Dhirendranath Datta | বাংলা ভাষার স্মরণীয় যোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

Dhirendranath Datta | বাংলা ভাষার স্মরণীয় যোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

পঁচাশি বছরের বন্দি বৃদ্ধ হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছিলেন। সারা শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন। পায়ে সামান্যতম শক্তি অবশিষ্ট নেই। সারা গায়ে তুলোর ব্যান্ডেজ, মাথা চোখ সব ঢাকা। কত দিন সয়েছিলেন এই অসহনীয় জীবনযন্ত্রণা, জানা যায় না। বৃদ্ধের ছোট ছেলে দিলীপকুমারও বন্দি হয়েছিলেন। তিনিও আর ঘরে ফেরেননি। বড় ছেলে সঞ্জীব দত্ত লিখেছেন, “একটা জীবন তার শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলো কারাগারেই কাটিয়ে দিতে দিতে নিজেকে চিনল।”বৃদ্ধের নাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

Dhirendranath Datta ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম তৎকালীন বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলার (বর্তমানের বাংলাদেশ) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে  ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১২৯৩ বাংলা সালের ১৬ কার্তিক) ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উত্তরে রামরাইল গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন মুনসেফ কোর্টের সেরেস্তাদার। তিনি ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ হতে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ হতে বি.এল পরীক্ষা পাস করেন।

  তিনি প্রায় একবছরকাল কুমিল্লার মুরাদনগর বাঙ্গুরা উমালোচন হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯১১ সালে তিনি কুমিল্লা জেলা বারে যোগদান করেন। তিনি ১৯০৭ সালে ত্রিপুরা হিতসাধনী সভা’র সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং ১৯১৫ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণে বড় ভূমিকা পালন করে প্রাথমিক যশ অর্জন করেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুসরণে তিনি মুক্তি সংঘ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করেন। কুমিল্লার অভয় আশ্রম-এর কর্মকান্ডের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন এবং ১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা (বর্তমানে কুমিল্লা) জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণসামগ্রী বিতরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  

চিত্তরঞ্জন দাশ এর আহবানে তিনি তিন মাসের জন্য আইন ব্যবসা স্থগিত রাখেন এবং অসহযোগ আন্দোলনএ অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন এবং বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সাথে ধীরেন দত্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলন-এ যোগ দেন। ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে কখনো বিনাশ্রম আবার কখনো সশ্রম দন্ড ভোগ করেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের পক্ষে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

আজকের বাংলাদেশে তাঁর নামে রাস্তা আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে একটি গ্রন্থাগার আছে, জাদুঘরে ছবিও আছে। কিন্তু সাধারণ বাঙালির মনে তিনি কতখানি আছেন, জানা নেই। অথচ এই ব্যক্তিই বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ। ‘সিএপি’ অর্থাৎ ‘কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি অব পাকিস্তান’-এর দ্বিতীয় অধিবেশন চলছিল করাচিতে। তারিখটা ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ সাল। আগের বছর ভারত ভাগ হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তাই নিয়ে বিতর্ক। উর্দু তো হতেই হবে, ইংরেজিও চলতে পারে। ধীরেন্দ্রনাথ প্রস্তাবের সংশোধনী এনে বললেন, বাংলাকেও এই স্বীকৃতি দিতে হবে।

১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খান-এর মন্ত্রিসভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

করাচির মাটিতে মহম্মদ আলি জিন্না’র সামনে অকম্পিত কণ্ঠে বাংলার জন্য তাঁর মতো সরব হতে সে দিন বাংলা প্রদেশের বাঙালি প্রতিনিধিরা অনেকেই পারেননি। গণপরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, “দেশের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ নাগরিকের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তা হলে আপনিই বলুন মহাশয়, রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত?... একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা তো সেই ভাষাই হওয়া উচিত, যাতে বেশির ভাগ মানুষ কথা বলেন।” সে দিন তাঁকে সমর্থন করেছিলেন কেবল তিন জন প্রতিনিধি। প্রেমহরি বর্মা, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কংগ্রেসের রাজকুমার চক্রবর্তীও বলেন, “উর্দু পাকিস্তানের পাঁচ প্রদেশের কোনওটিরই কথ্য ভাষা নয়।... বাংলাকে আমরা দুই অংশের সাধারণ ভাষা করার জন্যে চাপ দিচ্ছি না। শুধু চাই ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি।”

