গণ্ডকী চণ্ডী শক্তিপীঠঃ একান্ন সতীপীঠের এক সতীপীঠ গণ্ডকী চণ্ডী শক্তিপীঠ

গণ্ডকী চণ্ডী শক্তিপীঠঃ  একান্ন সতীপীঠের এক সতীপীঠ গণ্ডকী চণ্ডী শক্তিপীঠ

দেবী সতী দক্ষ রাজার অমতে মহাদেবকে বিবাহ করেছিলেন। প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশে একটি যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন দক্ষ রাজা। যজ্ঞের আগুনে আত্মঘাতী হন সতী। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন মহাদেব। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ভয়ে ভগবান বিষ্ণু প্রলয় থামাতে, সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে দেন। দেবীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে। এই সব কটি জায়গাকে সতীপীঠ বলা হয়। সতীর ৫১ পীঠ হিন্দু ধর্মে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাগুলি প্রত্যেক হিন্দুর কাছে পরম পবিত্রের জায়গা। বিভিন্ন জায়গা জুড়ে রয়েছে এই ৫১ পীঠ।

এই পীঠস্থানটির সঠিক স্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, শালগ্রামের কাছে গন্ডক নদীর উৎপত্তিস্থলে এই পীঠস্থান। আবার কেউ কেউ বলেন, এটা নেপালে মুক্তিনাথ তীর্থ। নেপাল তিব্বত সীমান্তে কালী গন্ডকীর উৎস মাসতং-ই এই পীঠস্থান। এখানে আছে চন্ড নামে অনাদি লিঙ্গ। নদীর উৎসমুখের কুন্ডে দেবীর অবস্থান। কোন মূর্তি নাই। শিলাখন্ডে পূজা হয়। এখানে পতিত হয় সতীর গন্ডদেশ। দেবী হলেন গন্ডকী চন্ডী। ভৈরব চক্রপাণি।

পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে একাদশ শক্তিপীঠ হল দেবী গণ্ডকী চণ্ডী । এই পীঠ নেপালে। ভগবান বুদ্ধের জন্মস্থান সেই নেপাল। আবার ভিন্ন মতে হরিদ্বারে একটি চণ্ডী মন্দির দেখা যায়। কেউ কেউ সেই ক্ষেত্র কে চণ্ডী দেবী বলেন । এখানে দেবী সতীর গণ্ড দেশ পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম গণ্ডকী চণ্ডী, ভৈরব হলেন চক্রপাণি । ভারতচন্দ্রের মতে ভগবান বিষ্ণুর চক্রে খণ্ডিত হয়ে দেবীর ডান গণ্ড এখানে পতিত হয়েছিল । কারোর মতে বিহারের বক্তিয়ারপুরে এই পীঠ। তান্ত্রিক দের মতে নেপালের মুক্তিনাথে এই পীঠ অবস্থিত। পীঠ গবেষক দের মতে গণ্ডকী নদীর উৎপত্তি স্থলেই এই পীঠ । এখানে শালগ্রাম শিলা পাওয়া যায় ।

ভারতচন্দ্র লিখেছেন- গণ্ডকীতে ডানি গণ্ড পড়ে চক্র ঘায় । চক্রপাণি ভৈরব, গণ্ডকী চণ্ডী চায় ।। চণ্ডী দেবীর কথা আমরা ‘দেবীমাহাত্ম্যম্’ – এ পাই । সেখানে বলা আছে দানবরাজ মহিষাসুরের হাতে পরাজিত দেবতাগণ প্রজাপতি ব্রহ্মার সহিত শিবলোকে গমন করেন। সেখানে উপস্থিত হরি আর হরের কাছে সবিনয়ে দুঃখের কথা নিবেদন করেন । ত্রিদেব ও দেবতাদের তেজে এক দিব্য নারীর আবির্ভাব হয় । দেবতারা অলংকার, যুদ্ধাস্ত্র, বসন, চূড়া, মাল্য দ্বারা সেই নারীকে সজ্জিত করেন । বাহন রূপে প্রদান করা হয় পশুরাজ সিংহকে । সেই দেবী হলেন চণ্ডী ।

