শিশুর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর পাঁচ উপায়

শিশুর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর পাঁচ উপায়

আজবাংলা     শিশুদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং তাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া নিয়ে পুরো বিশ্বের ছয় হাজার ৩৩২টি গবেষণা মূল্যায়ন করে দেখা গেছে  করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তির তুলনায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫৬ শতাংশ কম। এ ছাড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও মারাত্মক অসুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি শিশুদের কম থাকে।

 শিশুদের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রয়েছে কিনা, সেটি বোঝাটাই অনেক কঠিন বলে মনে করেন শিশু বিশেষজ্ঞরা ।  ‘অনেক পরিবারের সদস্যরা বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের বাচ্চা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত কিনা। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের (শিশুদের) কোনো উপসর্গ থাকে না। যাদের জ্বর নেই, কাশি নেই, ছোট বাচ্চা হলে তো বলতেই পারে না যে গলাব্যথা হয়েছে, সে কারণে বোঝাটাই কঠিন।’

 শিশুরা যেসব রোগে আক্রান্ত হয়, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ। আর এর উপসর্গ হচ্ছে নাক দিয়ে জল পড়া, কাশি, নিশ্বাসের সময় ঘড় ঘড় করে শব্দ করা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গলাব্যথা অথবা কানে ব্যথা।’ করোনার উপসর্গগুলোও অনেকটা একই রকম। সে কারণে সাধারণ সর্দি-কাশি নাকি শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ নাকি করোনা, তা বোঝা যায় না।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে , যেসব পরিবারের কারো করোনা সংক্রমণ হয়েছে কিংবা কোভিড-১৯ রোগীর সংস্পর্শে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কিংবা যেসব শিশুর বাবা-মায়েদের বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হয়, সেসব শিশুর মধ্যে কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলেই তাকে পরীক্ষা করাতে হবে। সেইসঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে তাদের আলাদা করে ফেলতে হবে।

সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শিশুদের থেকে করোনাভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কতটা থাকে। কারণ, পরিবারে শিশুদের সঙ্গে অন্য সদস্যদের মেলামেশায় সাধারণত কোনো বিধিনিষেধ থাকে না। বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে তারা অনেক বেশি সংস্পর্শে আসে।

তবে শিশুদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস কতটা ছড়াতে পারে, সে বিষয়ে তেমন কোনো পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন যে তথ্য দেয় তাতে উল্লেখ করা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ৩১টি ক্লাস্টারের (গুচ্ছ সংক্রমণ) ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায় যে, মাত্র তিনটি ক্লাস্টারে সংক্রমণ শিশুদের থেকে হয়েছে। অর্থাৎ শিশুদের থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর হার ১০ শতাংশ।

গবেষকরা মনে করেন, যেহেতু শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক কম, তাই তাদের থেকে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম।‘শিশুদের মধ্যে যদি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উপসর্গগুলো বেশি থাকে, তাহলে ঝুঁকিও বেশি থাকে। আর উপসর্গ মৃদু বা উপসর্গহীন হলে সে ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রাটা কমে যায়।’

শিশুদের ‘যাদের মধ্যে জ্বর এবং কাশি থাকবে, তাদের থেকে সংক্রমণের মাত্রাটা বেশি থাকবে।’ পরিবারে যদি কোনো শিশু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়, সে ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে বাবা-মা বা যাঁরা সেবা দিয়ে থাকেন, তাঁদের মধ্যে বেশি থাকে।

এ বিষয়ে  বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত শিশুদের থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা, তা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।প্রথমটি হচ্ছে, শিশুর হাঁচি-কাশির মতো উপসর্গ বেশি থাকলে, তার থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকবে। আর উপসর্গ মৃদু থাকলে বা কম থাকলে ঝুঁকি কিছুটা কম থাকবে। কারণ, এতে ড্রপলেটস বা শ্লেষ্মাকণা নির্গত হওয়ার বিষয়টি জড়িত থাকে।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে কন্টাক্ট টাইম বা সংস্পর্শে আসার সময় কতটা। অর্থাৎ  যদি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত কোনো শিশু দীর্ঘ সময় ধরে বয়স্ক কারো সংস্পর্শে থাকে, তাহলে ঝুঁকির মাত্রাটা এমনিতেই বেড়ে যাবে।তবে সব মিলিয়ে শিশুদের থেকে বড়দের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি খুব বেশি নয় বলেও জানান  বিশেষজ্ঞরা

ঝুঁকি কমাতে কী করতে হবে?

শিশুদের থেকে বয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ভাইরোলজিস্টরা। এগুলো হলো :

শিশুদের আলাদা রাখা

১. শিশুরা যেহেতু সংক্রমণ ছড়ানোর বিষয়ে খুব বেশি কিছু বোঝে না, তাই পরিবারের অন্য সদস্য, বিশেষ করে যাঁরা বয়স্ক এবং যাঁদের অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাঁদের যতটা সম্ভব দূরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে দরজা বন্ধ রাখতে হবে, যাতে শিশুরা কাছে আসতে না পারে।

২. বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেহেতু বন্ধ, তাই শিশুদের বাইরে যাওয়ার মাত্রাও কম। তাই সে ক্ষেত্রে তাদের করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত রাখতে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য যাঁরা বাইরে যান, তাঁদের থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। সম্পূর্ণভাবে ভাইরাস মুক্ত না হয়ে বা বাইরে থেকে এসেই শিশুদের সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না।

৩. শিশুরা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে প্রয়োজনে তাদের হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে আলাদা ইউনিট বা ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে শুধু শিশুদেরই আইসোলেশনে রাখা হবে। এ ক্ষেত্রে সব শিশুর মধ্যে উপসর্গ থাকবে বলে তারা নিজেরা নিজেদের জন্য ঝুঁকির কারণ হবে না।

৪. যেহেতু শিশুদের সব সময় মাস্ক পরিয়ে রাখা সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া অন্য স্বাস্থ্যবিধিগুলোও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে বয়স্কদের আলাদা করে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে হলে শিশুদের মধ্যেও সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং বুঝিয়ে বলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেসব পরিবারে কোভিড-১৯ রোগী রয়েছে, সেসব পরিবারের বাচ্চাদের কিছু কিছু অভ্যাস মিনার কার্টুনের মতো বুঝিয়ে বলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন, শরীরের কোথায় কোথায় হাত দেওয়া যাবে না, কোনো কিছু যেনতেনভাবে ফেলে রাখা যাবে না, কোথায় যাওয়া যাবে না ইত্যাদি। সেইসঙ্গে শিশুদের বুঝিয়ে বলতে হবে কী কী খাবার বেশি খেতে হবে এবং কোন কোন কাজগুলো বেশি বেশি করতে হবে।