দক্ষিণ রায় এর জীবনী

দক্ষিণ রায় এর জীবনী

কথায় বলে ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’। সুন্দরবনের গহন অরণ্য-অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষদের কাছে এ প্রবাদ একেবারে জীবন দিয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতার সামিল। জীবিকার দায়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে হয় যাদের, তাদের মনে বাঘের ভয় আর যারা মাছ ধরতে ডিঙি নিয়ে যায় মোহনার দিকে, তাদের মনে উঁকি দেয় কুমিরের তীক্ষ্ণ দাঁতের ভয়াল ছবি। ভয় থেকেই দেবতার জন্ম। সাগরে যাওয়া মাঝিদের যেমন ‘আলি-বদর’, তেমনি সুন্দরবনের মউলিদের কাছে বাঘের দেবতা হয়ে ওঠেন ‘ দক্ষিণ রায় ’(Dakshin Roy)।

নাগরিক সমাজ থেকে অনেক অনেক দূরে বহু কাল আগে থেকে জল-জঙ্গলের মধ্যে মানুষের বিশ্বাসে জন্ম নিয়েছে এই দক্ষিণ রায় আর বনদেব।    বাঘরূপী অপশক্তির প্রতীক দক্ষিণ রায়ের আরেক নাম রায়মণি। এ এক অদ্ভুত আঁধার-মাখা দৈবী উপাখ্যান। লোকপুরাণ, লোকবিশ্বাসে ভরা সুন্দরবনের অনন্য দুনিয়ার বাঘ-রাজা দক্ষিণ রায় বনের দানবদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে লোকের বিশ্বাস।

আর বনবিবির সঙ্গে তাঁর নিত্য বিরোধের কথাও লোকমুখে প্রচারিত হয়। ‘সাগরসঙ্গম সুন্দরকায় / শার্দূলবাহন দক্ষিণরায়..’ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সুন্দরবনের গহন অরণ্যের ভিতরে আজও শোনা যায় দক্ষিণ রায়ের পূজার এই ধ্যানমন্ত্র। খাঁড়ি, বাদাবন আর জঙ্গলে জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢুকলে বাঘের হাত থেকে বাঁচতে সুন্দরবনের মানুষ পুজো করেন দক্ষিণ রায়ের।

আর তাই লোকদেবতা এই দক্ষিণ রায়কে নিয়ে প্রচারিত হয়েছে নানা কাহিনি। বাংলা সাহিত্যে কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল কাব্য’-এ, মরহুম মুনশী খাতেরের লেখা ‘বোনবিবির জহুরানামা’ কিংবা খোদা নেওয়াজের লেখা ‘পীর গোরাচাঁদের কেচ্ছা’য় দক্ষিণ রায়কে একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিটি কাব্যেই বলা হচ্ছে দক্ষিন রায় হলেন আঠারো ভাঁটির ঈশ্বর। পীর গোরাচাঁদকে সেই আঠারো ভাঁটির কিছু অংশ দিয়ে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন দক্ষিণ রায় আর বনবিবির শত্রুতা থেকে রক্ষা পেতে তিনি বনবিবিকেও কিছু অংশ দান করেন। কাব্যে কবিরা বলছেন, দক্ষিণ রায়ের সবথেকে প্রিয় বিষয় হল নরবলি পূজা।

বাঘ আর কুমির সেনা তাঁর অনুগত। সুন্দরবনের মোম, কাঠ, মধু, সবই তাঁর আওতায়। ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যের কাহিনিতে বলা হচ্ছে পুষ্পদত্ত পিতার খোঁজে যাবার জন্য নৌকা বানাতে রতাই বাউল্যাকে বলেন বন থেকে কাঠ কেটে আনার জন্য। আর রতাই সেই কাঠ কাটার সময় যে বড় গাছটা কাটে তাঁর নীচেই ছিল দক্ষিণ রায়ের থান। এতে দক্ষিণ রায় রেগে গিয়ে ছয়টি বাঘ পাঠিয়ে রতাইয়ের ছয় ভাইকে মেরে ফেলে। রতাই আত্মহত্যা করতে গেলে দক্ষিণ রায় দৈববাণীতে বলেন পুত্রকে বলি দিয়ে দক্ষিণ রায়ের পূজা করতে।

