চৈতন্যদেব এর মৃত্যু রহস্য

চৈতন্যদেব এর মৃত্যু রহস্য

খুন নাকি আত্মহত্যা? সত্যিই কি জগন্নাথের দ্বারুবিগ্রহে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি নাকি তাঁর শবদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল পুরীর সমুদ্রে? বাংলার আধ্যাত্মিক ভাব-আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব Chaitanya Mahaprabhu শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘনীভূত রহস্য। আসলে ঠিক কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর? এ প্রশ্নের কোনও সদুত্তর আজও মেলেনি।

অথচ চৈতন্যের মৃত্যু রহস্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে খুন হয়ে যান চৈতন্য গবেষক ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায়। সে খুনেরও কোনও কিনারা হয়নি। বহু বহু বছর ধরে এভাবেই আড়ালে-অন্ধকারে রয়ে গেছে চৈতন্যদেব মৃত্যু রহস্য। ২০০০ সালে জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে পাওয়া কঙ্কাল কি সত্যিই নিমাইয়ের? উচ্চতার সাদৃশ্য তো একটি কথাই জানান দিয়ে যায় – খুন!

পুরীর অদূরে সাড়ঙ্গ দূর্গে কারা নিয়ে গিয়েছিল চৈতন্যকে? যদি খুনই হন তিনি, তাহলে হত্যাকারী কে? মধ্যযুগে যে কয়টি চৈতন্য-জীবনীকাব্য লেখা হয়েছে, সেখানেও চৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে কবিরা নীরব। তথ্য-প্রমাণের হদিশ খুঁজতে খুঁজতে একটার পর একটা অঙ্ক মেলানোর পরে রহস্যের জট তাহলে এতদিনেও খুলল না কেন!

বস্তুত একটা আস্ত ক্রাইম থ্রিলারের চরিত্র হয়ে উঠেছেন শ্রীচৈতন্যদেব আর থ্রিলারের প্রেক্ষাপটে চৈতন্যদেব হত্যা রহস্য। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় চৈতন্য গবেষক ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায়কে লেখা এক চিঠিতে লিখেছেন – ” মহাপ্রভু চৈতন্যদেবকে গুমখুন করা হয়েছিল পুরীতেই এবং সন্ন্যাসী চৈতন্যদেবের দেহের কোন অবশেষের চিহ্নও রাখা হয়নি কোথাও।

এবং তা হয়নি বলেই তিনটি কিংবদন্তী প্রচারের প্রয়োজনও হয়েছিল। … ঐ গুমখুনের সমস্ত ব্যাপারটাই একটা বহুদিন চিন্তিত, বহুজন সমর্থিত চক্রান্তের ফল। কে বা কারা এই চক্রান্ত করেছিলেন আমার অনুমান একটা আছে, কিন্তু তা বলতে পারব না। কারণ এখনও আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই।’ এ বক্তব্য থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে চৈতন্যের হত্যা রহস্য নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলে প্রাণনাশের সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কিন্তু একইসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায়ের চৈতন্যদেবের গুমখুনের তত্ত্বটিও ভাবনার রসদ জোগায়।

এই বক্তব্যে বলা হচ্ছে তাঁর দেহের কোনও অবশেষই অক্ষত রাখা হয়নি। কিন্তু ২০০০ সালে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র পক্ষ থেকে কয়েকজন প্রত্নতাত্ত্বিক জগন্নাথ মন্দিরের সংরক্ষণ করার সময় মন্দিরের গায়ের এক প্রাচীরের মধ্য থেকে খুঁজে পায় এক অস্বাভাবিক লম্বা মানুষের কঙ্কাল, উচ্চতায় যা প্রায় সাড়ে ছয় ফুট। অনেকেই সেই সময় মনে করেছিলেন যে বিভিন্ন কাব্যে, জীবনীতে চৈতন্যদেবের যে উচ্চতা সম্পর্কে জানতে পারা যায়, তার সঙ্গে সেই কঙ্কালের তো আশ্চর্য মিল।

তাহলে কী সেই কঙ্কাল চৈতন্যদেবেরই? এ প্রসঙ্গে বাংলা ভাষা ও বাঙালির ইতিহাসকার দীনেশচন্দ্র সেন ‘Chaitanya And His Age’ বইতে প্রথম লেখেন যে মন্দিরের মধ্যেই চৈতন্যকে গুমখুন করার পরে মন্দিরের ভিতরেই তাঁর মৃতদেহ পুঁতে ফেলা হয়েছিল। মাটি খোঁড়া এবং তা আবার আগের মত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত না আনা পর্যন্ত সেই সময় কাউকেই মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সম্ভবত রাজা প্রতাপরুদ্রের অনুমতিক্রমেই তাঁরা মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।

