ক্রিপ্টোকারেন্সি| বিশদে আপনার যা জানা দরকার

ক্রিপ্টোকারেন্সি|  বিশদে আপনার যা  জানা দরকার

ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ধরনের সাংকেতিক মুদ্রা যার কোন বাস্তব রূপ নেই। এর অস্তিত্ব শুধু ইন্টারনেট জগতেই আছে। এটি ব্যবহার করে লেনদেন শুধু অনলাইনেই সম্ভব যার পুরো কার্যক্রম ক্রিপ্টগ্রাফি নামক একটি সুরক্ষিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। প্রাচীনকালে মুদ্রা ছিল না, ছিল বিনিময় প্রথা। তারপরে মুদ্রার প্রচলন হওয়ায় সেটাই নানা বিবর্তনের মাধ্যমে আজও চলছে, এসেছে কাগজে ছাপা অর্থমূল্য যাকে ‘নোট’ বলা হয়, এসেছে কার্ড। আর আজ প্রযুক্তির গগনচুম্বী উন্নতির যুগে দাঁড়িয়ে ঘরে বসে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে অর্থের লেনদেন সম্ভব যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল মানি’। এই পদ্ধতিরই একটি রূপ হল ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency)।

এখন প্রশ্ন হল, ক্রিপ্টোকারেন্সি কী? আন্তর্জালে বা সংবাদমাধ্যমে বিটকয়েনের (Bitcoin) সম্পর্কে অনেকেই শুনে থাকবেন বা বিটকয়েন কেমন দেখতে তা দেখে থাকবেন। প্রাথমিকভাবে খুব সহজ করে বলা যায়, এই বিটকয়েন হল একপ্রকার ক্রিপ্টোকারেন্সি। তবে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি আরও নানা প্রকার হয়। আসুন জেনে নেওয়া যাক ক্রিপ্টোকারেন্সির খুঁটিনাটি। ক্রিপ্টোকারেন্সি বলতে আসলে একপ্রকার সাংকেতিক মুদ্রাকে বোঝায় যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ এই ক্রিপ্টোকারেন্সি হল ডিজিটাল কারেন্সি। এর মাধ্যমে কেবলমাত্র ইন্টারনেটেই অর্থ আদানপ্রদান সম্ভব। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ছবিতে ঐ বিটকয়েন দেখা গেলেও বাস্তবে হাতের উপর সেই কয়েন রাখা বা ধরার কোনো অবকাশ নেই।

যেভাবে আমরা এখন ঘরে বসে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করি, এটাও মূলগতভাবে সেই ধরনেরই পদ্ধতি। তবে এর কার্যপদ্ধতি বা বৈশিষ্ট্য অনেক জটিল ও ব্যাপ্ত। এই ক্রিপ্টোকারেন্সি শব্দটির বিশ্লেষণ করলে দুটি পৃথক শব্দ পাওয়া যায় – ক্রিপ্টো (Crypto) আর কারেন্সি (Currency)। ‘ক্রিপ্টো’ কথার অর্থ হল গুপ্ত বা অপ্রকাশিত আর ‘কারেন্সি’ শব্দের অর্থ মুদ্রা। এই অর্থ থেকেই আন্দাজ করা যায় যে, এই ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থের লেনদেন সম্পূর্ণ গুপ্ত থাকে, বাইরের কেউ তা জানতে পারে না। এটিকে বলা হয় পিয়ার টু পিয়ার (Peer to Peer System) ব্যবস্থা যাতে এই অর্থের আদানপ্রদান শুধুমাত্র দুই পক্ষের মধ্যেই ঘটে, তৃতীয় কোনো ব্যক্তি এই তথ্য জানতেও পারে না বা এই পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করতেও পারে না।

