জর্জ টমাস | আইরিশ সৈনিক থেকে ভারতের স্বাধীন রাজা জর্জ টমাস

জর্জ টমাস |  আইরিশ সৈনিক থেকে ভারতের স্বাধীন রাজা জর্জ টমাস

জর্জ টমাস (১৭৫৬ - ১৮০২) একজন ভাগ্যান্বেষী আইরিশ সৈনিক, পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীন রাজা হয়েছিলেন। জর্জ টমাস ভিনদেশি হয়েও নিজ বুদ্ধিবলে এবং বাহুবলে একজন অশিক্ষিত সাধারণ শ্রমিক থেকে একজন রাজা হয়েছিলেন।  ১৭৫৬ খ্ৰীঃ তিনি আয়ারল্যান্ডে গরীব কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সেই বাবা মারা যাওয়ায় তিনি ব্রিটিশ রয়াল নেভি-র একটি জাহাজের শ্রমিক হিসাবে মাদ্রাজ উপকূল আসেন।

কিন্তু তার ঐ জীবন পছ্ন্দ না হওয়ায় তিনি একদিন জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে সাঁতরে চলে আসেন তীরে। সেখান থেকে এক সরাইখানায় এসে পৌছান যার মালিক ছিলেন টমাস কেলি। ব্রিটিশ নেভি থেকে পলাতকের শাস্তি হল ৫০০ চাবুকের মার। কেলি তাকে আশ্রয় দেন। ১৭৮১ সালে ভারতে তখন এক অরাজক অবস্থা বিরাজমান ছিল। একদিকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা, মারাঠাদের সাথে কিছু প্রাদেশিক শক্তির উত্থান অপরদিকে ব্রিটিশদের ভারতে ধীরে ধীরে প্রবেশ হতে থাকে।

কেলি তাঁর সব কথা শুনলেন, আশ্রয় দিলেন আর বললেন এ দেশে তলোয়ার চালাতে পারলে তার খাওয়ার অভাব হবে না। কেলির পরামর্শ মতো জর্জ নিজামের সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। সেখানে ক’মাস চাকরি করার পর হঠাৎই অদৃশ্য হন। ছয় বছর পর তাকে দেখা যায় দিল্লিতে। ভাগ্যান্বেষী সৈনিক থেকে তিনি তখন একজন শিক্ষিত সৈনিকে পরিণত। ঐ ছয় বছর কোথায় ছিলেন? শোনা যায় তিনি নিজামের সেনাবাহিনী ছেড়ে দুর্ধর্ষ ডাকাত পিন্ডারীদের দলে যোগ দেন। এরপর সর্দানার বেগম সমরু এক পেশাদার সৈন্যদল বানাতে চাইছিলেন আর সেই দায়িত্ব পান টমাস।

তাঁর উপর দায়িত্ব হাজার জন সৈন্যকে শিক্ষা দেওয়ার। তাঁর নেতৃত্বে সেই বাহিনী হয়ে উঠল অজেয়।  ধীরে ধীরে তাঁর পদোন্নতি হল। বেগম সমরুর প্রধান পরামর্শমদাতা হলেন। এক সময়ে বেগম সমরুর সাথে তার মতানৈক্য শুরু হল। যোগ দিলেন আপ্পা রাওয়ের দলে। সেই সময় তিনি ‘জাহাজি সাহেব’ নামে পরিচিত হন। তিন বছর পরে আপ্পা রাওয়ের মৃত্যুর পর জর্জ নিজে কিছু করার কথা ভাবলেন। ততক্ষণে অবশ্য তাঁর অধীনে ২০০০ সৈন্য, যাঁরা তাঁর জন্য জীবন পণ করতেও রাজি। ১৭৯৭ সালে হরিয়ানায় নতুন রাজ্যের পত্তন করেন তিনি।

হানসি (Hansi) হল তার রাজধানী। রোহতক নগরের দু’মাইল দক্ষিণে জর্জগড় নামে একটি দুর্গ স্থাপন করেন। লোকেরা সেটিকে জাহাজগড় বলত। তিনি হলেন হরিয়ানা রাজ্যের ‘শ্বেত রাজা’। প্রথমে তার রাজ্যে প্রজা কম ছিল। তিনি সেখানে টাঁকশাল স্থাপন করেন। নানা জায়গা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেন। ধীরে ধীরে হরিয়ানা পূর্ণতা লাভ করে। তাঁর রাজ্যের চারপাশে তখন মারাঠা, রাজপুতানা আর শিখরা। স্বপ্ন ছিল শস্য-শ্যামলা পাঞ্জাব দখল করার। কিন্তু তার জন্য চাই আরো বড়ো শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী আর অর্থ।

এই সব ভেবে তিনি প্রতিবেশী রাজপুত রাজ্য আক্রমণ করে বসলেন। ওই যুদ্ধ ‘ফতেপুরের যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। বিজয়ী হলেন তিনি। কিন্তু ফল হল উল্টো। কিছুদিন পরেই মারাঠা, শিখ দলবদ্ধভাবে তার রাজ্য আক্রমণ করল। বেগম সমরুও সৈন্য পাঠিয়েছিলেন প্রতিশোধ নিতে। অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে, এই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে যুদ্ধে এগিয়ে যান তিনি। যুদ্ধে তার বন্ধু-সেনাপতি হপকিনের মৃত্যু হয়। তিনি পিছিয়ে আসেন।পরাজয় স্বীকার করেন। শর্তসাপেক্ষে ইংরেজ সৈন্যদলে যোগ দেবার অনুমতি পান। ১৮০২ সালে রাজ্য পরিত্যাগ করেন।

কথা ছিল কলকাতা হয়ে স্বদেশে ফিরবেন। কিন্তু তার আগেই বহরমপুরে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মারা যান। বহরমপুরের বাবুলবোনা রেসিডেন্সি সমাধিক্ষেত্র। ৩৪ নং জাতীয় সড়কের পাশেই। ভাবতে অবাক লাগে এত অল্প বয়সে একজন অশিক্ষিত শ্রমিক থেকে তিনি শিক্ষিত রণকুশলী রাজায় পরিণত হয়েছিলেন কী ভাবে। সবুজ ঘাসের নীচে অবহেলায়শুয়ে আছেন তিনি, এ দেশের মাটিতে।