একইভাবে দীনেশ সেন তাঁর ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইতে তিনি লিখছেন – “সেদিন অপরাপর দিনের ন্যায় বেলা তিনটার সময় গুণ্ডিচা বাটীর দরজা খোলা হয় নাই। চৈতন্যর পার্শ্বচরগণ মন্দিরের দ্বারে ভিড় করিয়া ছিলেন। কিন্তু আটটা রাত্রিতে দরজা খুলিয়া পাণ্ডারা বলেন – মহাপ্রভু স্বর্গে গমন করিয়াছেন, তাঁহার দেহের আর কোন চিহ্ন নাই। বেলা তিনটা হইতে রাত্রি আটটা পর্য্যন্ত সেই গৃহে পাণ্ডারা খিল লাগাইয়া কি করিয়াছিলেন?… মন্দিরের মধ্যেই দেববিগ্রহের প্রকোষ্ঠ-সংলগ্ন বৃহৎ মণ্ডপের এককোণে তাঁহাকে সমাধি দেওয়া হয়।

প্রতাপরুদ্রের অনুমতি লইয়াই সম্ভবত ঐরূপ করা হইয়াছিল, যেহেতু উক্ত পুস্তকের একখানিতে লিখিত হইয়াছে, বহু পুষ্পমাল্য সেই মন্দিরের গুপ্তদ্বার দিয়া তখন লইয়া যাওয়া হইয়াছিল।… পুরীর পাণ্ডাদের মধ্যে আর একটি ভীষণ প্রবাদ প্রচলিত আছে – তাহা আমি তথায় শুনিয়াছি। জগন্নাথ বিগ্রহ হইতেও চৈতন্যের প্রতিপত্তি বেশি হওয়াতে পাণ্ডারা নাকি গোপনে তাঁহাকে হত্যা করিয়াছিল’। অদ্ভুতভাবে সেই কঙ্কাল পাওয়ার পরে তা নিয়ে কিন্তু খুব বেশি চর্চা হয়নি, এক অদৃশ্য সুতোর টানে সমগ্র ঘটনাটাই চাপা পড়ে যায়।

দৈনিক সংবাদপত্রগুলিও ঐ ঘটনা ছাপতে অস্বীকার করে। কিন্তু কেন? সন্দেহ থেকেই যায়। তবে, হত্যাই যদি হয়ে থাকে, যদি সত্যিই চৈতন্য খুন হয়ে থাকেন, তাহলে সেই খুনের ‘মোটিফ’ কী? অনেকেই বলেন পাণ্ডারা মনে করেছিল শ্রীচৈতন্যদেব নাকি সুলতান হোসেন শাহের চর, মুসলমানের চর। ফলে হিন্দুত্বের জিগির তুলে তাঁকে হত্যা করে পাণ্ডারা।

আবার অনেকে বলেন এই হত্যার পিছনে দায়ী ওড়িয়া ও বাঙালির বিবাদ। জয়ানন্দ মধ্যযুগে ‘শ্রীশ্রীগৌরসুন্দর’ নামে যে কাব্য লিখেছিলেন তাতে তিনি বলছেন যে রথের সামনে নৃত্য করতে করতে ইঁটের টুকরোয় আঘাতে তাঁর পা ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং পরে সেই ক্ষত থেকেই ধনুষ্টঙ্কার রোগের কারণে শ্রীচৈতন্যদেবের মৃত্যু হয়। জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যেও এই ঘটনা বর্ণিত আছে। জয়ানন্দ তাঁর কাব্যের এক জায়গায় লিখছেন – ‘আষাঢ় বঞ্চিত রথ বিজয়া নাচিতেইটাল বাজিল বাম পায়ে আচম্বিতে।

চরণে বেদনা বড় ষষ্ঠীর দিবসেসেই লক্ষ্যে টোটায় শয়ন অবশেষে।।’ এখানে রথযাত্রার সময় ইঁটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত পা নিয়ে টোটা গোপীনাথের মন্দিরে ছিলেন এবং সেখানেই  সেপ্টিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আবার ঈশ্বরদাস তাঁর ‘চৈতন্যভাগবত’-এ লিখেছেন যে চন্দনযাত্রার সময় ভাবাবিষ্ট চৈতন্যদেবের হাত থেকে চন্দনের পাত্র পড়ে যায়, জগন্নাথকে চন্দন দেওয়ার সময় তিনিই জগন্নাথের ব্যাপ্ত শ্রীমুখে প্রবেশ করেন এবং ক্রমে ক্রমে জগন্নাথের দেহে লীন হয়ে যান।

