দৌলত সিং কোঠারি এর জীবনী

দৌলত সিং কোঠারি এর জীবনী

দৌলত সিং কোঠারি (Daulat Singh Kothari) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ তথা আদর্শ শিক্ষক,বহুমুখী প্রতিভাধর,গুণী ও অসাধারণ বিচক্ষণ এক বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি ডি এন কোঠারি নামেই বেশী পরিচিত। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই তাঁর যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে তিনি অনেকগুলি সংস্থার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন যার মধ্যে ইউজিসি (UGC),এনসিইআরটি (NCERT) অন্যতম। তাঁর কাজগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘ডিফেন্স সায়েন্স সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠা। ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞান(Ballistic Science), বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি(Electronic Materials, তথা আণবিক ওষুধ(Nuclear Medicine) ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি ডিফেন্স সায়েন্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।

এক অর্থে তাঁকে ভারতের ‘প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানের স্থপতি’ বলা যায়। ১৯০৬ সালের ৬ জুলাই রাজস্থানের উদয়পুরে দৌলত সিং কোঠারির জন্ম হয়। সেই সময় উদয়পুর রাজস্থানের মেবার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর বাবা শ্রী ফতেহ লাল কোঠারি ছিলেন একজন বিদ্যালয় শিক্ষক। ১৯১৮ সালে আটত্রিশ বছর বয়সে প্লেগ মহামারিতে তিনি মারা যান।

পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জেষ্ঠ্য কোঠারির বয়স তখন মাত্রই বারো। পাঁচটি ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে কোঠারির মা চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েন । এই সংকটাবস্থায় তাঁর পিতৃবন্ধু ও ইন্দোর রাজ্যের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী স্যার সিরিমল বাপনা(Siremal Bapna) তাঁকে নিজের পরিবারভুক্ত করে নেন। সিরিমলের সন্তানদের সঙ্গেই দৌলত সিং বড় হতে থাকেন। ১৯২২ সালে ইন্দোরের মহারাজা শিবাজীরাও হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দৌলত সিং উদয়পুর ফিরে আসেন ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

১৯২৪ সালে তিনি রাজপুতানা বোর্ডের পরীক্ষয় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং পদার্থবিদ্যা, রসায়ণ ও গণিতে ডিস্টিংশান পান। তাঁর অসাধারন ফলাফলে খুশি হয়ে তাঁর উচ্চ শিক্ষার জন্য মেবারের মহারাজা মাসিক ৫০ টাকা বৃত্তি বরাদ্দ করেন। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৬ সালে স্নাতক হবার পর ১৯২৮ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সাহচর্যে তিনি বেতার প্রযুক্তি নিয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম হয়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। এরপর এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার ডেমন্সট্রেটর হিসাবে দুই বছর তিনি কাজ করেন।

দৌলত সিং উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ড যাত্রা করেন। এই বিদেশযাত্রার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তিনি বৃত্তি পান ও বিদেশে থাকাকালীন তাঁর পরিবার যাতে অর্থ সংকটে না পড়ে তার জন্য মেবার রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিনা সুদে ৩৫০০ টাকা ঋণ পান। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আরনেস্ট রাদারফোর্ডের (নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের জনক) তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে তিনি পিএইচডি ডিগ্ৰী লাভ করেন। প্রাক্তন শিক্ষক মেঘনাদ সাহার সুপারিশে তিনি রাদারফোর্ডের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করার সুযোগ পান।

ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি পুনরায় এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেমন্সট্রেটর পদে যোগ দেন। এরপর ১৯৩৪ সালে দৌলত সিং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগ দেন ও পদার্থবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৬১ তিনি এখানে অধ্যাপনা করেন। সেই সময় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের পঠনপাঠনের জন্য নিজস্ব কোন ভবন ছিল না। পুরাতন দিল্লির কাশ্মীরি গেট অঞ্চলে একটি ভাড়া বাড়িতে পড়ানো হত। বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিটিও খুব অনুন্নত ছিল, শুধুমাত্র স্নাতক স্তর অবধি তখন পড়ানোর ব্যবস্থা ছিল।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতির জন্য নানা উন্নয়নমূলক কাজকর্ম যেমন- ভাইসরিগাল লজ এস্টেটে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত করা, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা বিষয় দুটি স্নাতকোত্তর স্তর অবধি পড়ানোর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি করেন। ভারতের প্রাক্তন চিফ জাস্টিস অফ ফেডারেল কোর্ট স্যার মরিস গাওয়ার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পূর্ণ সময়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হলে তাঁর সহায়তায় দৌলত সিং পদার্থবিদ্যা বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৪৪ সালে এই বিভাগ থেকে পাঁচ জন ছাত্র স্নাতকত্তোর ডিগ্ৰী লাভ করে। এছাড়া আধুনিক মানের পদার্থবিদ্যার একটি ল্যাবরেটরিও তিনি নির্মাণ করান অ্যালবার্ট আইনস্টাইন যার উচ্চ প্রশংসা করেন। দৌলত সিং মাঝে মাঝেই সারা পৃথিবীর স্বনামধন্য পদার্থবিদদের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানাতেন। এরফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন সুনাম বাড়ত তেমনি ছাত্ররাও বিদগ্ধ বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পেত। নিলস বোর, পি এম এস ব্ল্যাকেট, পল ডিরাক , পি কাপটিজা, সি ভি রমন , মেঘনাদ সাহা,কে এস কৃষ্ণান ছিলেন এঁদের মধ্যে অন্যত্তম।

