ছাপান্ন ভোগে| জন্মাষ্টমীতে পুরীর ছাপান্ন ভোগ ও শ্রীকৃষ্ণের ৪ ভোগ

ছাপান্ন ভোগে| জন্মাষ্টমীতে পুরীর ছাপান্ন ভোগ ও শ্রীকৃষ্ণের ৪ ভোগ

আজ বাংলা   কথিত আছে, ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে এসে তাঁর চার ধামে যাত্রা করেন। এই চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন। আর পুরী ধামে যেখানে তিনি ভোজন করেন সেখানে ভোগের কোনও চমক থাকবে না এটা কখনও হয়। সেখানেই তাঁকে ছাপ্পান্ন ভোগ দেওয়া হয়।

JagannathDev-এর রান্নাঘর এক অদ্ভুত জায়গা! পুরীর মহাপ্রসাদের এমনই গুণ যে, কোনও দিন সেখানে প্রসাদ বাড়তিও হয় না, আবার নষ্টও হয় না। মানুষের বিশ্বাস স্বয়ং লক্ষ্মী JagannathDev-এর ভোগ রান্না করেন। বছরের ৩৬৫ দিন জগন্নাথ মন্দিরের পিছনে এই রান্নাঘরেই তৈরি হয় Mahaprasad। একে রোষা ঘর বলে। এখানে সাধারণ ভক্তের প্রবেশ নিষেধ। রোষা ঘর রয়েছে ৭৫২টি উনুন, Mahaprasad রান্নার কাজে থাকেন তিনশ'রও বেশি রাঁধুনি।

যাঁদের বলা হয় সূপকার। রান্নার সময় সূপকার সারাক্ষণ নাকে মুখে গামছা জড়িয়ে থাকেন। রান্নার জন্য কোনও বিদ্যুৎ বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। কাঠের আগুনের উপর অনেকগুলি তেলের ল্যাম্প বা বাতি ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষের রান্না করা হয় এখানে। এখানকার রান্নার কৌশল চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। উনুনগুলিতে একটির উপর একটি মাটির পাত্র বসানো হয়। একটি উনুনে ৭টি পাত্র থাকে আর নীচে থাকে আগুন। কিন্তু অলৌকিক বিষয়, সবার আগে রান্না শেষ হয় সবথেকে উপরে যে পাত্রটি থাকে।

রোজই নতুন পাত্রে Mahaprasad রান্না হয় এখানে। আরও একটি অলৌকিক বিষয় রয়েছে এই রান্না ঘরে। লোকমুখে শোনা যায়, গঙ্গা আর সরস্বতী নদী একই সঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে এই রান্নাঘরের ভিতর দিয়ে। তবে তা বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই দুই নদীর জল দিয়েই রান্না হয়। বাইরে থেকে আনা কোন খাবারই JagannathDev-কে দেওয়া যায় না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা জিনিস রান্নাঘরে রান্না করে মহাপ্রভুকে দেওয়া হয়। জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়।

ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবারকে শঙ্খুড়ি বলা হয়। আর খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবারকে শুখুলি বলা হয়। এ ছাড়া থাকে নানা রকমের খিচুড়ি। এর সঙ্গে থাকে মিষ্টি। বলরামের বিশেষ ভোগে থাকে ক্ষীর এবং মালপোয়া। ফুটন্ত জলে সবজি এবং মশলা দিয়ে তৈরি করা হয় মহাপ্রভুর রান্না। তবে, পেঁপে, আলু, টমেটো, কাঁচা লঙ্কা ব্যবহার করা হয় না। মূলত দেশীয় সবজি যেমন রাঙ্গাআলু, পটল, কাঁচকলা, কাঁকরোল থাকে। তবে রথের দিন জগন্নাথের ভোগে থাকে বিশেষ ৫৬টি পদ।

