চারু মজুমদারঃ বাংলার বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা Charu Majumdar

চারু মজুমদারঃ বাংলার  বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা  Charu Majumdar

চারু মজুমদার ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি নিজের জীবন উত্সর্গিত করেছিলেন বামপন্থী শ্রমিক -কৃষকের জঙ্গী বিপ্লবী সংগ্রামে এবং ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বহু মত বহু পথের মধ্যে তিনিই প্রথম খুঁজে বার করেন মুক্তির একমাত্র পথকে, যে পথ কৃষি বিপ্লবের পথ।  চারু মজুমদার অধুনা সিপিআই এবং সিপিআই (এম) এর ভিতর আদর্শগত দুই লাইনের সংগ্রাম চালান সংসদীয় সুবিধাবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে যা তাঁর শহীদ হওয়ার প্রায় চল্লিশ বছর পরে সাধারণ মানুষের কাছে জলের মতন স্পষ্ট হয়ে গেছিল।

চারু মজুমদার সংগ্রাম করেন সিপিএমের বিপ্লব বিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে যা ব্যবহার করে জ্যোতি বোস -প্রমোদ দাসগুপ্ত চক্র যেনতেন প্রকারে মন্ত্রিত্ব দখলের রাজনীতি করতে শুরু করে বাংলার মাটিতে। ১৫ মে, ১৯১৯ জন্ম রাজশাহী জেলার হাগুরিয়া গ্রামে। পৈতৃক নিবাস শিলিগুড়ি। চারু মজুমদারের জন্ম হয়। ৭ কিংবা ৮ বছর বয়সে শিলিগুড়ির (দার্জিলিং জেলা) মহানন্দা পাড়ার পারিবারিক নিবাসে তাঁকে নিয়ে আসা হয়। শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে তাঁকে ভর্তি করা হয়। তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং ১৯৩৭ সালে পাবনার (অধুনা বাংলাদেশে) এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন।

তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষায় না বসে তিনি কলেজ ছেড়ে দেন এবং শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন। তিনি যেন আবার স্কুলজীবন ফিরে পান এবং নিজেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন। এরপর ১৯৩৮ সালে তিনি কংগ্রেস সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন। তাঁর পিতা বীরেশ্বর মজুমদার ছিলেন দার্জিলিং জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি। তাঁর মা উমাশঙ্করী দেবী ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল নারী এবং নানা সমাজসেবামূলক কাজ ও গণআন্দোলনে তিনি সাহায্য ও উৎসাহ যোগাতেন।

চারু মজুমদারের জীবনকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পূর্বে সাম্যবাদী ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে লেখাপড়া ত্যাগ করে জলপাইগুড়ি জেলায় তেভাগা আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯৩৬ সালে তার কর্মক্ষেত্র ছিলো জলপাইগুড়ি জেলা। ব্রিটিশ শাসনকালে ছয় বছর আত্মগোপন অবস্থায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। এ-সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ। ১৯৪২ সালে জলপাইগুড়িতে গ্রেফতার হয়ে দুই বছর নিরাপত্তা বন্দিরূপে কারাভোগের পর ১৯৪৪-এ মুক্তিলাভ করেন।

অতপর উত্তরবঙ্গে চা-বাগান শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ। ১৯৪৮ সালের ২৬ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে তিনি নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন এবং ১৯৫২-তে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৫২ সালে পার্টির সহকর্মী লীলা সেনগুপ্তকে বিবাহ করেন।  ১৯৫৭-তে নকশালবাড়ির কেষ্টপুরে চা-বাগিচার মালিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার অভিযোগে গ্রেফতার। প্রায় চার মাস কারা নির্যাতন ভোগ। ১৯৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধের সময়ে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেফতার। ১৯৬৩-তে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কংগ্রেস প্রার্থির কাছে পরাজিত।

চীন ও রাশিয়ার আদর্শগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পিকিংপন্থি নেতৃবৃন্দ সিপিআই (এম) গঠন করলে (১৯৬৪) তার সংগে একাত্মতা ঘোষণা। ১৯৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় গ্রেফতার। একই বছর মুক্তিলাভের পর সিপিআই (এম)-এর নামে একটি বিশেষ ঘোষণাপত্র প্রকাশ। সিপিআই (এম) নেতৃবৃন্দ কর্তৃক একে দলীয় কর্মসূচির পরিপন্থী আখ্যায়িত করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার। পরে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার। চারু মজুমদার দেখান যে একমাত্র সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে চলেই ভারতের কৃষক জনসাধারণ মুক্তি লাভ করতে পারেন সমস্ত শোষণ অত্যাচার থেকে এবং ভারতবর্ষকে প্রকৃত ভাবে স্বাধীন করা সম্ভব শুধুমাত্র গণ বিপ্লবের মাধ্যমে।

