দুর্গাপুর | ভারতের রূঢ় থেকে বাংলার চতুর্থ বৃহৎ মহানগর    

দুর্গাপুর | ভারতের রূঢ় থেকে বাংলার চতুর্থ বৃহৎ মহানগর    

পশ্চিম বর্ধমান জেলার পৌর কর্পোরেশনাধীন একটি এলাকা হল দুর্গাপুর। এটি পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ বৃহৎ মহানগর ।দামোদর উপত্যকার  অণ্ডাল, দিশেরগড় , রানিগঞ্জ, প্রভৃতি খনিকে কেন্দ্র করে নিকটবর্তী দুর্গাপুরে লৌহ ইস্পাত, ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সার প্রভৃতি কারখানা নির্মিত হয়েছে,  এজন্য দুর্গাপুরকে ভারতের রূঢ় বলা হয়।

 দুর্গাপুর এরোট্রোপোলিস বা বিমাননগরীটি হল ভারতবর্ষের প্রথম বিমাননগরী। সমুদ্র সমতল থেকে এই শহরটির গড় উচ্চতা হল ৬৫ মিটার ।দুর্গাপুর শহরাঞ্চলের ভৌগোলিক আয়তন ১২৭.১ বর্গ কিঃমিঃ।পূর্বে পানাগড় থেকে পশ্চিমে অন্ডাল পর্যন্ত শহরের বিস্তৃতি প্রায় ৪০ কিঃমিঃ। উত্তরে শিবপুর-অজয়ঘাট থেকে দক্ষিণে ন'ডিহা পর্যন্ত শহরের বিস্তৃতি প্রায় ২২ কিঃমিঃ।

২০১১ সালের  জনগণনা অনুসারে দুর্গাপুর শহরের জনসংখ্যা হল ৫,৮১,৪০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষের জনসংখ্যা হল ৩,০১,৭০০, এবং নারীর জনসংখ্যা হল ২,৭৯,৭০৯। ৬ বছরের অনূর্ধ্ব বয়সীদের জনসংখ্যা হল ৫১,৯৩০।এই শহরের জনসংখ্যার ৮.৯৩% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। পুরুষদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার ৯২.০১% এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৮৩.০৩%। ৭ বছর বয়সী বা তার উর্দ্ধে যাদের বয়স, তাদের স্বাক্ষরতার হার ৮৭.৭০।

দুর্গাপুর শহর সড়কপথ ও রেলপথ দ্বারা ভারতবর্ষের বাকি অংশ ও শহরগুলির সঙ্গে ভালো ভাবে যুক্ত রয়েছে। দামোদর নদের দুর্গাপুর ব্যারেজ  ও অজয় নদের ওপর অজয় সেতু নির্মিত হওয়ার পর, উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারত-এর সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গ ও দক্ষিণ ভারত-এর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ়  ও সুপরিকল্পিত হয়েছে। TRANSIT POINT হিসাবে দুর্গাপুর শহরের গুরুত্বও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

১৯নং জাতীয় সড়ক ও ৯নং রাজ্য সড়ক শহরের সীমানার ভিতর দিয়ে চলে গেছে। শহরের উপকন্ঠে পানাগড় শহরতলী থেকে পানাগড়-মোরগ্রাম মহাসড়ক বীরভূম জেলার দুবরাজপুর পর্যন্ত গেছে।দুর্গাপুর শহর লাগোয়া বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বীরভূম , বর্ধমান জেলার মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল জেলার মুখ্য প্রবেশদ্বার হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে।

শহরের সগড়ভাঙ্গা ও মুচিপাড়া, এই দুই এলাকার সংযোগস্থলে, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে ৯ নং রাজ্য সড়ক, যেটি দুর্গাপুর ব্যারেজ পেরিয়ে, বাঁকুড়া জেলার বাঁকুড়া সদর, ওন্দাল,  বেলিয়াতোড়, বিষ্ণুপুর, ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোণা রোড,  গড়বেতা, শালবনী, মেদিনীপুর সদর, খড়গপুর, লালগড়, গোপীবল্লভপুর হয়ে বাংলা-ঊড়িষ্যা (ওড়িশা) সীমান্তবর্তী খারিকা পর্যন্ত গিয়েছে।