পুরাণ বলছে, জন্মাষ্টমীতে ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের আট অবতার রূপকে পুজো করা হয়।  এই দিন এই আট অবতারের জন্ম হিসেবে চিহ্নিত। এই দিন সকাল থেকেই সমস্ত বাড়িতে এবং মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের পুজোর আয়োজন করা হবে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন পালন করার সময় শিশু কৃষ্ণের মূর্তিকে দুধ, মধু এবং গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে অভিষেক করান ভক্তরা। তারপর নতুন পোশাক, মুকুট, গয়না, ফুলের সাজে সাজানো হয়। ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় ৫৬ রকমের খাবার।

কথিত আছে, এই দিন মাঝরাতে শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই সারাদিন উপবাসে থেকে রাতে নাম-সংকীর্তন, স্ত্রোত্রপাঠ করে পুজো করা হয় শ্রীকৃষ্ণের। এছাড়াও, রাস-লীলা বা কৃষ্ণলীলার মতো নানা  অনুষ্ঠান সহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়।সাধারণত, যে কোনও দেবতারই পুজো হয় ৫৬ রকমের ভোগ দিয়ে। কিন্তু সবার পক্ষে এত ভোগ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই, সেই চারটি ভোগ শ্রীকৃষ্ণের খুবই প্রিয় সেইগুলোই দেওয়া হল যাতে ছাপ্পান্ন ভোগ না পেলেও মাত্র এই চার ভোগেই তুষ্ট হন শ্রীকৃষ্ণ।সব পুজোতেই চরণামৃত মাস্ট।

তাই নিষ্ঠা ভরে শ্রীকৃষ্ণের পুজো করার পর তাঁকে দিন দুধ, দই, মধু, ঘি, চিনি দিয়ে তৈরি পঞ্চামৃত বা চরণামৃত। পাঁচটি উপকরণে এটি তৈরি হয় বলে একে বলে পঞ্চামৃত। সব পুজোতেই চরণামৃত মাস্ট। তাই নিষ্ঠা ভরে শ্রীকৃষ্ণের পুজো করার পর তাঁকে দিন দুধ, দই, মধু, ঘি, চিনি দিয়ে তৈরি পঞ্চামৃত বা চরণামৃত। পাঁচটি উপকরণে এটি তৈরি হয় বলে একে বলে পঞ্চামৃত।উত্তর ভারতের জনপ্রিয় জলখাবার। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ উত্তর ভারতীয় হওয়ায় নাকি এই আলু পুরী খেতে খুবই ভালোবাসতেন। বানানোও খুবই সোজা।

ময়দায় সুজি, নুন, মিষ্টি, জোয়ান, ময়ান হিসেবে ঘি বা তেল মিশিয়ে মেখে নিন। এবার লেটি কেটে লুচির আকারে বেলে ছাঁকা তেলে ভাজুন। সঙ্গে আলু, টমেটো, সমস্ত গুঁড়োমশলা, আমচুর দিয়ে গা-মাখা গ্রেভি সমেত আলুর সবজি বা তরকারি বানান।ভারতীয় মিষ্টির মধ্যে উত্তর ভারতের মোহনভোগ অন্যতম। জন্মাষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণের ছাপ্পান্ন ভোগে এই মিষ্টি অবশ্যই দেওয়া হয়। বাঙালিরাও এই মিষ্টি খেতে খুবই ভালোবাসেন। বাংলায় এই মিষ্টি সুজি বা হালুয়া নামে বিখ্যাত। দুধ জ্বাল দিয়ে তাতে পরিমাণ মতো সুজি দিন।

কিছুক্ষণ জ্বাল দেওয়ার পর তাতে মিষ্টি, তেজপাতা, জাফরান দিয়ে নাড়তে থাকুন। ঘন হলে এলে এলাচ থেঁতো করে নামিয়ে নিন। ঠাণ্ডা হলে ওপরে কাজু, পেস্তা, কিশমিশ ছড়িয়ে দিন।ক্ষীর বা পায়েস ছাড়া কোনও দেবতার ভোগ কি সম্পূর্ণ হয়? পুরাণ বলছে, একেবারেই নয়। তাই জন্মাষ্ঠমীতে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা পেতে তাঁকে দিন সাবুদানা ক্ষীর। চাইলে সাবুর বদলে চাল বা সিমুই দিয়েও এই পায়েস রাঁধতে পারেন। দুধ ভালো করে জ্বাল দিয়ে তাতে সাবু দানা, চাল দিয়ে দিন। সিমুই দিয়ে করতে চাইলে আগে ঘিয়ে হালকা করে ভেজে নেবেন। জ্বাল দিতে দিতে চাল, সাবুদ দানা বা সিমুই সেদ্ধ হয়ে গেলে মিষ্টি দিন। ঘন হলে এলাচ থেঁতো করে ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। ঠাণ্ডা হলে ওপরে কাজু-কিশমিশ-পেস্তা দিয়ে সাজিয়ে দেবেন।

