বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এর জীবনী

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এর জীবনী

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য Buddhadeb Bhattacharjee একজন ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতা এবং বর্তমানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) দলের পলিটব্যুরোর সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য  একজন প্রখ্যাত বাঙালি বামপন্থী রাজনীতিবিদ যিনি পশ্চিমবঙ্গের সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ২৪ বছর যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন।

এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সক্রিয় রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরে। শেষ কিছু বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দেশ এবং রাজ্য উভয়েই তার দল অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে ক্ষমতার অলিন্দে। তবে ব্র্যান্ড বুদ্ধ আজও অটুট!

১৯৪৪ সালের ১ মার্চ কলকাতায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। প্রখ্যাত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে তাঁর কাকা ছিলেন। মীরা ভট্টাচার্যের সাথে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিবাহ হয়।তাঁদের একটি কন্যা সন্তান আছে। বুদ্ধদেব শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় থেকে স্কুল জীবন শেষ করার পর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।

ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি বামপন্থী দল ‘সি পিআই’ (CPI) এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং সেই সাথে খাদ্য আন্দোলনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৬ সালে তিনি সি পি এম (CPM) দলে যোগদান করেন।পরে ১৯৬৮ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের ‘দ্য ডেমোক্রেটিক ইউথ ফেডারেশনে’র (The Democratic Youth Federation) সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। 

১৯৭১ সালে তিনি  সিপিএম পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সদস্য হন। ১৯৭৭ সালে বুদ্ধদেব প্রথমবারের জন্য উত্তর কলকাতা থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। সেই বছরই সিপিআইএম পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল হিসেবে নির্বাচিত হয় এবং জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হন।  ১৯৮২ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কংগ্রেসের প্রার্থী প্রফুল্ল কান্তি ঘোষের কাছে নির্বাচনে হেরে গেলেও পরের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি যাদবপুর কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন।

১৯৮৫ সালে  তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য (Member of Central Committee) হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি তিনি বামপন্থী সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং ১৯৯৬ সাল থেকে  ১৯৯৯ সাল অবধি তিনি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তাঁকে ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর বুদ্ধদেব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হন।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথম পাঁচ বছরে অনেক উন্নয়ন মূলক কাজ করেন যার মধ্যে শিল্প উন্নয়ন  প্রকল্প ছাড়াও বিভিন্ন ইনফরমেশন টেকনোলজি সেক্টরের (Information Technology Sector) কাজ সারা রাজ্য জুড়ে হয়। ২০০৩ সালে  তিনি নতুন আইটি (IT) নীতি আনয়ন করেন। ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে প্রায় সত্তর শতাংশ আইটি শিল্পের উন্নয়ন ঘটান এবং মূলত এই কারণে উইপ্রো (Wipro)  সংস্থার চেয়ারম্যান আজিম প্রেমজি তাঁকে দেশের সবথেকে দক্ষ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আখ্যা দেন এবং ইনফোসিস (Infosys) এর ফিনান্স ডিরেক্টর টি. ভি. মোহনদাস পাই বলেন যে ভারতে একুশ শতকের রেনেসাঁ কলকাতার হাত ধরেই হবে যেমনটি হয়েছিল উনিশ শতকে।

২০০৬ সালের নির্বাচনে সিপিআইএম(বামফ্রন্ট) বিপুল ভোটে জয়ী হয়। ২০০০ সালের  নির্বাচনে যেখানে তারা ১৯৯ টি আসন পেয়েছিল সেখানে ২০০৬ সালের নির্বাচনে তারা ২৩৫ টি আসন পায়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় মেয়াদে বেশ কিছু বিরূপ ঘটনা ঘটে যার ফলে পরের নির্বাচনে বামফ্রন্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়। বুদ্ধদেব দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর টাটা ন্যানোর কারখানা পশ্চিমবঙ্গে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। সেই মতো কলকাতার কাছেই সিঙ্গুরে তিনি সেই সংস্থাকে কারখানা তৈরির জমি প্রদান করেন।