অনেকটা ফেসবুক বা হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করার সময় যেমন উভয়পক্ষের মধ্যে ‘এনক্রিপশন’ থাকে, সেইরকম। এনক্রিপশন পদ্ধতিতে দুই পক্ষের মধ্যে যে তথ্য বিনিময় হয় তা সুরক্ষিত করা হয় যাতে তা তৃতীয় পক্ষ দেখতে না পায়। এই ক্রিপ্টোকারেন্সির আদানপ্রদান করা হয় যে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে তাকে বলা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি (Cryptography)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতির মাধ্যমে গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হত। পরে এই ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতির সাহায্য নিয়েই ক্রিপ্টোকারেন্সির আদানপ্রদান করা হয়।

আমেরিকান ক্রিপ্টোগ্রাফার ডেভিড চম (David Chaum) ১৯৮৩ সালে ‘ডিজিটাল মানি’-র উদ্ভাবন করে প্রথম আন্তর্জালের মাধ্যমে অর্থ আদানপ্রদান করেন। সেই ডিজিটাল অর্থের নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ই-ক্যাশ’ (E-cash)। ১৯৯৫ সালে ‘ডিজি-ক্যাশ’-এর মাধ্যমে ডেভিড চম এর প্রয়োগ শুরু করেন। এই ডিজিক্যাশের আদানপ্রদানের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার এবং বিশেষ সংকেত প্রয়োজন হত। ক্রমে এই ক্রিপ্টোগ্রাফির সাহায্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্ভাবনের প্রয়াস শুরু হয়ে গেল নানা দেশে। ১৯৯৮ সালে ওয়ে ডে (Wei Dai) ‘বি-মানি’ (B-Money) নামে একটি বৈদ্যুতিন অর্থ বিনিময়ের ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেন যা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত (Encrypted)। আরো পরে ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো (Satoshi Nakamoto) তৈরি করেন বিটকয়েন।

যদিও এই নামটি আসল নয় কারণ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবস্থায় সর্বদা ছদ্মনামে-বেনামে কার্যক্রম চলে। এই বিটকয়েনই এখন বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলির মধ্যে সারা বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। এই বিটকয়েন ছাড়াও আরো বেশ কয়েকরকমের ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন সারা বিশ্বে প্রচলিত রয়েছে। সেগুলির মধ্যে ইথেরিয়াম (Ethereum), রিপ্‌ল (Ripple), লাইট কয়েন (Lite Coin), মনেরো (Monero), ডোজ কয়েন (Dogecoin), বাইন্যান্স কয়েন (Binance coin), পোলকাডট (Polkadot), ইউনিসোয়্যাপ (Uniswap) ইত্যাদি। এগুলির মূল্য বাজারের উপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। তাই এর অর্থমূল্যের উপর কোনো দেশের সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় চিন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, বলিভিয়ার মতো বিশ্বের অনেক দেশ এই ক্রিপ্টোকারেন্সির আদানপ্রদানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আবার আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, এল সালভাদোর প্রভৃতি দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির আদানপ্রদানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ভারতে বিটকয়েনের আদানপ্রদানে বিশেষ কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এবারে জানা দরকার ক্রিপ্টোকারেন্সির কাজের পদ্ধতি ঠিক কেমন। এ প্রসঙ্গে দুটি পরিভাষা রয়েছে – মাইনিং (Mining) আর ব্লক-চেন (Block-Chain)। যে বিশেষ জটিল গণনা প্রক্রিয়ায় ক্রিপ্টোকারেন্সির ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি করা যায় তাকে বলা হয় মাইনিং। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে যে অসংখ্য কম্পিউটার রয়েছে সেগুলির সঙ্গে সংযুক্ত এক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই মাইনিং পদ্ধতি চলে, ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় পর্যবেক্ষণ করা হয়।

