হরিচাঁদ ঠাকুর

হরিচাঁদ ঠাকুর

শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর Harichand Thakur ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ অবিভক্ত বাংলার গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানার অন্তর্গত ওড়াকাঁন্দির পার্শ্ববর্তী সাফলাডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার মাতা-পিতার নাম অন্নপূর্ণা বৈরাগী ও যশোমন্ত বৈরাগী। তার প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা সেভাবে হয়নি, কিন্তু প্রেম-ভক্তির কথা সহজ-সরলভাবে প্রচার করতেন। বৈষ্ণব বাড়িতে জন্ম হওয়ার কারণে শাস্ত্র আলোচনার মাধ্যমে হিন্দু ও বৌদ্ধ শাস্ত্রের সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন, বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করার সুযোগে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তিনি।

তার প্রচলিত সাধন পদ্ধতিকে বলা হতো মতুয়াবাদ। তার দুই ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুর ও উমাচরণ। গুরুচাঁদ ঠাকুরের পিতা শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মৃত্যুর পর মতুয়া ধর্মের উন্নতিসাধন, শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হয়েছিলেন। শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনী নিয়ে কবি রসরাজ তারক চন্দ্র সরকার শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত নামক গ্রন্থটি রচনা করেন। বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল হরিদাস এবং তাঁর পাঁচ ভাই ছিলেন যথাক্রমে কৃষ্ণদাস, হরিদাস, বৈষ্ণবদাস, গৌরীদাস এবং স্বরূপদাস। 

তাঁদের আদি পদবী বিশ্বাস হলেও হরিচাঁদের ঠাকুরদার আমল থেকে তাঁরা ‘ঠাকুর’ পদবী পান উপাধি হিসেবে। জন্মকালে হরিচাঁদের শরীরে বিশেষ কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় যা থেকে অনুমান করা হয় যে তিনি মহাপুরুষের অবতার। সেই লক্ষণ অনুযায়ী তাঁর ভক্তরা তাঁকে চৈতন্যদেব ও গৌতম বুদ্ধের যৌথ অবতার বলে মনে করতেন।  প্রেম ও ভক্তিবাদের কথা খুব সহজ ভাষায় প্রচার করেছিলেন।

বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে তাঁর মধ্যে অনেকাংশেই ভক্তিবাদী আদর্শ বজায় ছিল। সমাজের পিছিয়ে পড়া দলিত মানুষের জন্য এবং নিম্নবর্গের মানুষদের সামাজিক অবস্হানের উন্নতির জন্য তিনি এক ধর্মীয় আন্দোলন প্রবর্তন করেন। তাঁর অনুগামীরা তাঁকে শ্রীবিষ্ণুর বিশেষ অবতার মনে করতেন এবং তাঁকে ‘পতিতপাবন’ বলেও মনে করে  থাকেন।পরবর্তীকালে ফরিদপুরের লোচন প্রামাণিকের কন্যা শান্তিবালা দেবীকে বিবাহ করেন হরিচাঁদ ঠাকুর। বাল্যকালে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে দূরে দূরে গরু চরাতে চলে যেতেন হরিচাঁদ।

কিন্তু ঐ সময় থেকেই বৈষ্ণবদের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে।    প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ তাঁর বিশেষ হয়নি। কিন্তু বৈষ্ণব পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে হিন্দু শাস্ত্র ও বৌদ্ধ শাস্ত্র সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয় তাঁর। বিভিন্ন শাস্ত্র আলোচনা ও প্রাসঙ্গিক শাস্ত্রপাঠের মাধ্যমে এই দুটি শাস্ত্রে তিনি প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন এবং একইভাবে চিকিৎসাশাস্ত্র, ইতিহাস ও ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কেও বুৎপত্তিগত জ্ঞান অর্জন করেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজে মনোবিবেশ করেন।