বলা বাহুল্য এই প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পায়নি। দেশের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান ভাষার সঙ্গে ধর্ম, জাতীয় ঐক্য ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে বললেন, “উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের দাবিতে পাকিস্তানের জন্ম এবং তাঁদের ভাষা উর্দু। কাজেই বেশির ভাগ জনগণ যে-ভাষায় কথা বলেন, তাকে প্রাধান্য দিতে যাওয়া ভুল হবে।” তিনি পাকিস্তানকে ‘এক জাতি, এক দেশ, এক ভাষা’র তকমা দিতে চাইলেন, ১১ মার্চ গণপরিষদে ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দু’ মর্মে বিল পাশ হল।

অধিবেশন শেষে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলায় ফিরলেন।  তেজগাঁ বিমানবন্দরে বিমান থেকে নেমে ধীরেন্দ্রনাথ দেখেন, জনা পঞ্চাশ যুবক গেটের কাছে দাঁড়িয়ে, তাদের গায়ে আবার চাদর। তিনি ভাবলেন, বাংলার দাবি জানিয়ে এসেছেন বলে এরা নিশ্চয় রেগে গিয়েছে এবং চাদরে লুকিয়ে অস্ত্র এনেছে তাঁকে আক্রমণ করবে বলে। তিনি পায়ে পায়ে এগোলেন। কাছে আসতেই এক আশ্চর্য ঘটনা। চাদরের নীচ থেকে বেরিয়ে এল রাশি রাশি ফুল। যুবকেরা সেই ফুল বর্ষণ করল মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধের প্রথম বীর সৈনিকের উপর।

এরা সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অধিবেশনে যাওয়ার আগে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরেছিলেন; মানুষের ভয়ের নয়, মনের কথা জেনেছিলেন। ভাষা হারালে একটা জাতি হারিয়ে যাবে, তিনি জানতেন। চিঠির খামে লেখা ঠিকানা, জমি বেচাকেনার স্ট্যাম্প পেপারের লেখাজোখার মতো সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভাষাও তো তাঁদের অচেনা মনে হবে! প্রসঙ্গত, ভাষা নিয়ে পরিষদের বিতর্ক ভাষার কারণেই প্রদেশের বেশ কয়েক জন প্রতিনিধি সে দিন বুঝতেই পারেননি। 

ধীরেন্দ্রনাথের বক্তব্যই বাংলা ভাষা আন্দোলনকে প্রথম পর্বে একটা সাংগঠনিক রূপ দিল। অবশেষে এল ১৯৫২ সালের সেই কান্নার দিন, গর্বের দিন, ২১ ফেব্রুয়ারি। সারা পৃথিবী দেখল, মাতৃভাষার জন্যে মানুষ প্রাণ দিতে পারে। পুলিশের অত্যাচার যত বাড়ল, আন্দোলনও তত তীব্র হল। পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করা হয় এবং এর ফলে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন।এতদসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এ্যাডভোকেট আবদুল করিমের তত্ত্বাবধানে ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদেরকে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। 

বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার”  হিসাবে তাকে “ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের কুমিল্লা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক, বিশিষ্ট সংসদ সদস্য ও আইনজীবী হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামে রাস্তার নামকরণ করে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন সড়ক পর্যন্ত রাস্তাটি এখন থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক নামে পরিচিত। ১৮ জুলাই ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর জগন্নাথ হলে তার নামে একটি ই-লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হয়।  ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যলয়-এ ঐ বছরই ছাত্রদের জন্য " ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল" নামে একটি আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে কুমিল্লা স্টেডিয়াম এর নামকরণ করা হয় " ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম "