ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৫ এর ইতিহাস 

ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৫ এর  ইতিহাস 

আইসিসি আয়োজিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতার সর্বশ্রেষ্ঠ আসর হল বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা যা ক্রিকেট বিশ্বকাপ নামে পরিচিত। ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ Cricket World 2015 ছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপের একাদশতম আসর। এই বিশ্বকাপের আসর ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। সর্বমোট ১৪টি দেশ এই খেলায় অংশগ্রহণ করেছিল। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া পঞ্চমবারের জন্য বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়েছিল।

আইসিসি আয়োজিত ২০১৫ সালের এই বিশ্বকাপে আইসিসির দশটি পূর্ণ সদস্য দল তো এমনিতেই বিশ্বকাপে খেলবার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। আসলে ২০১১ সালের বিশ্বকাপের পর আইসিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, উক্ত দশটি দলকে নিয়েই বিশ্বকাপ খেলা হবে। কিন্তু আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট দল এই সিদ্ধান্তের প্রবল সমালোচনা করে এবং তারা বলে যে, ২০০৭ এবং ২০১১ বিশ্বকাপে পাকিস্তান এবং ইংল্যান্ডের মতো দুটি পূর্ণ সদস্য টিমকে তারা হারিয়েছিল। সমালোচনার ফলে আইসিসি জুন মাসে নিজেদের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেয় এবং ঘোষণা করে দশটি দল ছাড়াও আরও চারটি দলকে নিয়ে বিশ্বকাপের আয়োজন করা হবে।

দশটি ছাড়াও বাকি চারটি দল আইসিসি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১১-১৩ টুর্নামেন্ট দ্বারা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১১ সালের বিশ্বকাপের মতোই ১৪টি দলক সাতটি করে দুটি গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয়। গ্রুপ ‘এ’-তে ছিল নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ড এবং গ্রুপ ‘বি’-তে ছিল ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ চারটি দল অর্থাৎ মোট আটটি দল চলে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে, সেখান থেকে মোট চারটি দল সেমিফাইনালে খেলে এবং অবশেষে দুটি দলের মধ্যে ফাইনাল হয়—এই ফরম্যাটেই ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার যে-সব ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয় সেগুলি হল: সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড, মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড, দ্য গাব্বা, অ্যাডিলেড ওভাল, ডব্লিউএসিএ গ্রাউন্ড, বেলেরিভ ওভাল এবং মানুকা ওভাল। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের যেসব স্টেডিয়ামে খেলা হয়েছিল, সেগুলি হল: ইডেন পার্ক, হ্যাগলি ওভাল, সেডন পার্ক, ম্যাকলিন পার্ক, ওয়েলিংটন রিজিওনাল স্টেডিয়াম, স্যাক্সটন ওভাল এবং ইউনিভার্সিটি ওভাল। ২০১৫ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি হয়েছিল হ্যাগলি ওভাল স্টেডিয়ামে এবং মুখোমুখি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। সেই ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ৯৮ রানে জিতেছিল৷

অন্যদিকে এই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি হয়েছিল মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এবং সেই ম্যাচে আয়োজক দুটি দেশ অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড মুখোমুখি হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে ম্যাচটি জিতে পঞ্চমবারের জন্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৫ বিশ্বকাপে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই আয়োজক দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। টসে জিতে নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক ব্র্যান্ডন ম্যাককালাম ব্যাটিং করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

নিউজিল্যান্ডের দুই ওপেনার মার্টিন গাপতিল এবং অধিনায়ক ম্যাককালাম খুব ভালো সূচনা করতে পারেননি। ম্যাককালাম নিজে ৩টি বল খেলে শূন্য রানে আউট হয়ে যান। তারপর কেন উইলিয়ামসন নামেন ব্যাটিং করতে। তিনিও খুব একটা আশাপ্রদ ইনিংস খেলতে পারেননি। এরপর রস টেইলর নেমে ইনিংসটিকে খানিকটা গতি দেন। ৭২ বল খেলে ৪০ রান করেন তিনি। তবে টেইলরের পর গ্রান্ট এলিয়ট নেমে নিউজিল্যান্ড দলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং পারফরম্যান্স করেন। তাঁর ৮২ বলে ৮৩ রান নিউজিল্যান্ডের আশা জাগিয়ে রাখলেও ৪৫ ওভারে ১৮৩ রানে অলআউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার বোলার জেমস ফকনার, মিচেল জনসন, জোশ হ্যাজেলউডদের দুর্দান্ত বোলিং স্তব্ধ করে দেয় নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের গতি। মিচেল স্টার্ক নেন ২টি উইকেট, ফকনার নেন ৩টি এবং মিচেল জনসন নেন ৩টি।

দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওপেন করতে নামেন ডেভিড ওয়ার্নার এবং অ্যারন ফিঞ্চ। অস্ট্রেলিয়াও প্রথমে ২ রানে অ্যারন ফিঞ্চের (৫ বলে ০ রান) উইকেট হারায়। তবে এরপর স্টিভ স্মিথ এবং ওয়ার্নার মিলে একটি চমৎকার ইনিংস খেলেন। ওয়ার্নার ৪৫ রান করে আউট হয়ে গেলে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক নামেন এবং স্মিথের সঙ্গে জুটি বেঁধে জয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান দলকে। ক্লার্ক ৭৪ রানে আউট হয়ে যান এবং স্মিথ ৫৬ রানে অপরাজিত থাকেন। মাত্র ৩৩ ওভার ১ বলে ৩ উইকেট হারিয়ে ১৮৬ রান তুলে পঞ্চমবারের জন্য অস্ট্রেলিয়া বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