সেই পূজায় দক্ষিণ রায় তখন খুশি হয়ে রতাইয়ের মৃত ভাইদের জীবিত করে তোলেন। অনেকে আবার এই দক্ষিণ রায়কে জমিদার মদন রায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। মদন রায় এবং দক্ষিণ রায়ের উভয়ের মায়ের নাম নারায়ণী। ধপধপিতে গেলে দেখা যাবে আজও সেখানে পরম বিশ্বাসে দক্ষিণ রায় পূজিত হন। সেখানকার লোকবিশ্বাসে রয়েছে, দক্ষিণ রায়ের বাবার নাম সুধীররঞ্জন রায় যিনি মুর্শিদাবাদের রাজা মুকুট রায়ের সেনাপতি ছিলেন।

পাঠানরা যখন আক্রমণ করে মুর্শিদাবাদ, তখন মুকুট রায় পরাজিত হলে দক্ষিণ রায় পালিয়ে যান এবং সুন্দরবনের কেঁদোখালিতে আশ্রয় নেন। এই দক্ষিণ রায়ের আরেক ভাই কালীরঞ্জন রায় মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে কালু গাজী নামে পরিচিত হন। বনবিবি, দক্ষিণ রায় আর কালু গাজীকে নিয়েও একটি সুন্দর গল্প প্রচলিত আছে জনশ্রুতিতে। আঠারো ভাঁটির দেশের রাজা দক্ষিণ রায় কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। যে তাঁর রাজত্বের পেটের টানে ঢুকবে তাকেই তিনি পেটে পুরবেন খেয়ে।

একবার সেখানে আসে বনবিবি আর তাঁর ভাই শাহ জংলি। যুদ্ধ হয় খুব। যুদ্ধে বনবিবি আর তাঁর ভাইয়ের কাছে হেরে যান দক্ষিণ রায়। ফলে উভয়ের মধ্যে একটা চুক্তি হয় যে, বাদাবনের মনুষ্য-অধ্যুষিত অঞ্চলে মানুষদের রক্ষা করবেন বনবিবি আর একেবারে দক্ষিণ দেশের জলে-জঙ্গলে বিরাজ করবেন দক্ষিণ রায়। সুন্দরবনের মানুষকে জীবিকার তাগিদে যেতেই হবে জঙ্গলে আর সেই সময় তাঁদের রক্ষা করবেন বনবিবি। ফলে সেই আঠারো ভাঁটির দেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় বনবিবি আর দক্ষিণ রায়ের মধ্যে।

দক্ষিণ রায়ের বাহন কোথাও বাঘ, কোথাও ঘোড়া। বারুইপুর থানার অন্তর্গত ধপধপি গ্রামে দক্ষিণ রায়ের মূর্তিটি এক সুপুরুষ রাজযোদ্ধার মতো, তাঁর হাতে বন্দুক, কোমরে তরবারি। মূর্তির পিছনে দেখা যায় ত্রিশয়ল, তীর-ধনুক, কুঠার, ঢাল ইত্যাদি অস্ত্র। সাদা ওড়না কাঁধে, সাদা ধুতি আর পায়ে নাগরা জুতো পরে দক্ষিণ রায় পূজিত হন। তবে মূলত দুই রকমের মূর্তি দেখা যায় দক্ষিণ রায়ের – একটিকে বলে দিব্যমূর্তি আর অন্যটি হল বারামূর্তি। বারামূর্তিতে একটি তিন কোনা মুকুট দেখা যায় দক্ষিণ রায়ের মাথায় আর চোখের টানা ভ্রু, টানা গোঁফ আর দু পাটি লম্বা লম্বা দাঁত মুখ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