এর পাশাপাশি তিনি নন্দীগ্রামেও কেমিক্যাল হাব (Chemical hub) গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যার ফলে সেখানকার চাষিদের জমি কারখানা তৈরির জন্য অধিগ্রহণ করে সরকার। এই অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন দেখা দিলে বামফ্রন্ট পার্টি রাজ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিপুল সমালোচনার সম্মুখীন হয়। সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সহ বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া লিবারেশন (Communist Party of India Liberation), পার্টি অফ ডেমোক্রেসি সোশালিজম (Party of Democratic Socialism) এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে।

এমনকি যেসব বামপন্থী দল সিপি আইএম এর সাথে যুক্ত ছিল যেমন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Communist Party of India), রেভলিউশনারি সোশালিস্ট পার্টি (Revolutionary Socialist Party), ফরওয়ার্ড ব্লক (Forward Block) সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করে এবং সিপি আইএমের সাথে জোট ভেঙে দেওয়ার কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও সেই ঘটনার নিন্দা করেন।

এরপর ২০০৭ সালে বুদ্ধদেবের নেতৃত্বাধীন সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নীতির আওতায় নন্দীগ্রামকে এনে সেখানে একটি রাসায়নিক কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেখানকার গ্রামবাসীদের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় যার ফলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে ১৪ জন গ্রামবাসী নিহত হন।  

২০১১ সালের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে বামফ্রন্ট হেরে যায় যার ফলে পশ্চিমবঙ্গে চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের সমাপ্তি ঘটে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যাদবপুর কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির সদস্য মনীশ গুপ্তের কাছে হেরে যান। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। তিনি বহু বিদেশী লেখক যেমন লেখা যেমন পাবলো নেরুদা এবং গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এছাড়াও তিনি বামপন্থা সম্বন্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। ২০১৫ সালে তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে পাকাপাকিভাবে অবসর নেন। 

রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে আদ্যপান্ত বাঙালি ভদ্রলোক চরিত্রের প্রতিভূ ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বামফ্রন্টের জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ছোঁয়া ছিল না তাঁর মধ্যে। জ্যোতি বসুর সার্থক উত্তরসূরি নন বরং তারুণ্যের নতুন হাওয়া এনেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের লাল দুর্গে। সেখানে সহজ বিচরণ ছিল নন্দন, লাইব্রেরির বই, সিনেমা উৎসব, বিদেশি কবিদের কবিতার অনুবাদ, নিখাদ রাজনৈতিক চর্চা।

কিন্তু ব্র্যান্ড বুদ্ধ সমস্যা আনল অন্যত্র। যেই বামফ্রন্টের আশা ভরসা ছিল কৃষি, গ্রামের মানুষ, বর্গাদার আন্দোলন যেখানে ছিল নির্বাচনী মার্কশিট জুড়ে সবচেয়ে সফল ভাবনা, সেখানে শিল্প গড়ার কারখানায় কোথাও না কোথাও শূন্যতা থেকে গেল। বিরোধীরা বলেন যে ব্র্যান্ড বুদ্ধ নিয়ে যত কথাই হোক, ব্যক্তি বুদ্ধদেব নিজেকে বদলাননি। ফলে সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানার জমি অধিগ্রহণ তৈরি করেছিল নতুন পটপরিবর্তন। 

১৯৭৭-৮২ : পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মন্ত্রিসভায় তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এই বিভাগ পরে তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ নামে পরিচিত হয়

১৯৮৭-৯৬ : ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, স্থানীয় শাসন, পৌর ও নগরোন্নয়ন বিভাগ

১৯৯১-৯৩ : ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পুর ও নগর উন্নয়ন বিভাগ (অগ্নি নির্বাপণ পরিষেবা বাদে)

১৯৯৪ : ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ

১৯৯৬ : ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র (আরক্ষা) বিভাগ, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ

১৯৯৯ : উপ-মুখ্যমন্ত্রী

নভেম্বর ৬, ২০০০ : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন

মে ১৮, ২০০১ : ত্রয়োদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন

মে ১৮, ২০০৬ : চতুর্দশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন

মে ১৯, ২০১১ : পঞ্চদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করেন

২০২২ সালে তিনি পদ্মভূষণ লাভ করলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন।