হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর জীবনী

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর জীবনী

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (Haraprasad Shastri) বাঙালি গবেষক এবং একাধারে বহুভাষাবিদ, পুঁথি সংগ্রাহক ও বিশ্লেষক হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর স্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করার সুবাদে তিনি ‘শাস্ত্রী’ উপাধি লাভ করেছিলেন। তাঁর সবথেকে উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক কাজ হল ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার।

১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়াও কিছু উপন্যাস লিখেছেন তিনি যার মধ্যে ‘কাঞ্চনমালা’ (১৯১৬), ‘বেনের মেয়ে’ (১৯২০) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ পায় ‘ভারত মহিলা’ নামে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর নাট্যরূপ দিয়েছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ১৯০০ সালে সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপালের পদে অধিষ্ঠিত হন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যক্ষ হন তিনি। দীর্ঘ বারো বছর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি পদে এবং তার পাশাপাশি এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি পদেও দুই বছর কাজ করেছেন তিনি।

১৮৫৩ সালের ৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার নৈহাটিতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রামকমল ন্যায়রত্ন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলাদেশের যশোর জেলার কুমিরা গ্রামে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আসল নাম শরৎনাথ ভট্টাচার্য। তাঁর বাবা রামকমল ভট্টাচার্য ‘ন্যায়রত্ন’ উপাধি পেয়েছিলেন। হরপ্রসাদের দাদার নাম নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চু।

তাঁর পরিবারের উর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ রাজেন্দ্র বিদ্যালঙ্কার সপ্তদশ শতাব্দীতে নলডাঙার আদালতে রাজপণ্ডিতের কাজ করতেন। সেই সময় থেকেই তাঁর পরিবারের সকলে সংস্কৃত চর্চা শুরু করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রপিতামহ পণ্ডিত মাণিক্য তারকভূষণ প্রথম কুমিরা গ্রাম থেকে নৈহাটিতে এসে ওঠেন। শৈশবেই তাঁর বাবা মারা যান এবং সেই থেকে তাঁর দাদার কাছেই মানুষ হন তিনি। পরবর্তীকালে বর্ধমানের সহ-বিচারপতি কৃষ্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয়া কন্যা হেমন্তকুমারী দেবীর সঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিবাহ হয়।

তাঁদের মোট পাঁচটি পুত্র যথাক্রমে সন্তোষ, আশুতোষ, পরিতোষ, বিনয়তোষ ও কালীতোষ এবং তিনটি কন্যা সন্তানের নাম যথাক্রমে মনোরমা, সুরবালা এবং সুষমা। ১৮৬৬ সালে গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। এরপরে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন তিনি। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ে তাঁর নাম পালটে রাখা হয় হরপ্রসাদ। কারণ কিছুদিন আগেই এক কঠিন অসুখে তাঁর প্রাণসংশয় হয়েছিল এবং হর অর্থাৎ শিবের প্রসাদে তাঁর জীবন বেঁচে যায় বলে তাঁর দাদা ও পিতৃব্যরা নাম পালটে রাখেন হরপ্রসাদ।

শরৎনাথ থেকে তিনি হরপ্রসাদে পরিণত হলেন। ১৮৭১ সালে নানাবিধ বাধার মধ্য দিয়ে সংস্কৃত কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন হরপ্রসাদ এবং ১৮৭৩ সালে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেই সময় সংস্কৃত কলেজের ডিগ্রি ক্লাসের ছাত্রদেরকে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি পড়তে যেতে হত। ১৮৭৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি এবং স্নাতকের পরীক্ষায় অষ্টম স্থান অর্জন করেন। সংস্কৃত কলেজে ডবল প্রমোশন পেয়ে সরকারের থেকে ১৪ টাকা বৃত্তি লাভ করেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

১৮৭৭ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে তিনিই একমাত্র সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এর ফলে তিনি ‘শাস্ত্রী’ উপাধি লাভ করেন এবং একইসঙ্গে আড়াইশো টাকা মূল্যের বই উপহার পেয়েছিলেন পুরস্কার হিসেবে। তাছাড়া কুড়ি টাকা ও পঁচিশ টাকার দুটি পৃথক বৃত্তিও পান তিনি এইসময়। সংস্কৃত কলেজে পড়াকালীন তাঁর শিক্ষক ছিলেন প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী এবং মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন। এছাড়াও ইংরেজির শিক্ষক শ্যামাচরণ গাঙ্গুলির কাছেও তিনি ভীষণভাবে ঋণী কারণ তিনিই হরপ্রসাদকে সহজ বাংলা লিখতে শিখিয়েছিলেন।

১৮৭৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় হেয়ার স্কুলের অনুবাদ শিক্ষক ও হেডপণ্ডিত হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৮৮৩ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি হেয়ার স্কুলেই শিক্ষকতা করেন। তারপরে লক্ষ্ণৌর ক্যানিং কলেজে তেরো মাস অস্থায়ী শিক্ষকের পদে কাজ করেন। কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ, সংস্কৃত কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন হরপ্রসাদ।