৯ ওভার বল করে মাত্র ৩৬ রান দিয়ে ৩টি উইকেট নেওয়ার জন্য এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ান বোলার জেমস ফকনারকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ খেতাব দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার মিচেল জনসনও ৩টি উইকেট নিয়েছিলেন ম্যাচে। নিউজিল্যান্ডের গ্রান্ট এলিয়টই এই ম্যাচে সর্বোচ্চ রান করেছিলেন। ৫৪৭ রান করে নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিল ২০১৫ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রানের তালিকায় প্রথম স্থানে ছিলেন। ৫৪১ রান করে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন শ্রীলঙ্কার কুমার সঙ্গেকারা। তালিকায় প্রথম পাঁচে ভারতীয় ব্যাটসম্যান শিখর ধাওয়ানের নামও ছিল, তাঁর মোট রান ছিল ৪১২।

অন্যদিকে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় শীর্ষে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক, দ্বিতীয় স্থানে থাকা নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্টও স্টার্কের মতো ২২টিই উইকেট নিয়েছিলেন। তবে স্ট্রাইকরেটের দিক থেকে ভাল অবস্থানে থাকার কারণে মিচেল স্টার্কের নাম প্রথম স্থানে ছিল। তালিকায় তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে দুই ভারতীয় বোলার উমেশ যাদব (১৮টি উইকেট) এবং মহম্মদ শামির (১৭টি উইকেট) নাম ছিল। অস্ট্রেলিয়ান বোলার মিচেল স্টার্ককেই ২০১৫ বিশ্বকাপের প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ খেতাব দেওয়া হয়েছিল।

গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে বিধ্বংসী বোলিং করবার জন্য এবং বিশেষত কোয়ার্টার ফাইনাল ও ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দারুণ বোলিং করে অস্ট্রেলিয়াকে জয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই স্টার্ককে এই খেতাব দেওয়া হয়। এই বিশ্বকাপে কয়েকজন খেলোয়াড়ের কথা বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন। প্রথমত বলতে হয় শ্রীলঙ্কার কুমার সঙ্গেকারার কথা। যিনি এই বিশ্বকাপে পরপর চারটি ম্যাচে চারটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। একদিবসীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।

এই বিশ্বকাপে যে-দুজন ডবল সেঞ্চুরি করেছিলেন তাঁদের কথাও বিশেষভাবে বলতে হয়। একজন হলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল এবং অন্যজন মার্টিন গাপতিল। গেইল ২১৫ রান করেছিলেন একটি ম্যাচে এবং গাপতিল করেছিলেন ২৩৭ রান। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার তিলকরত্ন দিলশন অস্ট্রেলিয়ার মিচেল জনসনকে এক ওভারে ছয়টি চার মেরেছিলেন। ২০১৫ বিশ্বকাপে কিছু বিতর্কও দানা বেঁধেছিল। আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের গ্রুপপর্বের একটি ম্যাচে জিম্বাবুয়ের শন উইলিয়ামসের  মারা একটি শটকে বাউন্ডারি লাইনের একদম ধার ঘেঁষে ক্যাচ নেন আয়ারল্যান্ডের জন মুনে।

মুনের পা বাউন্ডারি লাইনকে স্পর্শ করেছিল কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল, কিন্তু উইলিয়ামস ক্রিজ ছেড়ে হেঁটে চলে যেতে শুরু করলে আম্পায়ার সত্যতা বিচার না করেই আউটের সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচে একটি ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। রোহিত শর্মা বাংলাদেশের রুবেল হুসেনের একটি ফুল টস বলে ক্যাচ আউট হলে আম্পায়ার অতিরিক্ত উপরে ফুল টসের জন্য নো বলের সিদ্ধান্ত দেন এবং রোহিত শর্মাকে নট আউট থাকেন। পরে আইসিসির বাংলাদেশী প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামাল, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন আম্পায়ারের ভুলের জন্য ভারত ম্যাচটি জিতেছে।

গ্রুপপর্বের অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের ম্যাচেও একটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। ইংল্যান্ডের জেমস টেইলরকে এলবিডব্লুতে আউট দেওয়ার পরেই সেই বলেই ইংল্যান্ডের জেমস এন্ডারসন রান আউট হন। যেহেতু টেইলরের এলবিডব্লু আউটটি রিভিউ করা হয়েছিল, তাই পরে আইসিসি স্বীকার করে, ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম প্লেয়িং কনডিশন অনুযায়ী বলটিকে ডেড বল ঘোষণা করা উচিত ছিল এবং জেমস এন্ডারসনকে অনৈতিকভাবে আউট দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ-এ ভারতের আবার কাপ জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

গোটা টুর্নামেন্টে তারা অসাধারণ পারফর্ম করে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। রোহিত শর্মা, সুরেশ রায়নাদের ব্যাটে ও বিশেষত মহম্মদ শামি এবং উমেশ যাদবদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে এবং মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্বে  বিশ্বকাপ জয়ের আশা জেগে উঠেছিল কিন্তু সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১০৬ রানের দীর্ঘ ব্যবধানে হেরে ভারতের সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ফাইনাল ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে এবং নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়দের কাঁদিয়ে পঞ্চমবারের জন্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

আরো পড়ুন      জীবনী  মন্দির দর্শন  ইতিহাস  ধর্ম  জেলা শহর   শেয়ার বাজার  কালীপূজা  যোগ ব্যায়াম  আজকের রাশিফল  পুজা পাঠ  দুর্গাপুজো ব্রত কথা   মিউচুয়াল ফান্ড  বিনিয়োগ  জ্যোতিষশাস্ত্র  টোটকা  লক্ষ্মী পূজা  ভ্রমণ  বার্ষিক রাশিফল  মাসিক রাশিফল  সাপ্তাহিক রাশিফল  আজ বিশেষ  রান্নাঘর  প্রাপ্তবয়স্ক  বাংলা পঞ্জিকা