মাও জেদং এর নীতির ভিত্তিতে তিনি তুলে ধরেন গ্রামে গ্রামে জোতদার -জমিদার ও তাদের পেটোয়া রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে কৃষক যুদ্ধের লাইন, যা ষাটের দশকে লিন বিয়াও এর দ্বারা "জনযুদ্ধের জয় দীর্ঘজীবি হউক" পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়। এই লাইনের ভিত্তিতে তিনি রচনা করেন আটটি ঐতিহাসিক দলিলের যা সিপিএমের নির্লজ্জ রাজনীতির স্বরূপ সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রকাশ করে, এবং এই আটটি দলিলের ভিত্তিতেই তিনি নিজে লেগে থেকে গড়ে তোলেন দার্জিলিং জেলার তিনটি থানা অঞ্চলে কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রাম।

 পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের নির্বাচনে (১৯৬৭) কংগ্রেসকে পরাজিত করে বামফ্রন্ট জয়ী হলে সিপিআই (এম)-এর বামফ্রন্ট সরকারে যোগদানের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সিপিআই (এম)-এর সংগে তার বিরোধ বাধলে সিপিআই (এম) ত্যাগ। বামফ্রন্ট সরকারের অভিষেক অনুষ্ঠান (জুন ১৯৬৭) শেষ হওয়ার পরপরই তার ও কানু স্যান্যালের নেতৃত্বে দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি এলাকায় সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত। কৃষকদের জমির মালিকানার দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাঞ্চল, কেরালা ও পূর্ব উড়িষ্যায় এই সশস্ত্র আন্দোলনের ব্যাপকভাবে বিস্তারলাভ করে। 

এই সংগ্রামের স্ফুলিং পরে সারা ভারতে দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পরে যখন যুক্ত ফ্রন্টের গৃহ মন্ত্রী জ্যোতি বোসের পুলিশ ২৫ শে মে ১৯৬৭ তে গুলি চালায় নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক রমণীদের উপর। ১১ জন কৃষক রমনী, কৃষক ও শিশুর রক্তে সিক্ত নকশালবাড়ির মাটি সারা ভারতবর্ষে নকশালবাড়ির পথে কৃষি বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে দেয়, যাকে মাও জেদং এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি - ভারতে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ বলে অবিহিত করে।  

 চারু মজুমদার মধ্যবিত্তদের নায়ক হতে চাননি, তিনি কৃষককে - শ্রমিককে নায়ক তৈরী করার লড়াই করে গেছেন। তিনি ছিঁড়ে দিয়ে গেছেন সুবিধাবাদী সংসদীয় রাজনীতির মুখোস, যার ফলে আজ আর ভোট বাদী বাম ও ডান কেউই জনগণকে নির্বাচনী টোপ দিয়ে বেশিদিন ভাঁওতা দিতে পারছে না।  চারু মজুমদারের ফলেই পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত 'বাম' সরকার ঠেলায় পরে নম: নম: করে ভূমিসংস্কারের কাজ সারে এবং কৃষকদের বিদ্রোহ ঠেকাতে তিন স্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বানায়।  এই সব করা হয় জোতদার ও জমিদারদের কৃষকের বর্ষা মুখ থেকে বাঁচাতে।

 চারু মজুমদারের পারিবারিক জীবন ও জেল-জীবন তাঁর এই অত্যন্ত ব্যতিক্রমী গতিময় রাজনৈতিক জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁর দুই কন্যা ও এক পুত্রের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতা। শিক্ষক হয়ে তাদের পড়াশোনাও তিনি দেখিয়ে দিতেন। তিনি চাইতেন কোনো ইংরাজি ব্যাকরণ ও অভিধান ছাড়াই তারা ইংরাজি উপন্যাস পাঠ করুক। তিনি বলতেন, “এভাবেই তো ইংরাজি শিখতে হয়।” তিনি তাদের রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাবলী পাঠ করতেও উৎসাহ দিতেন। ধ্রুপদী সঙ্গীতের তিনি ছিলেন গভীর অনুরাগী।

রেডিওতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন নিয়মিত শ্রোতা। এই বিপ্লবী নেতাকে বহুবার কারাবন্দি থাকতে হয়েছে আর বন্দি জীবনকে তিনি গভীর অধ্যয়নের কাজে লাগাতেন। ১৯৬৪ থেকে জীবনের শেষ দিন অবধি তিনি হাঁপানির মতো দুরারোগ্য হৃদরোগ ও আরও নানান জটিল অসুখে ভুগতেন। তথাপি ১৬ জুলাই ১৯৭২ জীবনে শেষবারের মতো গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পর্যন্ত আত্মগোপন অবস্থায় বিপ্লবী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

কলকাতার কুখ্যাত লালবাজার লক-আপে 'জিজ্ঞাসাবাদের' সময় তাঁকে অমানুষিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু কোনো স্বীকারোক্তি অথবা বিন্দুমাত্র গোপন তথ্য তাঁর কাছ থেকে আদায় করা যায়নি। বিপ্লবের চূড়ান্ত জয় সম্পর্কে প্রগাঢ় প্রত্যয় নিয়ে এই মহান বিপ্লবী ২৮ জুলাই ১৯৭২ ভোর প্রায় ৪টের সময় মাথা উঁচু করে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মরদেহ এমনকি তাঁর পরিবারের হাতেও তুলে দেওয়া হয়নি। তাঁর পরিবারের নিকটতম সদস্যদের সঙ্গে রেখে পুলিশ তাঁর মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যায়।