিবর্তন হয় (Acute plaque change )এবং তাতে রক্ত দ্রুত জমাট বেধে হৃদযন্ত্রের বৈকল্য ঘটে মানুষের মৃত্যু হয় । এই প্রদাহ রোধে ব্রাসেল স্প্রাউটস এবং ব্রাসিকা পরিবারের সকল সবজি সদস্য কমবেশি ভূমিকা রাখে ।

ব্রাসেলস স্প্রাউট এর চাষাবাদ পদ্ধতি অনেকটা বাধাকপির মতো। বীজও দেখতে বাঁধাকপির মতো। বীজ থেকে চারা হয়। এ চারা পরবর্তীতে মুল জমিতে লাগাতে হয়। গাছের উচ্চতা জাতভেদে ২-৪ ফুট বা তারও বেশী হতে পারে। ফসলের জীবনকাল জাতভেদে ৯০- ১৫০ দিন। সাধারনত দু মাস পর থেকে গাছে স্প্রাউট আসা শুরু হয়। একটি গাছে ৪০-৬০ টি স্প্রাউট হয়। গাছে যতগুলো পাতা থাকবে ততগুলো স্প্রাউট হবে। স্প্রাউটগুলো ৭-১০ সেমি আকারের এবং ওজন ৫০-৭০ গ্রাম হতে পারে। স্প্রাউট আসার ১৫-২০ দিন পর সংগ্রহ করা যায়। সপ্তাহে ১-২ বার গাছ থেকে স্প্রাউট তোলা যায়। এটি শীতকালীন ফসল। তাই শীতকাল যত দীর্ঘ হবে, এ ফসলের ফলন তত বেশী হয়। সে বিবেচনায় দেশের উত্তরাঞ্চল বেশ উপযোগী হতে পারে। তাই আগাম চাষে ফলন অনেক বেশী হবে। তাপমাত্রা যত বাড়বে ততই বাড এর আকার ছোট হয় এবং বাডগুলো তুলনামূলক শক্ত হয়। 

আদর্শ বীজতলার পরিমাপ হচ্ছে দৈর্ঘ্য ১০ মিটার, প্রস্থ ১২৫ সেমি, দুই বীজতলার মাঝে ৫০ সেমি ফাঁকা রাখতে হয়। বীজতলা জমি থেকে ১০ সেমি উঁচু থাকে। মাটি নরম ঝুরঝুর করে সমতল করে তৈরি করতে হয়। বীজতলা শুকিয়ে গেলে হালকা সেচ দিতে হবে। বেশি ভেজা থাকলে শুকাতে হবে। পিঁপড়া আক্রমণ করলে সেভিন পাউডার দিতে হয়। আগাছা পরিস্কার করতে হবে। বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার সময় ছাউনি দিতে হয়। সূর্যের আলো লাগানোর জন্য ছাউনি খুলে দিতে হবে।  অন্যান্য কপিজাতীয় ফললের তুলনায় ব্রাসেলস স্প্রাউট এর জীবনকাল দীর্ঘ হওয়ায় সারের মাত্রা একটু বেশী লাগে। ইউরিয়া সার ৩-৪ বারে দিতে হয়। ৪-৫টি আড়াআড়ি ভাবে জমি চাষ দিয়ে আগাছা পরিস্কার করে, মাটি নরম করে জমি তৈরি করতে হয়। মই দিয়ে জমি সমতল করতে হবে। জমি তৈরির সময় প্রতি হেক্টরে গোবর ৬ টন গোবর টিএসপি ৯০ কেজি ও এমপি ১২০ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ১৫০ কেজি লাগে। ইউরিয়া তিনভাগ করে এক ভাগ চারা রোপণের ৭ দিন পর ছিটিয়ে, ২য় ভাগ ২৫ দিন পর ও ৩য় ভাগ ৪০ দিন পর বন্ধনী পদ্ধতিতে গাছের চারদিকে দিতে হয়। 

 আগাম চাষে ভাদ্র-আশ্বিন। বিলম্বে রোপণের সময় কার্তিক-অগ্রহায়ণ। ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৬০ সেমি বা ২ ফুট, চারা থেকে চারার দুরুত্ব হবে ৪৫ সেমি বা ১.৫ ফুট। বিকেলে চারা রোপণ করা উচিত। চারা লাগানোর পর পর সেচ দিতে হয়। এরপর মাটির রসের অবস্থা বুঝে সেচ দিতে হয়। মাটি চাপড়া হলে বা শক্ত হলে নরম করতে হবে। আগাছা হওয়ার সাথে সাথে আগাছা দমন করতে হবে। গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে দু’সারির মাঝখান থেকে মাটি তুলে সারি বরাবর আইলের মত করে দিলে স্প্রাউট বড় হয়। জল জমলে নিকাশ করতে হয়।  দ্রুত ফলন পেতে চাইলে চারা লাগানোর দু মাস পর গাছে মাথা ভেঙে দিতে হবে। একে টপিং বলে। টপিং এর ফলে স্প্রাউট এর সংখ্যা কমে গেলেও স্প্রাউট এর আকার ও ওজন বাড়ে। ব্রাসেলস স্প্রাউটে রোগ বালাই অনেকটা বাধাকপির মতো। তাপমাত্রা বাড়লে গাছের বয়ষ্ক পাতায় অল্টারনারিয়া ছত্রাকজনিত দাগ ও ব্লাইট রোগ দেখা দেয়। আবার এক ধরনের লেদাপোকা অনেকসময় স্প্রাউটগুলো বাহির থেকে খেয়ে ফেলে। যথাযথ ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করে এগুলো সফলভাবে দমন করা যায়।

এই সবজি সঠিক ভাবে রান্না না করলে এর পুষ্টিমান অধিক হারে লোপ পায় বলে গবেষকগণ প্রমান করেছেন , তাছারা বেশি সেদ্ধ হয়ে গেলে ব্রাসেলস স্প্রাউট থেকে উটকো একটা গন্ধ আসে যেটার কারনে অনেকেই এই সবজি খাওয়া থেকে বিরত থাকেন , এই গন্ধের কারন হল সালফার বা গন্ধকের পরিমান , যেটা ব্রাসিকা পরিবারের সকল সবজির বৈশিষ্ট্য । গবেষনায় দেখা গেছে শুধুমাত্র ভাপিয়ে নিলে বা স্টারফ্রাই ( চট জলদি ভাজা ) করলে এর গুনগত মান প্রায় অক্ষুন্ন থাকে !  সামান্য বাটার বা ভোজ্য তেলে হালকা লবন দিয়ে মাঝারি জ্বালে চট জলদি ভাজা ভাজা ! বেশ মিষ্টি একটা ঘ্রান হয়, ইচ্ছে করলে ২ কাঁচামরিচ দিতে পারেন।  খেতে প্রায় বাধাকপির মতন তবে সামান্য মিষ্টি মিষ্টি ও বেশ সুস্বাদু লাগে ! অন্যান্য মশলা বা পেয়াজ / আলু দেওয়া যায় তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে চট জলদি রান্না হয় ! অনেকে এই মুকুলের বৃন্তের অংশ ছুরি দিতে সামান্য কেটে বা ফেড়ে নেয় সব্ দিকে সমান রান্না হওয়ার জন্য!