সাধারণভাবে লোকসংস্কৃতির গবেষকরা মনে করেন গোঁফযুক্ত পুরুষমূর্তিটিই আসলে দক্ষিণ রায়ের বারামূর্তি। তাঁর পূজা মূলত মাঘ মাসে হয়ে থাকে। দিনের বেলায় পুজোর সময় লম্বা বাঁশের মাথায় আগুন জ্বেলে চারদিকে ঘোরানো হয়। লোকের বিশ্বাস যে সেই আগুন যতদূর পর্যন্ত দেখা যাবে ততদূর পর্যন্ত হিংস্র প্রাণী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব কেউই প্রবেশ করতে পারে না। দক্ষিণ রায়ের পূজায় ফলমূলের পাশাপাশি পোড়া মাছ, মাংস দেওয়া হয় নৈবেদ্য হিসেবে।

হিন্দুরা এর পুজোয় ছাগল বলি দেয় আর মুসলমানরা হাঁস-মুরগি বলি দেয়। দক্ষিণ রায়ের পুজোর আবার অনেক রকমফের আছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় একটি মাটির বেদির উপর দুটো  বারামূর্তি বসিয়ে একটি সরা উপুড় করে বসানো হয়, সামনে থাকে একটি ছোটো ঘট। শোলার ফুল দিয়ে সাজানো হয় সেই বেদি। একটি শোলার ফুল বেঁধে দেওয়া হয় বারাঠাকুরের মাথায়।

একে স্থানীয় ভাষায় ‘ঝারা’ বলে। মাঠে, জঙ্গলে, গাছের নীচে এই পুজো হয় আর পুজোর পর মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হয় না, বরং ওখানেই দিনের পর দিন থাকতে থাকতে নষ্ট হয়। উত্তর চব্বিশ পরগণার দিকে আবার এই পুজোর ক্ষেত্রে মূর্তির বদলে ঘট ব্যবহৃত হয়। জিউলি গাছের তলায় পঞ্চগুঁড়ি, পঞ্চশস্য, ফুল, দুব্বো, আবির ইত্যাদি দিয়ে মাটির বেদির উপরে দক্ষিণ রায়ের বারামূর্তি বসিয়ে পুজো করা হয়। আরেকটি পুজো হয় ভালো শস্যের উৎপাদনের আশায় বৃষ্টি কামনায় যাকে দক্ষিণ রায়ের হাঁতাল পূজা বলা হয়।

ধপধপি গ্রামে এই পুজোর প্রচলন রয়েছে আজও। শোনা যায় গভীর রাত্রে মশাল জ্বালিয়ে মদ-মাংস-গাঁজা সহ এই পুজো করা হতো আগে। পুজোয় বলি দেওয়া হতো ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি। পুজোর সময় জোরে ঢাক-কাঁসর বাজতো। এখন যদিও এভাবে পুজো হয় না। আগে ব্রাহ্মণরা এই পুজো করতেন না, কিন্তু এখন দক্ষিণ রায়ের মন্দিরে ব্রাহ্মণরাই এই পুজো করেন। বাঘের হাত থেকে বাঁচতে, হিংস্র পশুর হাত থেকে বাঁচতে যে পুজোর সূত্রপাত তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে আরো নানা ক্ষেত্রে।

দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্যেও অনেকে এই দক্ষিণ রায়ের পুজো করেন, মানত করেন আর এই লোকবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে ধপধপিতেই বিখ্যাত হয়ে গেছে ‘বাবার ওষুধ’ যা নাকি সর্বরোগ নিরাময়কারী। বহু মানুষ নিছক অন্ধবিশ্বাসে এই ওষুধ সেবন করেন, পরে সুস্থ হলে বাবার মন্দিরে এসে সোনার পদক, আংটি, লকেট, সোনার ত্রিশূল ইত্যাদি দিয়ে মানত রক্ষা করে থাকেন।

দক্ষিণ রায়ের পুজো এখন মনস্কামনা পূরণের পুজোয় পর্যবসিত হয়েছে। তবে দক্ষিণ রায়ের গান, দক্ষিণ রায়ের পালা, রায়মঙ্গল পালা আজও অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় সুন্দরবনের গহন অরণ্যের মধ্যে। সে যেন এক আলাদা জাদুবিশ্বাসের জগত। মধু আনতে, কাঠ কাটতে আজও মানুষের বিশ্বাসে দক্ষিণ রায়ের পুজো করে তাকে সন্তুষ্ট করে জঙ্গলে যান মউলিরা।