মাত্রাছাড়া দূষণ বেড়েছে কলকাতা , বাতাসে বহিছে বিষ!

মাত্রাছাড়া দূষণ বেড়েছে কলকাতা , বাতাসে বহিছে বিষ!

 আরও দূষিত হয়ে পড়েছে কলকাতার বাতাস। বিষের বোঝা আরও বেড়েছে এই শহরের বাতাসে। আশঙ্কাজনক হারে।  বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানী শহরগুলির তালিকায় আবার নাম উঠেছে দিল্লির। এই নিয়ে পরপর চার বার। শুধু গত বছরেই দিল্লির বায়ুদূষণ মাত্রা তার আগের বছরের (২০২০) তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর দিল্লির বাতাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক দূষণ কণার পরিমাণ ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‘হু’)-র বেঁধে দেওয়া সীমার ২০ গুণ উপরে। পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত ১০০টি শহরের মধ্যে ৬৩টি শহর ভারতেরই।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে ভারতেরই শহরের নাম। রাজস্থানের ভিওয়ারি। দ্বিতীয় স্থানে দিল্লির অদূরে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ। ভারতের সবচেয়ে দূষিত ১৫টি শহরের মধ্যে ১০টিই রাজধানী দিল্লির আশপাশে। প্রতি বছর বিশ্বের সব শহরের বাতাসে দূষণের মাত্রা (‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স অথবা একিউআই’) মাপে সুইৎজারল্যান্ডের যে সংস্থা, সেই ‘আইকিউএয়ার’-এর ‘ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট, ২০২২’ এই উদ্বেগজনক খবর দিয়েছে।

 এই বায়ুদূষণের মাত্রাবৃদ্ধির যাবতীয় পরিসংখ্যানই গত বছরের। রিপোর্ট জানিয়েছে, তার আগের তিন বছর ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২০ সালে বিশ্বের শহরগুলিতে বায়ুদূষণ মাত্রার সূচক কিছুটা নেমেছিল। সেই তিন বছরের ধারবাহিকতা ভেঙে গত বছর ভারতের ৬৩টি শহর-সহ বিশ্বের সবক'টি শহরেরই বায়ুদূষণ মাত্রার সূচক আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আর তা হয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বাতাসে ভাসমান নানা ধরনের নানা আকারের দূষণ কণা থাকে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক সেই সব দূষণ কণা যাদের ব্যাস আড়াই মাইক্রন বা তারও কম হয়।

এদের বলা হয় ‘পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫ (বা, পিএম২.৫)’। এক মাইক্রন বলতে বোঝায় এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ। মানবরক্তের লোহিত কণিকার ব্যাস পাঁচ মাইক্রন। আর মাথার চুলের ব্যাস গড়ে ৫০ থেকে ১০০ মাইক্রন। বাতাসে আড়াই মাইক্রন ব্যাসের দূষণ কণা ছাড়াও থাকে ১০ মাইক্রন ব্যাসের দূষণ কণাও। তাদের বলা হয় ‘পিএম ১০’। তবে আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হয় বলেই পিএম ২.৫ দূষণ কণা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। তারা প্রতি মুহূর্তেই প্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে ঢোকে।

বিপাক ক্রিয়া-সহ ফুসফুসের প্রায় সব ধরনের কাজেই দারুণ ভাবে ব্যাঘাত ঘটায়। প্রতি ঘন মিটার বাতাসে এই পিএম ২.৫ দূষণ কণার পরিমাণ কত মাইক্রোগ্রাম থাকছে, তার ভিত্তিতেই বায়ুদূষণ মাত্রার সূচক নির্ধারিত হয়।এক মিলিগ্রামের এক হাজার ভাগের এক ভাগ এক মাইক্রোগ্রাম। ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট, ২০২২ জানিয়েছে, ২০১৯-এর ডিসেম্বর থেকে কোভিডের জেরে কলকারখানা বন্ধ ছিল মাসের পর মাস। লকডাউনে অচল হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। তবু কলকাতা, দিল্লি-সহ ভারতের শহরগুলিতে বায়ুদূষণের মাত্রা তো কমেইনি, বরং গত বছর তা আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে গিয়েছে।

বেড়েছে বিশ্বের সবকটি শহরেই। প্রতিটি শহরেই প্রতি ঘন মিটার বাতাসে পিএম২.৫ দূষণ কণার পরিমাণ গত বছর গড়ে হয়েছে ৫৮.১ মাইক্রোগ্রাম। যা ‘হু’-র বেঁধে দেওয়া সীমার গড়ে অন্তত ১০ গুণ। ভারতের কোনও শহরই হু-র বেঁধে দেওয়া সীমা মানতে পারেনি। বায়ুদূষণের মাত্রায়।   রিপোর্ট জানিয়েছে, একমাত্র ব্যতিক্রম ভারতের চেন্নাই। ওই শহরেই তার আগের বছরের তুলনায় (২০২০) গত বছর বায়ুদূষণ মাত্রা বাড়েনি। কিন্তু দেশের বাকি ৫টি মেট্রো শহরেই (কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরু) সেই মাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

এক বছরে সবচেয়ে দূষিত দিনের হিসাবেও চেন্নাই ছাড়া ভারতের বাকি পাঁচটি মেট্রো শহর তার আগের বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। কলকাতায় ২০২০ সালে সবচেয়ে দূষিত দিনের সংখ্যা ছিল ৭৪। গত বছর তা বেড়ে ৮৩ দিন হয়েছে। দিল্লিতে ২০২০ সালে সবচেয়ে দূষিত দিনের সংখ্যা ছিল ১৩৯। গত বছর তা একলাফে ২১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৬৮ দিন। যেখানে হু-র বেঁধে দেওয়া নিরাপদ মাত্রা ছিল প্রতি ঘন মিটার বাতাসে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম পিএম ২.৫ দূষণ কণা, গত বছর দিল্লির বাতাসে তা ছিল ৯৬.৪ মাইক্রোগ্রাম। প্রায় ২০ গুণ বেশি।

মুম্বইয়ে ২০২০-তে সবচেয়ে দূষিত দিনের সংখ্যা ছিল ২০। তা গত বছরে হয়েছে ৩৯ দিন। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত প্রথম ১৫টি শহরের মধ্যে রয়েছে রাজস্থানের ভিওয়াড়ি, উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ, চিনের হোটান, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর, পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ, উত্তরপ্রদেশের নয়ডা, পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুর, পেশওয়ার, উত্তরপ্রদেশের বাগপত, হরিয়ানার হিসার, ফরিদাবাদ, উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডা, হরিয়ানার রোহতক এবং পাকিস্তানের লাহৌর। বিশ্বের সবকটি শহরেই গত বছরে বায়ুদূষণের মাত্রাবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসাবে গাড়িঘোড়ার ধোঁয়া, কয়লা-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পবর্জ্য, নির্মাণ ক্ষেত্রের কাজকর্মকে চিহ্নিত করা হয়েছে এই রিপোর্টে।