এই সময়ে তিনি সফলাডাঙ্গা ছেড়ে ওড়াকান্দিতে চলে আসেন। ছোটো থেকেই সমাজে উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি এই দলিত মানুষের উন্নয়নের জন্য পথ অনুসন্ধান করতে থাকেন। প্রাচীন পুঁথি ও শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি জানতে পারেন বৌদ্ধ ধর্মই হল একমাত্র মুক্তির পথ। তিনি বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব ধর্মের সমন্বয়ে মুক্তির পথ খুঁজে পান এবং সেই লক্ষ্যে সফলাডাঙ্গায় আসার পরে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি যোগবলে মানুষের রোগ নিরাময় ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান করতে শুরু করেন। ফলে দ্রুত চারিদিকে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা লোকমুখে প্রচারিত হয়। ক্রমে তাঁর ভক্তসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

তিনি যে নতুন ধর্মমত প্রচার করেন তা ‘মতুয়া’ নামে পরিচিত হয়। সেই সময় সমস্ত বৈদিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মত্ত হতে দেখে দলিত ও নিম্নবর্ণের মানুষদের ‘মত্ত’ বলে বিদ্রুপ করতেন উচ্চ বর্ণীয় ব্রাহ্মণরা। সেই ‘মত্ত’ শব্দ থেকেই প্রথমে ‘মউত্যা’ এবং শেষে ‘মতুয়া’ শব্দের উৎপত্তি বলে অনেকেই মনে করেন।

হরিচাঁদ প্রবর্তিত মতুয়া ধর্মে কোনো কাল্পনিক দেব-দেবীর পূজার প্রচলন নেই। হরিচাঁদ ঠাকুর তথাকথিত নিম্নবর্ণের ও সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি তাঁদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি এবং আর্থ-সামাজিক মুক্তির জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট হন। তিনি বলেন সংসারের মধ্যে থেকেই সাধনভজন করা সম্ভব। তাঁর জন্য কোন বাহ্যিক অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। তিনি এই বিশ্বাসকেই বাস্তবে কার্যকরী করে তোলার উদ্দেশ্যে তাঁর ভক্তদের বলেন ‘মুখে নাম হাতে কাম।’

মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি নিয়ে তিনি তাঁর নতুন ধর্মমত প্রচার করতে থাকেন। সেই সময়ে উচ্চবর্ণের মানুষরা যারা অধিকাংশই ছিলেন বৈষ্ণব বা হিন্দু ব্রাহ্মণ তাঁরা নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। ব্রাহ্মণরা ধর্মের নামে সমাজের সকল অধিকার থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে রেখেছিলেন। পুজো-পাঠ হোম-যজ্ঞের নামে ব্রাহ্মণরা নমঃশূদ্র গোত্রের এই সমস্ত নিম্নবর্ণের মানুষদের সম্পত্তি লুঠ করত। এই ধরনের ধর্মীয় অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভের আশায় দলিত অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষরা হরিচাঁদের সহজ সরল কথায় আকৃষ্ট হন।

হরিচাঁদ এই সমস্ত মানুষদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে তাঁদের একত্রিত করে ‘মতুয়া মহাসংঘ’ গড়ে তোলেন। সমাজের এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের তিনি একটি নতুন ধর্ম প্রদান করেন। সমস্ত উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় সংস্কার থেকে তাঁদের মুক্ত করে তাঁদের পরিত্রাতা হিসেবে তাঁদের পাশে দাঁড়ান হরিচাঁদ। হরিচাঁদের ধর্মের মূল বক্তব্যই ছিল কর্মের সঙ্গে ধর্মের সমন্বয়। তিনি পূর্ববর্তী সমস্ত হিন্দু ধর্মোপদেশকে প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন উপদেশ প্রচার করেন। পূর্ববতী হিন্দুধর্মে পরিবারকে মোক্ষলাভের অন্তরায় হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

কিন্তু হরিচাঁদ বলেন পরিবারের মধ্যে থেকেই মোক্ষ লাভ করা সম্ভব। তিনি কর্মের মাধ্যমেই মোক্ষলাভের পথ দেখান। ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য দীক্ষা বা তীর্থযাত্রা অপ্রাস‌ঙ্গিক বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর মতানুযায়ী ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসই মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায় হতে পারে, ঈশ্বরের নাম ‘হরিবোল’ ছাড়া সব কিছুই অর্থহীন। পূর্ববর্তী হিন্দু সাধকরা নারীকে ‘নরকের দ্বার’ বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু হরিচাঁদ বলেন নারীই হতে পারে সংসারে সাধনসঙ্গী। কিন্তু সংসারে থেকেও মোক্ষলাভের জন্য জরুরি সংযমী জীবন আর ঈশ্বরের প্রতি অচল বিশ্বাস।

