এনজো ফেরারি এর জীবনী

এনজো ফেরারি এর জীবনী

 

অটোমোবাইল সংস্থা ‘ ফেরারি’ -র প্রতিষ্ঠাতা, সফল উদ্যোগপতি এবং একজন ইতালীয় মোটর রেসিং গাড়িচালক হিসেবে বিখ্যাত Enzo Ferrari এনজো ফেরারি । গতি, বিন্যাস কিংবা সৌন্দর্যের দিক থেকে ফেরারি গাড়ির তুলনা নেই এই পৃথিবীতে। রেসিং-এর ক্ষেত্রেও তাঁর কোম্পানির গাড়ির জুড়ি মেলা ভার। খুব অল্প বয়স থেকেই স্পোর্টস কার এবং রেসিং-এর প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন তিনি। মেকানিক্স কিংবা পদার্থবিদ্যার বিষয়ে কোনোরকম প্রথাগত পড়াশোনা না থাকলেও গাড়ি এবং তার মেকানিক্সের ব্যাপারে তুখোড় দক্ষতা ছিল এনজো ফেরারির।

তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং বিপুল জ্ঞানের কারণে বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানীয় ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। ১৮৯৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইতালির মোদেনা শহরে এনজো ফেরারির জন্ম হয়। যদিও তাঁর জন্মনথিতে তাঁর জন্মতারিখ নথিভুক্ত ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি, কারণ তাঁর জন্মের সময় শক্তিশালী এক তুষারঝড়ের কারণে স্থানীয় রেজিস্ট্রি অফিসে নাম নথিভুক্তিতে দেরি হয়েছিল ফেরারির বাবার।

তাঁর বাবার নাম অ্যালফ্রডো ফেরারি এবং মায়ের নাম অ্যাডালগ্রিসা ব্রিসবিনি। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন এনজো ফেরারি। তাঁদের পারিবারিক কাঠের ব্যবসা ছিল। প্রথাগত শিক্ষা খুব বেশি পাননি ফেরারি । মাত্র দশ বছর বয়সে ১৯০৮ সালে সার্কুটো ডি বলোগ্না নামের একটি রেসিং প্রতিযোগিতা দেখেই রেসিং করার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন তিনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালীয় সেনাবাহিনী তৃতীয় মাউন্টেন আর্টিলারিতে যোগ দিয়েছিলেন ফেরারি। ১৯১৬ সালে একটি ইতালীয় ফ্লু সংক্রমণের কারণে তাঁর বাবা এবং বড়ো দাদার মৃত্যু হয়। ১৯১৮ সালে ফেরারি নিজেও ফ্লু-তে আক্রান্ত হয়ে ব্যাপকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তাঁর দূর্বলতার কারণে ইতালির সেনাবাহিনী থেকেও তাঁকে বহিষ্কৃত করা হয়। পারিবারিক কাঠের ব্যবসা খুব একটা ভালো না চলায় এনজো ফেরারি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিতে চাকরির সন্ধান করতে থাকেন। তুরিনে ‘ফিয়াট’ কোম্পানিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করলেও সেই প্রয়াস বৃথা যায়। এরপরে মিলানে একটি গাড়ি নির্মাতা সংস্থার পরীক্ষক-চালক হিসেবে কাজে যোগ দেন এনজো ফেরারি।

এই সংস্থা ব্যবহৃত ট্রাকের যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে প্যাসেঞ্জার গাড়ি তৈরি করতো। ক্রমে তিনি রেসিং গাড়িচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ১৯১৯ সালে ‘পার্মা পোজ্ঞিও ডি বার্সেটো হিল ক্লাইম্ব রেস’-এ যোগ দিয়ে প্রথমবার চতুর্থ স্থান অর্জন করেন ফেরারি। ঐ বছরই ২৩ নভেম্বর ‘টার্গা ফ্লোরিও’-তে অংশগ্রহণ করেন এনজো ফেরারি। কিন্তু এই রেসে তাঁর গাড়ির জ্বালানি ট্যাঙ্কে ফুটো হয়ে যাওয়ায় মাঝপথেই রেস ছেড়ে চলে আসতে হয় তাঁকে। কিন্তু তবু এই রেসে নবম স্থান অর্জন করেন ফেরারি। ১৯২০ সালের শেষ দিকে বিখ্যাত রেসিং গাড়ি নির্মাণ কোম্পানি ‘আলফা রোমিও’তে একজন গাড়িচালক হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। সেকালের বিখ্যাত রেসিং চালক তাজিও নুভোলারি ছিলেন ফেরারির সহকর্মী।

