আমেরিকার প্রথম সেলেব রাঁধুনিকে চিনে নিন

আমেরিকার প্রথম সেলেব রাঁধুনিকে চিনে নিন

 প্রবাসী ভারতের বিশ্বজয়ের নানা গল্প রয়েছে। তবে এই মানুষটি হয় তো স্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছেন। ভাবতে অবাক লাগে, আঠারো শতকের শেষের দিকে ভারত ছেড়ে আসা একজন পাশ্চাত্য সমাজের রান্নাঘরে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁর হাতের তৈরি একের পর এক রান্নায় মুগ্ধ হয়েছেন মার্কিন মুলুকের বাসিন্দারা।

হ্যাঁ সত্যি, বিশ্বে তথা আমেরিকায় অ্যান্থনি বোরডেইন (Anthony Bourdain), গর্ডন রামসে (Gordon Ramsay) বা নাইজেলা লসনের (Nigella Lawson) মতো সেলেব রাঁধুনি আসার আগেও একজন বিখ্যাত রাঁধুনি ছিলেন। তাঁর নাম প্রিন্স রঞ্জি স্মাইল (Prince Ranji Smile)। বলা ভাল, আমেরিকার প্রথম সেলিব্রিটি শেফ প্রিন্স রঞ্জি স্মাইল। আঠারো শতকের শেষের দিকে করাচি থেকে লন্ডনে চলে আসেন প্রিন্স স্মাইল রঞ্জি। এর পর ইংল্যান্ডের নানা রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন।

পরের দিকে ইংল্যান্ডের সিসিল হোটেলে (Cecil hotel) কাজ পান। সেই সময় তাঁর রাঁধুনির মুন্সিয়ানা মন জিতে নেয় বিখ্যাত শেফ লুই শেরির (Louis Sherry)। এর পর ১৮৯৯ সালে ব্রিটিশ স্ত্রীকে নিয়ে মার্কিনে মুলুকে পাড়ি দেন তিনি। শেরির সহযোগিতাতেই কাজ পেয়ে যান স্মাইল। এবার মজাদার সব ভারতীয় রেসিপির সাহায্যে আমেরিকার বাসিন্দাদের জিভে জল এনে দেন প্রিন্স রঞ্জি স্মাইল। ১৯০৭ সাল। ইতিমধ্যে আমেরিকার নানা জায়গায় নিজের রান্নার দক্ষতা দেখাতে শুরু করেন তিনি। নিজের আকর্ষণীয় উপস্থাপনা আর অনবদ্য প্রতিভাবলে পাশ্চাত্যের একাধিক এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন স্মাইল।

১৮৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর একটি পার্ক কান্ট্রি বুলেটিনে স্মাইলের এক বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে স্মাইলকে বলতে শোনা যায়, যদি আমেরিকার মহিলারা তাঁর তৈরি খাবার খান, তাহলে তাঁরা কল্পনাতীত সুন্দর হয়ে উঠবেন। নিজের তৈরি একের পর এক মেনু আর ইন্ডিয়ান ক্যুইজিন বিক্রি করার জন্য একাধিক মজাদার দাবিও করতেন তিনি। স্মাইলের হাত ধরে তত্‍কালীন সময়ে ব্র্যান্ড ইমেজ ও বিজ্ঞাপনের নানা ঝলক দেখা যায়।

বেশ কয়েকটি জায়গায় স্মাইলকে বলতে শোনা যায়, তাঁর তৈরি খাবার খেলে মহিলাদের চোখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তাঁদের গায়ের রং আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। ভারতীয় নারীদের মতো আকর্ষণীয় শরীর হয়ে উঠবে তাঁদের। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ সারাহ লোমানের লেখা Eight Flavors বইতে স্মাইলের রান্নার মুন্সিয়ানা নিয়ে বিশদে বর্ণণা দেওয়া হয়েছে।

বেশ আকর্ষণীয় ভাবে তাঁর হ্যান্ডসাম লুকেরও বর্ণনা করা হয়েছে এই বইটিতে। Better India-র একটি প্রতিবেদনে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেই সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বিশ্ববিখ্যাত রাঁধুনির মেনুতে কিন্তু বরাবর দেশের ছোঁওয়া ছিল। সেই সময় ইন্ডিয়ান ভাগি টোপুর (Indian Bhagi Topur), কালু শেরি (Kalooh Sherry), মুরগি রেইন (Murghi Rain), মাস্কি সিন্ধ (Muskie Sindh), কারি অফ চিকেন মাদ্রাস (Curry of Chicken Madras), বম্বে ডাক-সহ একাধিক ডিশ দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

তবে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তার আর একাধিক বিধিনিষেধের জেরে আমেরিকায় বেশি দিন টিঁকতে পারেননি স্মাইল। ১৯১৭ সালে ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের সূত্র ধরে স্মাইলের মতো দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দাদের আমেরিকার নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকার হয়ে লড়াই করতে চাপ দেওয়া হয় স্মাইলকে। হাজার চেষ্টার পর যে দেশের নাগরিকত্ব মেলেনি, সেই দেশের হয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে লড়াই করতে চাননি স্মাইল। শোনা যায়, এর পর স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তার পর কী হয়েছিল, সেই বিষয়ে আর তেমন কিছু জানা যায়নি!