চলুন,দেখে নেওয়া যাক ৫৬ ভোগের পদ সমূহ-

১। দই
২। মুড়ি
৩। নারকেল নাড়ু
৪। খোয়া ক্ষীর
৫। শুকনো খিচুড়ি
৬। ‘পাচিলা কাঁদালি’ অর্থাৎ টুকরো টুকরো কলা
৭। ‘বড়া কান্তি’ বা বড় কেক
৮। ‘ঝিলি’ অর্থাৎ এক ধরণের প্যান কেক

৯। ‘মেন্ধা mundia’ বা বিশেষ এক প্রকারের ওড়িয়া কেক
১০। ‘মাথাপুলি’ বা পুলি পিঠে
১১। ‘হামসা কেলি’ নামে এক ধরণের মিষ্টি কেক
১২। ‘enduri’ অর্থাৎ নারকোল দিয়ে তৈরি কেক
১৩। ‘কণিকা’ বা সুগন্ধি ভাত
১৪। ‘আদাপচেদি’ অর্থাৎ আদা দিয়ে তৈরি চাটনি
১৫। লঙ্কার লাড্ডু

১৬। শাক ভাজা
১৭। করলা ভাজা
১৮। ছোট পিঠে
১৯। ‘বারা’ অর্থাৎ দুধের তৈরি এক প্রকারের মিষ্টি
২০। বোঁদে
২১। পান্তা ভাত
২২। ‘আরিশা’ অর্থাৎ ভাত দিয়ে তৈরি মিষ্টি


২৩। ‘খিড়ি’ বা দুধভাত
২৪। তাকুয়া মিষ্টি
২৫। ভাগ পিঠে
২৬। ‘কাদাম্বা’ নামের বিশেষ মিষ্টি
২৭। পাত মনোহর মিষ্টি
২৮। ‘দলমা’ অর্থাৎ ভাত ও সবজি
২৯। ‘গোটাই’ অর্থাৎ নিমকি
৩০। মিষ্টি লুচি,

৩১। ‘লুনি খুরুমা’ নামের নোনতা বিস্কুট
৩২। ‘কাকারা’ মিষ্টি
৩৩। বিড়ি পিঠে
৩৪। খাস্তা পুরী
৩৫। ‘কাদালি বারা’
৩৬। ‘চাড়াই নাগ’ মিষ্টি
৩৭। ‘সানা আরিশা’ অর্থাৎ চালের কেক
৩৮। পদ্ম পিঠে
৩৯। সাধারণ পিঠে
৪০। ‘মাধুরুচি’ নামে এক প্রকার মিষ্টি চাটনি
৪১। ‘কানজি’ অর্থাৎ চাল দিয়ে বানানো এক বিশেষ মিষ্টি
৪২। দই ভাত বা ‘দাহি পাখাল’


৪৩। ত্রিপুরী
৪৪। বড় আরিশা
৪৫। ‘সাকারা’ এক ধরণের সুগার ক্যান্ডি
৪৬। মনোহরা মিষ্টি
৪৭। মাগাজা লাড্ডু
৪৮। সুজি ক্ষীর
৪৯। মুগা সিজা
৫০। ঘি-ভাত
৫১। অন্ন
৫২। পানা
৫৩। ডাল
৫৪। ‘মাহুর’ বা ল্যাবরা
৫৫। ‘বিসার’ বা সবজি
৫৬। ‘সাগা নাড়িয়া’ অর্থাৎ নারকোলের দুধ দিয়ে মাখা ভাত।