১৯২৩ সালে প্রথম রেসিং চালক হিসেবে সেভিও সার্কিটের র‍্যাভেনাতে তিনি ‘গ্র্যাণ্ড প্রিক্স’ পুরস্কার জেতেন। ১৯২৪ সালে র‍্যাভেনা, পোলসাইন এবং কোপা এসারবোর রেসিং ম্যাচে জয়লাভ করেন। ১৯২৩ সালে রেসিং জগতে ফেরারির আদর্শ উগো সিভাক্কির মৃত্যু হয় এবং ১৯২৫ সালে আরেক রেসিং চালক আন্তোনিও আসকারির মৃত্যু হলে অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন ফেরারি। তব্য রেসিং ছাড়েননি তিনি। বেদনার্ত হৃদয়েই রেসিং ময়দানে নামেন তিনি। এই সময়েই গ্র্যাণ্ড প্রিক্স রেসিং-এর প্রশাসনিক দিকগুলিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলছিলেন তিনি।

১৯৩২ সালে তাঁর পুত্রসন্তান অ্যালফ্রেডোর জন্মের পরে সরাসরি রেসিং থেকে অবসর নিয়ে এই খেলার পরিচালনা এবং প্রশাসনিক দিকগুলি দেখতে শুরু করেন তিনি। এই সময় ‘আলফা রেসিং কার’ সংস্থার গাড়ি নির্মাণ কারখানার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ক্রমে একটি রেসিং দলও তৈরি করে নেন ফেরারি। এই দলের সদস্য ছিলেন জোসেফ ক্যাম্পারি, ত্যাজিও নুভোলারির মতো বাঘা বাঘা রেসিং তারকারা। ১৯২৯ সালে এনজো ফেরারির তৈরি করা এই দলকে বলা হতো ‘স্কুডেরিয়া ফেরারি’। ‘আলফা রোমিও’ কোম্পানির জন্য একটি বিশেষ রেসিং বিভাগ হিসেবে কাজ করতো এই দলটি।

আলফা রোমিও পি থ্রি-র মতো গাড়ি এবং দক্ষ চালকদের জন্য এই রেসিং দল সর্বত্র সাফল্য পেতে থাকে। মোট ৪১টি গ্র্যাণ্ড প্রিক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১১টি ম্যাচ জিতে এনজো ফেরারি রেসিং থেকে অবসর নেন। এই সময় থেকেই তাঁর দলের গাড়িতে একটি ঘোড়ার প্রতীক দেখা যায় যা আসলে ইতালীয় যুদ্ধবিমানচালক ফ্রান্সিসকো বারাক্কার নির্মিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি বিমান উড়ানের আগে বারাক্কা ফেরারিকে একটি ঘোড়ার প্রতীক সহ নেকলেস উপহার দিয়েছিলেন। সেই উড়ানের সময়েই যুদ্ধে বারাক্কার মৃত্যু হলে তাঁর স্মৃতিতে ফেরারি গাড়িতে সেই ঘোড়ার প্রতীক ব্যবহার করা শুরু করেন।

পরবর্তীকালে এটাই বিশ্ববিখ্যাত ফেরারি গাড়ির প্রতীক হয়ে উঠবে। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ফেরারির রেসিং দলকে সহায়তা করেছিল আলফা রোমিও সংস্থা। ক্রমে আর্থিক টানাপোড়েন দেখা দিলে আলফা রোমিও তাঁদের দলকে সাহায্য করতে অসম্মত হয়। এই সময় অটো ইউনিয়ন এবং মার্সিডিজের সঙ্গে ফেরারির দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছিল। সেই সময় গাড়ি নির্মাণের দুনিয়ায় জার্মান সংস্থাগুলিই প্রাধান্য পেত। কিন্তু জার্মান গ্র্যাণ্ড প্রিক্সে স্কুডেরিয়া দলের ত্যাজিও নুভোলারি জার্মান রেসিং গাড়িচালক বার্ন্ট রোসারমেয়ার এবং রুডলফ কারাসিওলাকে পরাজিত করলে ফেরারি এবং তাঁদের দলের নাম ছড়াতে শুরু করে। ১৯৩৭ সালে স্কুডেরিয়া দলটি ভেঙে যায় এবং পুনরায় এনজো ফেরারি আলফা রোমিওর রেসিং দলে যোগ দেন।

আলফা রোমিও এই সময় ফেরারিকে স্পোর্টিং পরিচালকের পদে বসিয়ে রেসিং দুনিয়ায় পুরনো আধিপত্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। ১৯৩৯ সালে আলফা রোমিওর কর্মকর্তার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় সংস্থা ছেড়ে নিজের উদ্যোগে ফেরারি গড়ে তোলেন ‘অটো অ্যাভিও কন্সট্রুজিওনি’ নামে একটি নতুন সংস্থা যার কাজ ছিল অন্য রেসিং দলকে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনী তাঁর এই কারখানাটি দখল করে নেয় যুদ্ধ সামগ্রী তৈরির জন্য। ফলে বাধ্য হয়ে মোদেনা ছেড়ে মার্নেলোতে চলে আসেন ফেরারি।