দুর্গাপুর শহরাঞ্চলের আন্তঃ-রাজ্য পরিবহন ব্যবস্থার অন্তর্গত, প্রধানত তিনটি প্রান্ত বা টার্মিনাস ব্যবহৃত হয় যথা বেনাচিতি-১, বেনাচিতি-২, সিটি সেন্টার ও স্টেশন এবং প্রান্তিকা টার্মিনাস। দুর্গাপুর শহরের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত।  রেলযোগে গোরক্ষপুর, ইন্দৌর, ভোপাল,  দিল্লী, অমৃতসর,  জব্বলপুর, নাগপুর, বিশাখাপত্তনম, মুম্বাই, চেন্নাই, জম্মু, গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় প্রভৃতি শহরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। দূরপাল্লার বাসযোগেও দুর্গাপুর সংযুক্ত ভারতবর্ষের বাকি অংশ ও শহরগুলির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।মেলগাড়ি, এক্সপ্রেস, ইন্টার-সিটি, গরীব-রথ, সহ একাধিক দ্রুতগতিসম্পন্ন গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন কলকাতা ও দুর্গাপুরের মধ্যে দৈনিক ভিত্তিতে আসা-যাওয়া করে।

শিয়ালদহ-নয়াদিল্লী রাজধানী এক্সপ্রেস, পূর্বা এক্সপ্রেস, কালকা মেল, অমৃতসর মেল, হাওড়া-মুম্বাই মেল, চেন্নাই-গুয়াহাটী এক্সপ্রেস, হাওড়া-পাটনা জনশতাব্দী এক্সপ্রেস, কামাখ্যা এক্সপ্রেস,হাওড়া-রাঁচী শতাব্দী এক্সপ্রেস,  প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ, দ্রুতগতিসম্পন্ন, দূরপাল্লার ট্রেন দুর্গাপুর স্টেশনে থামে। দুর্গাপুর শহরের প্রধান রেল স্টেশন হল দুর্গাপুর ।

শহরের প্রধান জংশন রেল স্টেশন অন্ডাল জংশন রেলওয়ে স্টেশন । দুর্গাপুর-অন্ডাল রেল স্টেশনগুলি পূর্ব রেলের আসানসোল ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত। এই শহরের অন্যতম বৃহৎতম বিমানবন্দ অন্ডালে অবস্থিত কাজী নজরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের আইরবেস এই শহরের পানাগড়-এ অবস্থিত। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন পরিচালনাধীন  দুর্গাপুর ব্যারেজ দুর্গাপুর শহরের কাছে দামোদর নদ এর উপর নির্মিত ।

১৯৫৫ সালে নির্মিত দুর্গাপুর ব্যারাজটি ৬৯২ মিটার (২,২৭০ ফুট) দীর্ঘ।দুর্গাপুর ব্যারাজটি ১২ মিটার (৩৯ ফুট) উঁচু। এই ব্যারেজ থেকে কৃষি জমিতে জল সেচের জন্য সেচ খাল খনন করা হয়েছে যার দ্বারা বর্ধমান জেলা ও বাঁকুড়া জেলার কৃষি জমিতে জল সেচ করা হয়।এই ব্যরেজএর দ্বারা দামোদর নদ ও তার উপনদী গুলির বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।দুর্গাপুর ব্যারেজ দুর্গাপুরের অন্যতম একটি দর্শনীয় যায়গাও হয়ে উঠেছে। 

দুর্গাপুর শহরের অন্যতম গর্ব হল ন্যাশনাল ইন্ষ্টিটিউট অব টেকনলজি । এটি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়।N.I.T. দুর্গাপুর 1956 সালে প্রতিষ্ঠিত ৮ আঞ্চলিক প্রকৌশল কলেজগুলির মধ্যে একটি। সেন্ট্রাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট একটি পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান , এটি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR) এর একটি পরীক্ষাগার যা গড়ে উঠেছে দুর্গাপুরে। এছাড়াও দুর্গাপুরে রয়েছে বি সি রয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ , বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ , দুর্গাপুর মহিলা কলেজ , মাইকেল মধুসূদন কলেজ সহ একাধিক সরকারি , বেসরকারি কলেজ , বিদ্যালয়।