মাইনাররা উভয়পক্ষের মধ্যে সকল আদানপ্রদানের তথ্য সুরক্ষিত রাখেন এবং সব ধরনের বিনিময়কে বৈধতা দেন। আর অসংখ্য কম্পিউটার যে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে তাকে ব্লক-চেন বলা হয়। এই বিস্তৃত ব্লক-চেন প্রতিটি বিনিময়কে বৈধতা দেয় এবং এর মধ্যেই সমস্ত তথ্য সঞ্চিত থাকে। বিশ্বের যে কোনো স্থান থেকেই ব্লক-চেনে সঞ্চিত তথ্য দেখা যায়। ব্লক-চেনে প্রতিটি সুরক্ষিত অর্থ লেনদেন চলে কিছু ভার্চুয়াল টোকেনের (Virtual Token) সাহায্যে। এই আদানপ্রদানের ফলে প্রাপ্ত কারেন্সি জমা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেটে (Cryptographic Wallet) যা থেকে অর্থ প্রেরণ করা যায়, আবার প্রেরিত অর্থ প্রাপকের ওয়ালেটেই জমা হয়। প্রতিটি ওয়ালেট একটি নির্দিষ্ট এনক্রিপ্টেড সংকেত বা ঠিকানা বিশিষ্ট হয়ে থাকে যা মূলত তৈরি হয়ে থাকে হ্যাশ-ফাংশানের (Hash-function) সাহায্যে।

তবে এই কোড প্রতিমুহূর্তে বদলে ফেলা যায়। প্রথম আবিষ্কৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের হ্যাশ ফাংশান কোড ছিল – SHA-256। এই সমস্ত কোডই তৈরি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে। ক্রিপ্টোগ্রাফির লেনদেন যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বলে অনেকেই মনে করেন কারণ প্রাপক বা প্রেরক কারো সঠিক পরিচয়ই এই ব্যবস্থায় পাওয়া যায় না। এখানে অ্যাকাউন্ট খুলতে কোনো পরিচয়-প্রমাণ দিতে হয় না। আবার যেহেতু ইন্টারনেটের মধ্যেই সব তথ্য সঞ্চিত থাকে তাই কোনো সময় কম্পিউটার পরিষেবা বিঘ্নিত হলে অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য সঞ্চিত না থাকলে বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আবার সাইবার-ক্রাইমের ফলে তথ্য চুরির আশঙ্কাও রয়েছে। সবথেকে ঝুঁকির দিক হল এই অর্থ লেনদেন সম্পূর্ণভাবে অফেরৎযোগ্য, অর্থাৎ একবার ভুল কোডে বা ভুল ঠিকানায় পাঠানো হয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না।

রোবোকয়েনের প্রতিষ্ঠাতা জর্ডান কেলি (Jordan Kelley) ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বিটকয়েনের এটিএম খোলেন। ক্রমে অস্টিন প্রদেশেও একটি এটিএম স্থাপিত হয় যা ব্যবহারকারীর ড্রাইভিং লাইসেন্স আর পাসপোর্ট স্ক্যান করতে পারে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ভারতের ‘রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া’ (Reserve Bank of India) বিটকয়েনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও পরে সুপ্রিম কোর্ট এই নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশিকা পাঠিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়ে দিয়েছিল, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন করে এমন কোনও অ্যাপে টাকা ট্রান্সফার করতে পারবে না কোনও ব্যাঙ্ক। তার ফলে সরাসরি ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ না হলেও এর লেনদেন বন্ধ হয়ে যায় ভারতে। এ বার পাকাপাকি ভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বন্ধ করতে বিল আনার প্রক্রিয়া কেন্দ্র শুরু করেছে বলে সরকারি সূত্রে খবর। আর এই খবর সামনে আসতেই রেকর্ড উচ্চতা থেকে অনেকটাই দাম পড়ল বিটকয়েনের।ক্রিপ্টোকারেন্সি বাস্তবে দেখা যায় না। কেবলমাত্র অনলাইনেই এর অস্তিত্ব রয়েছে।নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বলেই এটিকে বিপজ্জনক মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাই আইন নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা চলছে।