দৌলত সিং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভৌত বিজ্ঞানের সক্রিয় গবেষণার জন্য একটি গোষ্ঠী তৈরী করেন। পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন প্লাজমা ফিজিক্স, ম্যাগনেটো হাইড্রো ডায়নামিক্স, কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রো ডায়নামিক্স, রিলেটিভ কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্সের উপর তিনি প্রচুর গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ‘চাপ আয়নীকরণ(Pressure Ionisation)এর ওপর তাঁর গবেষণা কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর গবেষণালব্ধ ফলটি প্রয়োগ করা হয়। দৌলত সিং কোঠারি বুঝেছিলেন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য একটি ভালো লাইব্রেরির প্রয়োজন।

১৯৩৬ সালে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের জনক এস আর রঙ্গনাথনকে আমন্ত্রণ জানান দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য একটি সুষ্ঠ পরিকল্পনা করে দেওয়ার জন্য। ড: এস আর দাসগুপ্ত ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম লাইব্রেরিয়ান। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল অবধি দৌলত সিং কোঠারি ভারত সরকারের অধীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্বভার পালন করেন।

এরপর ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের(UGC) চেয়ারপার্সন ছিলেন। ১৯৬৩ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ও ১৯৬৪-১৯৬৬ সাল অবধি ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এই কমিশন “কোঠারি কমিশন” নামে বেশী জনপ্রিয়। ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি এবং আধুনিকীকরণের জন্যই এই কমিশন স্থাপিত হয়। দৌলত সিং কোঠারি বিশ্বাস করতেন একটি দেশের উন্নতি, প্রগতি, নিরাপত্তা বা ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উপর।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি থেকে যত বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী পাশ করে বেরোবে দেশের আভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো ততটাই মজবুত হবে। দেশের যুব সম্প্রদায়ের উপর তাঁর অপরিসীম স্নেহ ও বিশ্বাস ছিল। তিনি মনে করতেন সুশিক্ষত যুব সম্প্রদায়ই হল দেশের অগ্রগতির ধারক ও বাহক। যুব বিজ্ঞানীদের তিনি বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে খুব উৎসাহ দিতেন। দৌলত সিং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে একটি বিজ্ঞানসম্মত রূপ দিতে চেষ্টা করেছিলেন।

সর্বভারতীয় স্তরে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য একটি পরীক্ষাবিধিরও প্রণয়ণ করেন তিনি। ভারতের বেশিরভাগ ডিআরডিও(DRDO) ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি যার মধ্যে রয়েছে ন্যাভাল ডকইয়ার্ড ল্যাবরেটরি,ইন্ডিয়ান ন্যাভাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি, সেন্টার ফর ফায়ার রিসার্চ,সলিড স্টেট ফিজিক্স ল্যাবরেটরি, ডিফেন্স ফুড রিসার্চ ল্যাবরেটরি, মাইসোর ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অফ ফিজিওলজি অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস,ডিরেক্টরেট অফ ফিজিওলজিক্যাল রিসার্চ, ডিফেন্স ইলেকট্রনিক্স এন্ড রিসার্চ ল্যাবরেটরি,সায়েন্টিফিক ইভোল্যুশন গ্রুপ এবং টেকনিক্যাল ব্যালিস্টিক রিসার্চ ল্যাবরেটরি।

ভারতে মাধ্যমিক এবং স্নাতক স্তরের পঠনপাঠনের জন্য সঠিক পরিকাঠামো ও আধুনিক সিলেবাস তৈরির জন্য এনসিইআরটি(NCERT) প্রতিষ্ঠার পিছনে তাঁর অবদান অপিরিসীম। দৌলত সিং ১৯৭৩ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। স্ট্যাটিস্টিক্যাল থার্মোডায়নামিক্স (Statistical thermodynamics) এবং সাদা বামন নক্ষত্রের(White Dwarf Star) উপর গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৬২ সালে তিনি পদ্মভূষণ এবং ১৯৭৩ সালে পদ্মবিভূষণ উপাধি পান।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর সম্মানার্থে ডি এস কোঠারি সেন্টার ফর সায়েন্স,এথিক্স অ্যান্ড এডুকেশন(D.S.Kothari Centre for Science,Ethics and Education)নামক সংস্থা স্থাপন করে। ২০১১ সালে তাঁর সম্মানার্থে ডাক বিভাগ থেকে ৫ টাকা মূল্যের স্ট্যাম্প বার হয়। ১৯৯০ সালে মানবধিকার দপ্তরের অন্তর্গত সেন্ট্রাল হিন্দি ডিরেক্টরেট থেকে তাঁকে “আত্মারাম পুরস্কার” দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে দিল্লিতে দৌলত সিং কোঠারির মৃত্যু হয়।