কিন্তু সেখানেও মিত্র বাহিনীর বোমা হামলার শিকার হয় তাঁর কারখানা। ১৯৪৭ সালে তিনি প্রথম নিজের নামে একটি গাড়ি তৈরি করেন ‘ফেরারি ১২৫ এস’। সেই থেকেই শুরু হয় ফেরারি গাড়ির জয়যাত্রা। তাঁর তৈরি এই গাড়িতে প্রথম ভি ১২ ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়েছিল যা এরপর থেকে ফেরারির গাড়ির এক অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। ১৯৫১ সালের সিলভারস্টোনে ফেরারি তাঁর প্রথম গ্র্যাণ্ড প্রিক্স বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে। ইতালীয় বংশোদ্ভুত আমেরিকান নাগরিক লুইজি সিনেত্তি ১৯৪৯ সালে প্রথম ‘লা মান্স’ এবং ‘স্পা ২৪ আওয়ার্স’ নামের দুটি প্রতিযোগিতাতে ফেরারি গাড়ি চালিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন।

সেই সময় ফেরারি কেবল রেসিং গাড়িই তৈরি করত, কিন্তু সিনেত্তির পরামর্শে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য স্পোর্টস গাড়িও তৈরি করা শুরু করেন ফেরারি। বাণিজ্যিকভাবে স্পোর্টস গাড়ি নির্মাণ করে ফেরারি ভেবেছিলেন আমেরিকায় তাঁদের ব্যবসাকে ছড়িয়ে দেবেন। লুইজি সিনেত্তির উদ্যোগেই আমেরিকার ম্যানহাটনে প্রথম ফেরারির একটি শো-রুম চালু করা হয়। আমেরিকাই ক্রমে ফেরারির মুনাফার বাজার হয়ে ওঠে। ধনী থেকে আরো ধনী হতে থাকেন তিনি। ক্যালফোর্ণিয়া স্পাইডার, টেস্টারোসা, জিতিও ইত্যাদি বিলাসবহুল এবং অত্যাধুনিক মডেলের গাড়ি তৈরি করে বিশ্বব্যাপী ফেরারি এক ঘরোয়া নাম হয়ে ওঠে।

১৯৬৩ সালে হেনরি ফোর্ড ফেরারি কোম্পানিকে কিনে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে ব্যর্থ হন। এরপর ‘লে মান্স’ রেসে ফোর্ড কোম্পানির ‘ফোর্ড জিটি ৪০’ গাড়িটি পরপর তিনটি ধাপে ফেরারিকে পরাজিত করে দেয়। সময়টা ছিল ১৯৬৬ সাল। তার আগে পর্যন্ত এই রেসে ফেরারি গাড়িই ছিল একমাত্র বিজয়ী এবং অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চার বছর পরপর ফোর্ড জিটি ৪০ গাড়িটিই এই রেসে জয়লাভ করে। শুরু হয় ফোর্ড আর ফেরারি কোম্পানির বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা।

বাজারে টিকে থাকে ফিয়াট কোম্পানির কাছে ফেরারি তাঁর সংস্থার ৫০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেন এবং নতুন মডেলের গাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করতে থাকেন ফেরারি। সত্তরের দশকে এসে ফর্মুলা ওয়ান রেসিং-এ ফেরারি গাড়ি আবার তাঁর পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পায়। ফেরারির মৃত্যুর পরেও ২০০০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত রেসিং চালক মাইকেল শুমাখ্যার এই ফেরারি গাড়ি নিয়েই পরপর পাঁচ বছর রেসিং চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। ১৯৮৮ সালের ১৪ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে মার্নেলোতে এনজো ফেরারির মৃত্যু হয়। 

আরো পড়ুন      জীবনী  মন্দির দর্শন  ইতিহাস  ধর্ম  জেলা শহর   শেয়ার বাজার  কালীপূজা  যোগ ব্যায়াম  আজকের রাশিফল  পুজা পাঠ  দুর্গাপুজো ব্রত কথা   মিউচুয়াল ফান্ড  বিনিয়োগ  জ্যোতিষশাস্ত্র  টোটকা  লক্ষ্মী পূজা  ভ্রমণ  বার্ষিক রাশিফল  মাসিক রাশিফল  সাপ্তাহিক রাশিফল  আজ বিশেষ  রান্নাঘর  প্রাপ্তবয়স্ক  বাংলা পঞ্জিকা ।