তাঁর কাছে সমাজের সব মানুষই ছিলেন সমান। তাঁর এই আদেশগুলি মেনে নিয়ে প্রথমে নমঃশূদ্ররা তাঁকে ঈশ্বরের আসনে বসালেও পরে অন্যান্য বর্গের মানুষরা তাঁর অনুগামী হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সমস্ত অনুরাগী ভক্তদের বারোটি নির্দেশ দিয়ে যান। এইগুলি হল – ১) সর্বদা সত্য কথা বলা, ২) সকল নারীকে সম্মান করা, ৩) মা-বাবাকে সম্মান করা, ৪) জাতিগত ভিত্তিতে কখনও কাউকে অসম্মান না করা  ৫) পারিপার্শ্বিক সকল জীব ও প্রতিবেশীদের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা,

৬) ষড়রিপুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা,  ৭) নিষ্ঠার সাথে সকল দায়িত্ব পালন করা, ৮) অন্যান্য সকল ধর্মের প্রতি উদার থাকা, ৯) নিজের কাজ ও মনে সদা সৎ থাকা, ১০) নিজের আত্মা ও হৃদয়ে শুদ্ধ থেকে নিজ বাসস্হানে হরি পরমেশ্বরের একটি সুন্দর মন্দির নির্মাণ করা, ১১) ভক্তির দ্বারা প্রতিদিন ঈশ্বরের আরাধনা করা এবং ১২) ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ।

এই নতুন ধর্মমত সকল বর্ণের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে। মতুয়া ধর্মের নিজস্ব একটি ধ্বজা বা পতাকা রয়েছে যেখানে দেখা যায় লাল রঙের একটি পতাকার তিন দিকে সাদা লাইন টানা রয়েছে যার অর্থ সমান অধিকারের এবং সহাবস্থানের নীতিতে শান্তির জন্য বিপ্লব তৈরি করা। হরিচাঁদ ঠাকুর মারা যাওয়ার আগে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরকে দায়িত্ব দিয়ে যান মতুয়া মহাসংঘের। গুরুচাঁদও পিতৃআজ্ঞা পালন করে মতুয়া ধর্মকে সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তিনি দলিতদের জন্য কয়েকটি বিদ্যালয় স্হাপন করেন।

হরিচাঁদের ধর্মীয় সংস্কারমূলক কাজের জন্য তাঁকে বুদ্ধ ও বিষ্ণুর যৌথ অবতার বলে মনে করা হয়। মতুয়া মহাসংঘ ১৮৭২ সালে বাংলাদেশে নমঃশূদ্র আন্দোলনের প্রধান উদ্যোগ নেয়। তাঁরা ওড়াকান্দিতে মতুয়া মহাসংঘের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার ঠাকুরনগরে মতুয়াদের দ্বিতীয় সংগঠন এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথমদিকে এই মন্দির নির্মাণ নিয়ে বহু সমস্যা দেখা দিলেও বর্তমানে এই স্হান বহু মানুষের মিলনক্ষেত্র এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান। এখানে হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথিতে মতুয়া মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথি মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে সারা রাজ্যে ছুটি ঘোষণা করেছেন এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনী স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ১৮৭৮ সালের ৫ মার্চ হরিচাঁদ ঠাকুরের মৃত্যু হয়। প্রতি বছর চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথীতে ঠাকুর বাড়িতে মহাবারুনি স্নান ও মতুয়া মহামেলা হয়।

মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁর ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়ি ও মতুয়া ধাম বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মতুয়া ধাম ঠাকুরনগর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ১ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। প্রতিবছর চৈত্র মাসে মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ও তার কনিষ্ঠপুত্র শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শে মতুয়া ধামে মতুয়া মহামেলা বসে