প্রবল পরাক্রমশালী মহিষাসুরের সেনাপতি ছিলেন চামড়, চিখুর, মহাহনু, বিড়ালাক্ষ, উদগ্র , অসিলোমা নামক অজেয় বীর অসুর গন । তাছারাও ছিল চতুরঙ্গ সেনা, অশ্ব, হস্তী , রথ । সকলে মিলে দেবীর সহিত যুদ্ধ করতে আসলে দেবী সকল দানব সেনাপতি দের নাশ করেন। দেবীর বাহন মহিষের সেনাদের ধ্বংস করে। অন্তিমে মহিষাসুর সসৈন্যে দেবীর হাতে নিহত হন । এই দেবীকে মহিষমর্দিনী দেবী চণ্ডী নামে পূজা করা হয় । পুনরায় এই দেবী শুম্ভ নিশুম্ভ নামক দৈত্য দের বধ করবার জন্য ভগবতী পার্বতীর কোষ থেকে প্রকট হয়েছিলেন । মধ্যযুগে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্য রচনা করেন ।

সেখানে চণ্ডী দেবীর নানান লীলার কথা জানা যায় । পূর্ব ভারতের গ্রামে গঞ্জে চণ্ডী দেবীর পূজা দেখা যায় । মঙ্গলচণ্ডী পূজা, বিপদনাশিনী চণ্ডীর পূজা দেখা যায় । ‘চন্ডী’ শব্দ মুণ্ডারী শব্দ ‘চান্ডি’ থেকেই এসেছে। আদিম জনগোষ্ঠীর লোকেরা শিলাখণ্ডে এই দেবীর পূজা করতেন । ছোটনাগপুরের ওঁরাও জনজাতির মধ্যে এই দেবীর পূজা দেখা যায় । ইনি প্রসন্ন হলে যুদ্ধ ও পশুশিকারে সফল হওয়া যায় । আমরা দেখেছি যুদ্ধে বিজয় প্রাপ্তির জন্য ভগবান রামচন্দ্র এই চণ্ডী দেবীর অকালবোধন করেছিলেন , অর্জুন এই দেবীর স্তব স্তুতি করে আশীর্বাদ নিয়ে যুদ্ধ যাত্রা করেছিলেন, রাজা সুরথ যবন রাজাদের হাত থেকে নিজ রাজ্য উদ্ধার করার জন্য এই দেবীর পূজা করেছিলেন । সুতরাং চণ্ডীদেবীর পূজো বহুকাল আগে থেকেই প্রচলিত । বর্তমানে আমরা হিন্দু বাঙ্গালী গন মঙ্গলচণ্ডী, বিপদত্তারিনী, সঙ্কটনাশিনী ইত্যাদি রূপে দেবী চণ্ডীকার আরাধনা করে থাকি ।  

গণ্ডকী নদীর উৎপত্তি স্থলকেই এই পীঠ ধরা হয় । গণ্ডকী নদীও মহাপবিত্র নদী । বলা হয় এই নদীতে অবগাহন করলে শরীর মন পবিত্র হয় । এই নদীর উৎপত্তি নিয়ে বরাহ পুরানে একটি কাহানীর বিবরণ আছে । ভগবান বিষ্ণু ত্রিলোকের মঙ্গল কামনায় এখানে কঠোর তপস্যা করেন । অতি উগ্র তপস্যার ফলে ভগবান হরির গণ্ড দেশ থেকে স্বেদ বিন্দু ঝরতে থাকে। সেই স্বেদ বিন্দু থেকেই পরম পবিত্র পাপ হারিনী গণ্ডকী নদীর সৃষ্টি হয় ।

এখানে অনেকে শালগ্রাম শিলা খুঁজেন। যাদের ওপর ভগবান হরি কৃপা করেন- তাঁরা হরির সান্নিধ্য লাভ করেন । হরি সেই পরম ভক্তদের সহিত তাঁদের নিবাসে এসে শালগ্রাম রূপে পূজা গ্রহণ করেন। শালগ্রাম শিলার প্রান প্রতিষ্ঠা বা বিসর্জন হয় না । বিষ্ণু মূর্তিতে যেমন প্রান প্রতিষ্ঠা করতে হয়- আবার পূজা শেষে বিসর্জন দিতে হয়, শালগ্রামে তেমন বিধান নেই । সাধু সন্ন্যাসী রাও অনেক সময় ভক্তদের শালগ্রাম প্রদান করে থাকেন । তবে তা বুঝে। কেন কি কিছু শালগ্রাম গৃহস্থ দের পূজা নিষেধ। কেবল ব্রহ্মচারী দের আরাধ্য । এখানে নীলকণ্ঠ হ্রদ আছে । স্কন্দপুরানে এই হ্রদের সৃষ্টির একটি কাহানী আছে ।

