লাউ উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল অবলম্বন করে লাউ চাষে লাভের আশায় দেখছে চাষিরা

লাউ উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল অবলম্বন করে লাউ চাষে লাভের আশায় দেখছে চাষিরা

আজবাংলা      কৃষকরা একটু বেশি লাভের আশায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন।কম সময়ে ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার প্রয়োগ চরম মাত্রা নিয়েছে। ধান, পাট থেকে অনান্য যে কোনো সবজি চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। ফলে নানা রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

পাশাপাশি জমির স্বাভাবিক প্রকৃতি নষ্ট হয়ে কমতে থাকে ফলনও। বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে আগাম চাষে ঝুঁকে পড়েছেন এখানকার কৃষকরা। ইতিমধ্যেই কৃষকরা লাউ শাক, লাউ, লালশাক, বেগুন, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও শশাসহ বিভিন্ন সবজির চাষাবাদ শুরু করেছেন।

২০ হাত বাই ৪০ হাত লম্বা পাশাপাশি দুইটি লাউয়ের মাচা। মাচায় ঝুলছে ছোট বড় প্রায় শ' পাঁচেক লাউ। লাউয়ের সাদা ফুলে ভরে আছে মাচার উপরি ভাগ। গাছের ডগায় ডগায় উকি দিচ্ছে নতুন লাউয়ের কটি। আর মাচায় ঝুলে থাকা এই শত শত লাউকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা। কৃষক আলী হোসেন জানান, তিনি ২০০৫ সাল থেকে কৃষি কাজ শুরু করেন।

প্রথম বছর তিনি মাত্র ৩০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। খুব ভাল ফলন হয়েছিল। খরচ বাদে তার লাভ হয়েছিল এক লাখ টাকা। এর পর থেকে এক বছর পর পরই তিনি মার্টিনা জাতের লাউ চাষ করছেন। আর বছর বছর লাউ বিক্রির লাভ্যাংশ দিয়ে পুরন করছেন তার স্বপ্ন। মাঠির ঘর ভেঙ্গে করেছেন পাঁকা ঘর।

কিনেছেন দোকান। ছোট ভাইকে পাঠিয়েছেন সৌদি আরব। চলতি বছরে তিনি ২০ শতক জমিতে মার্টিনা লাউ চাষ করেছেন। আগষ্টের প্রথম সাপ্তাহ থেকে লাউ বিক্রি শুরু করেছেন। এই ২০ দিনে তিনি প্রায় ৩৫০টি  লাউ বিক্রি হয়েছে ১৮ হাজার টাকা পেয়েছিল।  তিনি আশা করছেন, খরচ বাদ দিয়ে এ বছরও প্রায় সত্তর হাজার টাকা লাভ করবেন। তার এই সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষকরা এখন লাউ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।জানা যায়, এ জাতের লাউ সারা বছর চাষ করা যায়। তবে শীতকালে অধিক ফলন হয়।

জুন থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বীজ বপন করতে হয়। প্রতি শতাংশ জমিতে ১০ গ্রাম বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের ৬০ থেকে ৬৫ দিনে গাছে ফুল ও ফল আসে। ১০ থেকে ১৫ দিনে গাছ থেকে ফল আহরণ করা যায়। লাউ দেখতে সাদা বিন্দু যুক্ত সবুজ রঙের। দের্ঘ্য ৫০ থেকে ৬০ সেন্টি মিটার পর্যন্ত। ওজন ২.৫ থেকে ৩.৫ কেজি। কৃষকরা যদি ভাল পরিচর্যা করতে পারেন তাহলে একর প্রতি ফলস হবে ২৫ থেকে ৩০ টন।

লাউ চাষে ক্ষার এবং অম্লবিহীন মাটি লাগে। মূল গভীরে প্রবেশ করতে পারে না বলে অনুর্বর মাটিতে লাউ হয় না। আর অল্প-বিস্তর সার না দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায় না। তাই লাউ চাষের জন্য জমি তৈরির সময় হেক্টর প্রতি ৫০-৬০ টন গোবর সার প্রয়োগ করতে হবে। হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি নাইট্রোজেন ও ৬০ কেজি ফসফরাস দিতে হবে। হেক্টর প্রতি ৪-৬ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। ৪x১ মিটার দূরত্বে মাদা করে বীজ লাগাতে হবে। চারা বেড়ে উঠলে অবশ্যই মাচায় তুলে দিতে হবে।

লাউ চাষে গুরুত্বপূর্ণ—  কৃত্রিম হরমোনের ব্যবহার। গাছ যখন দু’টি পাতা অবস্থায় থাকে তখন এক বার এবং চার পাতা অবস্থায় আরও এক বার হরমোন এবং কেমিক্যাল স্প্রে করলে স্ত্রী-ফুলের সংখ্যা বাড়ে, ফলন বাড়ে।  হরমোন যেমন ম্যালিক হাইড্রজাইড এবং ২, ৪-৫ ট্রাইআইওডোবেনজইক অ্যাসিড ১ লক্ষ ভাগের ৫০ ভাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। বোরন ১ লক্ষ ভাগের ৩ ভাগ এবং ক্যালসিয়াম ১ লক্ষ ভাগের ২০ ভাগ স্প্রে করলেও ভাল ফল পাওয়া যায়।

লাউ গাছে কাটুই পোকা, জাব পোকা লাগতে পারে। কাটুই পোকা লাগলে বিএইচসি, ডিডিটি গুঁড়ো মাটির উপর ছেটানো যেতে পারে।জাব পোকা লাগলে পাতা কুঁকড়ে নৌকার মতো দেখতে হয়। দমন করতে হলে রিজেন্ট এক লিটার জলে দেড় ছিপি বা ডাইকোফল ১ লিটার জলে ২ ছিপি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ফলের পোকা লাগলে কচি ফলটা তুলে ফেলতে হবে। ম্যালাথিয়ন স্প্রে করা যেতে পারে।

রোগের মধ্যে নিমাটোড ঘটিত রোগ, ভাইরাস রোগ প্রধান। ভাইরাস রোগে গাছ তুলে ফেলতে হবে। শুরুতেই ভাইরাস প্রতিরোধক্ষম জাত ব্যবহার করলে সমস্যা কমে। নিমাটোডের আক্রমণে গাছের বাড়ন্ত তেমন হয় না। গাছ মারা যায়। দমন করার জন্য মাটিকে জলে ভাসিয়ে ‘নিমাগন’ দিতে হবে। ‘ফুরাডন ১০ মিলিগ্রাম’ও স্প্রে করা যেতে পারে।