বিভিন্ন ওড়িয়া গ্রন্থেও শ্রীচৈতন্যের এইরূপ লীন হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকৃত হয়েছে। এই জগন্নাথ বিগ্রহের সঙ্গে লীন হয়ে যাওয়ার সঙ্গেই পুরীর মন্দিরের গর্ভগৃহে চৈতন্যকে বন্দি করে মেরে ফেলার কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন শ্রীচৈতন্যদেবকে জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহেই পাণ্ডারা বন্দি করেছিলেন আর তারপর তাঁর বিগ্রহে লীন হয়ে যাওয়ার খবর প্রচার করে সম্ভবত সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সাড়ঙ্গগড় দূর্গে।

মহানদী এবং প্রাচী নদীর নিকটবর্তী এই সাড়ঙ্গপুর দূর্গটি ওড়িশার সেনাপতি গোবিন্দ বিদ্যাধরের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এখানে ওড়িশার দক্ষিণাঞ্চলের মহারাজ প্রতাপরুদ্রের প্রভাব খুব একটা ছিল না। এই সাড়ঙ্গগড় দূর্গেই সম্ভবত শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু হয়। কৃষ্ণদাস কবিরাজ এবং জয়ানন্দ তাঁদের কাব্যে শ্রীচৈতন্যের বৃন্দাবনযাত্রার বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন – ‘প্রসিদ্ধ পথ ছাড়ি প্রভু উপপথে চলিলা / কটক  ডাহিনা করি বনে প্রবেশিলা’ এই পংক্তি থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রাকালে তিনি সম্ভবত অন্যত্র কোথাও চলে গিয়েছিলেন।

তাহলে কি বনের মধ্যেই ছিল সেই সাড়ঙ্গগড় দূর্গ? তিনি কি একাই ছিলেন নাকি তাঁকে জোর করে বন্দি করেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বনের মধ্য দিয়ে। অদ্ভুতভাবে চৈতন্য-জীবনীকারেরা কোথাও তাঁদের কাব্যের মধ্যে চৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে কোনও স্পষ্ট মন্তব্য করেননি, তাঁরা এ বিষয়ে সকলেই নীরব। তবে অনেক ঐতিহাসিক যেটা স্বীকার করেছেন তা হল, চৈতন্যের জীবনের শেষ দিকে তাঁর বিরোধী অনেক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল সেকালের বাংলায়।

এই চৈতন্য-বিরোধিতারই এক নিদর্শন সম্ভবত চৈতন্যের এই রহস্যময় মৃত্যু। আবার ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থে কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন যে চৈতন্যদেব সম্ভবত দিব্যোন্মত্ত অবস্থায় সমুদ্রের মধ্যে হেঁটে যেতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে সাগরের অতল গভীরে ডুবে যান। তবে এই সাগরে ডুবে যাওয়ার কাহিনির সঙ্গেই এক জেলের কাহিনিও জুড়ে আছে। অনেকের মুখে মুখেই প্রচলিত রয়েছে যে সেই জেলে নাকি তাঁর জাল দিয়ে মাছ ধরার সময় তার জালের মধ্যে শ্রীচৈতন্যদেবের দেহ উঠে এসেছিল যা ছিল লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬ ফুট থেকে ৭ ফুটের মধ্যে।

জেলেটি তখন তাঁর দেহ ডাঙায় তুলে বালি পরিষ্কার করে দেয় এবং তাঁর অনুগামীরাও এই সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে তাঁরা হরিনাম সংকীর্তন করেন চৈতন্যের কানের কাছে। অনেকক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে আসে তাঁর। ফলে এই কাহিনি থেকে শ্রীচৈতন্যদেবের মৃত্যুর পরিবর্তে পুনরায় বেঁচে ওঠার সম্ভাবনার কথা জানা যায়। ১৫৩৩ সালে চৈতন্যের মৃত্যু হয়েছে বলে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফলে এত বছর পরে এই রহস্যের কিনারা পাওয়া সত্যই দুষ্কর। কিন্তু বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসে আজও শ্রীচৈতন্যের মত এক মহান যুগপুরুষের মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য ঘনীভূত রয়েছে।