১৮৮৩ সালে সংস্কৃত কলেজে রামনারায়ণ তর্করত্ন অবসর নিলে তাঁর জায়গায় অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ঐ বছরই ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখে ভারত সরকারের অনুবাদ বিভাগে সহকারী অনুবাদকের পদে আসীন হন তিনি। ১৮৮৬ সালে বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিকের পদে যোগ দেন তিনি। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সহায়তায় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যও হন তিনি। কোনরকম প্রশাসনিক কাজের জন্য আবেদন না করলেও মাঝে কিছুদিন নৈহাটির ম্যাজিস্ট্রেট বেঞ্চের অবৈতনিক পদের দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাঁকে, পরে যদিও তিনি এই বেঞ্চের সভাপতি হন।

১৮৮৮ সালে কলকাতায় সেন্ট্রাল টেক্সট বুক কমিটির সদস্য হন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ১৮৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্সি কলেজের সংস্কৃত বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি এবং ১৮৯৬ সালে তাঁরই উদ্যোগে সংস্কৃত ভাষার স্নাতকোত্তর বিভাগ চালু হয়। এই সময় ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার কারণে প্রাচীন সংস্কৃত অনুসারী টোলের শিক্ষাব্যবস্থা অবলুপ্ত হতে শুরু করে।

১৯০০ সালের ৮ ডিসেম্বর সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল পদে অভিষিক্ত হন হরপ্রসাদ। ১৯০৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদেই কর্মরত ছিলেন। হরপ্রসাদের কর্মজীবনের পাশাপাশি সাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল এফ.এ পড়ার সময় থেকেই। ১৮৭৪ সালে ইন্দোরের মহারাজা হোলকার সংস্কৃত কলেজে পরিদর্শনে এলে একটি প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করেন যেখানে বিষয় ছিল প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে এবং সমাজে বাঙালি মহিলার রূপ। এই প্রতিযোগিতায় ‘ভারত মহিলা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখে প্রথম হন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ডেপুটি গভর্নর জেনারেলের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

এরপরে এই প্রবন্ধটিকে মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করতে চেয়ে প্রথমে আর্যদর্শন পত্রিকার সম্পাদক যোগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাভূষণের কাছে যান তিনি। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখা করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই প্রবন্ধ পড়ে অত্যন্ত আহ্লাদিত হন এবং তাঁর সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন। এর পর থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর।

তাঁর জীবনে আরো দুইজন মানুষের বিরাট অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রথম হলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। অনেক কম বয়সেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে রাজেন্দ্রলাল মিত্র নিজের সহকারীর পদে স্থান দিয়ে পুঁথি সংগ্রহের কাজ ও তা দিয়ে ক্যাটালগ নির্মাণের কাজ করতে থাকেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র সেকালের বাংলায় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য এবং ভারততত্ত্বের এক অন্যতম গবেষক ছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মৃত্যুর পরে ১৮৯১ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সংস্কৃত পুঁথি সংগ্রহের ‘ডিরেক্টর অফ অপারেশন’ পদে নিযুক্ত হন হরপ্রসাদ।

চোদ্দোটি খণ্ডে প্রায় দশ হাজার সংস্কৃত পুঁথি সম্বলিত একটি ক্যাটালগ তৈরি করেন তিনি। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত রাজেন্দ্রলাল মিত্রের লেখা ‘নেপালের সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্য’ গ্রন্থে ষোলোটি অধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নিজে রচনা করেছিলেন রাজেন্দ্রলালের অসুস্থতার কারণে। এই বইয়ের ভূমিকাতেই রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর সুযোগ্য শিষ্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দুষ্প্রাপ্য পুঁথি সংগ্রহের কাজে তিনি বিভিন্ন সময় নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি রাজ্যে গিয়েছেন। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

এই পুঁথিটিতে তিনটি অংশ ছিল – চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদের দোহাকোষ এবং ডাকার্ণব। এর মধ্যে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ পুঁথিটিই পরবর্তীকালে চর্যাপদ নামে পরিচিত হয়। এই সমগ্র পুঁথির সম্ভারটি তাঁর সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯১৬ সালে প্রকাশ পায় ‘হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ নামে। এই বইটিই তাঁকে আবিশ্ব খ্যাতি এনে দেয়।

দীর্ঘ বারো বছর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি পদে এবং তার পাশাপাশি এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি পদেও দুই বছর কাজ করেছেন তিনি। তাঁর কৃতিত্ব ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি বাংলা ভাষায় মোট ১১টি বই লিখেছেন। গবেষণামূলক প্রবন্ধের পাশাপাশি কিছু উপন্যাস লিখেছেন তিনি যার মধ্যে ‘কাঞ্চনমালা’ (১৯১৬), ‘বেনের মেয়ে’ (১৯২০) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ‘বাল্মীকির জয়’, ‘মেঘদূত ব্যাখ্যা’, ‘সচিত্র রামায়ণ’, ‘প্রাচীন বাংলার গৌরব’, ‘বৌদ্ধধর্ম’ ইত্যাদি অন্যান্য বইগুলিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু পাঠ্যবইও লিখেছেন তিনি – ‘বাংলা প্রথম ব্যাকরণ’ এবং ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’। ১৯৩১ সালের ১৭ নভেম্বর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়।