একদা মা পার্বতী এখানে জয়া বিজয়াকে নিয়ে স্নানে এসেছিলেন । স্নান সাড়ার পর তিনি জয়া বিজয়াকে এই হ্রদের কাহানী বলতে লাগলেন । কাহানী এইরূপ যে, দেবতা ও অসুর রা মিলে ক্ষীর সাগড় মন্থন করেছিলেন । সাগর থেকে ভয়ানক বিষের পাত্র বেরিয়ে আসলো। সেই বিষের তীব্রতা এমন যে চারপাশে বিষাক্ত আবহাওয়া, অগ্নি শিখায় জ্বলতে লাগলো । কিন্তু এখন উপায় কি? ভগবান বিষ্ণু তো কূর্ম অবতার নিয়ে মন্দার কে ধারন করেছেন। প্রজাপতি ব্রহ্মার পক্ষে এই বিষ দূর করার উপায় ছিল না। তাই বিপদ থেকে বাঁচতে সকলে বাবা ভোলানাথের শরণাপন্ন হলেন । ভগবান তারকনাথ সকলকে অভয় দিয়ে নিমিষে বিষ পান করলেন । বিষ পানের পর ভগবান শিবের অসহ্য জ্বালা শুরু হলে তিনি এই কুণ্ডে স্নান করে সেই জ্বালা দূর করেন। সেই থেকে এই হ্রদের নাম নীলকণ্ঠ হ্রদ । একে গোসাইকুন্ড নামেও ডাকা হয় ।

তন্ত্রে আবার বলে মা তারা দেবাদিদেব কে শিশু বানিয়ে স্তন্য পান করিয়েছিলেন, বিষের জ্বালা দূর করতে । এখানে তিনি শিবের ও মাতৃরূপা । এর মধ্যে তত্ত্ব কথা আছে । মা তারা হলেন ভগবান শিবের অর্ধাঙ্গিনী । কিন্তু কেন মাতৃরূপা হলেন ? স্ত্রী বা নারী জাতির মধ্যে তিন রূপ দেখা যায়। যখন সে সন্তানের লালন পালন করে- সে মাতৃ রূপা, আবার যখন স্বামী ও শ্বশুর কূলকে রান্না করে পরিবেশন করেন তখন তিনি অন্নপূর্ণা রূপা। আবার স্বামীর সাথে যখন শয়ন করেন তখন তিনি কামিনী রূপা । আবার সেই স্বামীর অসুখ বিসুখে সেবা করেন, তখন তিনি মাতৃ রূপা। যেমন মা তার সন্তান কে লালন পালন করেন ।

মূল প্রসঙ্গে আসি। ভগবান শিব বিষ পান করেছিলেন। এর মধ্যেও তত্ত্ব কথা আছে। সংসারের ত্রিতাপ জ্বালা বিষ সেই শম্ভুই তো হরণ করেন । তাই শিব ভক্তের অন্তরের সকল বিষ হরণ করেন সেই নীলকণ্ঠ শিব । গণ্ডকী চণ্ডীর মন্দির পাহাড়ের ওপর। মন্দিরের পাঁচিলে ১০৮ পিতলের নানান জন্তুর মুখ বসানো আছে । প্রতিটিড় মুখ থেকে বারিধারা পড়ছে। সেখানে স্নান সেড়ে ভক্তেরা মন্দিরে প্রবেশ করেন । মন্দিরে লামা পূজারীরা পূজো করেন । এখানেই দেবী চণ্ডীকার পূজা হয় । এই হল গণ্ডকী চণ্ডীপীঠ । ভারত নেপালের মধ্যে কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতীয় নাগরিক গন এখানে ভিসা পার্স পোর্ট ছাড়াই যেতে পারেন । তবে সেখান থেকে কিছু কিনে আনলে ট্যাক্স দিতে হবে কাষ্টম কে । আসুন আমরা দেবী চণ্ডীকে প্রনাম জানাই । মায়ের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেমন অধার্মিক মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের শান্তি এনে দিয়েছিলেন, আমাদের জীবন থেকেও যেনো সেরূপ নানান অমঙ্গল, বিপদ কে নাশ করেন । জয় মা চণ্ডী ।