হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র

হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী এবং সেকালের বিখ্যাত গদর পার্টি একত্রে সমগ্র ভারত জুড়ে একটি ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল আর এই ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্রই ইতিহাসে হিন্দু-জার্মান-ষড়যন্ত্র মামলা (Hindu- German Conspiracy Case ) নামে পরিচিত। ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে জার্মান পররাষ্ট্রদপ্তর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর জার্মান কনস্যুলেট, অটোমান তুর্কী প্রদেশ এবং আইরিশ প্রজাতন্ত্রও জড়িত ছিল এই মামলার সঙ্গে।

ভারতের পাঞ্জাব থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত এক বিরাট বিদ্রোহ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল যার মূল লক্ষ্যই ছিল ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করা। হিন্দু-জার্মান গোপন আঁতাতকে সমূলে বিনাশ করতে একই সময়ে ভারতে শুরু হয় লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় হিন্দু-জার্মান-ষড়যন্ত্র মামলা যা কিনা মার্কিন মুলুকের ইতিহাসে সবথেকে দীর্ঘতম এবং সবথেকে ব্যয়বহুল মামলা ছিল।

১৯১৭ সালের ২০ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া এই হিন্দু-জার্মান-ষড়যন্ত্র মামলা র প্রধান অভিযুক্তরা ছিলেন ওয়াশিংটন ডিসি এবং সান ফ্রান্সিসকোর কনস্যুলার অফিসার সহ ৯ জন জার্মান নাগরিক, ৯ জন আমেরিকান এবং ১৭ জন ভারতীয় গদর পার্টির কর্মী ও সদস্য। ভারতীয়দের মধ্যে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তারকনাথ দাস, চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী, রামচন্দ্র, গোবিন্দ বিহারী লাল, ভগবান সিং, গোপাল সিং এবং সন্তোষ সিংহ। এমনকি এই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও।

মোট ১৫৫ দিন ধরে মামলা চলার পরে ১৯১৮ সালের ২৪ এপ্রিল এই মামলা শেষ হয়। এই মামলা পরিচালনার জন্য মার্কিন সরকারের মোট ৪ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার ব্যয় হয় এবং ব্রিটিশ সরকারেরও ২৫ লক্ষ ডলার খরচ হয়। মার্কিন অ্যাটর্নি অ্যানেট অ্যাবট অ্যাডামস এই মামলা পরিচালনা করেছিলেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পর থেকেই ভারতবাসীর মধ্যে সশস্ত্র গণ অভ্যুত্থানের ইচ্ছা বাড়তে শুরু করে। লেল্যাণ্ড স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লালা হরদয়াল প্রবাসী ছাত্রদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া শুরু করেন এবং তাঁদের সংগঠিত করতে থাকেন যার ফলে ১৯১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠে ‘প্যাসিফিক কোস্ট হিন্দুস্তান অ্যাসোসিয়েশন’।

সোহান সিং ভকনা এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। লালা হরদয়ালই ‘গদর’ নামে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন আর এই পত্রিকার নাম থেকেই তাঁদের সংগঠনটি গদর পার্টি বলে পরিচিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া, ইউরোপ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী ভারতীয়দের সংগঠিত করে এক বৃহত্তর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভের সময়েই এই পার্টির ক্রিয়াকলাপ শুরু হয়ে যায়। ব্রিটিশ বিরোধী বিভিন্ন দেশীয় শক্তিগুলির সহায়তা পায় এই পার্টি।

ব্রিটিশ বিরোধী জার্মানি সহ, অটোমান সাম্রাজ্যভুক্ত তুরস্কও গদর পার্টিকে সহায়তা করেছিল। পাঞ্জাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনার জন্য এই পার্টির কয়েকজন সদস্য এসেছিলেন ভারতে। মূলত সমাজতান্ত্রিক এবং উগ্র বামপন্থী বিপ্লবী সংগঠনগুলি এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। তবে ভারতের মাটিতে প্রত্যক্ষ বিপ্লব ঘটার বদলে এই ষড়যন্ত্র বাস্তুবায়িত হয়েছিল মার্কিন মুলুকের মাটিতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালেই বহু ভারতীয় বিপ্লবী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দারাও তাদের অনুসন্ধানে ব্যস্ত ছিল।

বার্লিন ভারত কমিটির সদস্য হিসেবে কয়েকজন ভারতীয় বিপ্লবী মস্কো, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ছড়িয়ে পড়ে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন লালা হরদয়াল, মৌলানা বরকতউল্লাহ, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এবং তাঁর ভাই পরমানন্দ প্রমুখ। ১৯১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই গড়ে ওঠে গদর দল। উর্দু শব্দ ‘গদর’ কথার অর্থ হল বিপ্লব। এমা গোল্ডম্যান, আলেক্সাণ্ডার বার্কম্যান এবং অ্যাগনেস স্মেডলির মতো আইরিশ সমাজতন্ত্রীরাও এই দলে যোগ দেন।

বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নিজস্ব পরিকল্পনার পাশাপাশি এই গদর দলের সদস্যরা বার্লিন, রাশিয়া এবং ইউরোপের বেশ কিছু সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদেরও একত্রিত করে ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ঠিক এই সময়েই মহাত্মা গান্ধী, মতিলাল নেহেরু এবং অ্যানি বেসান্তের মতো ভারতের নরমপন্থী কংগ্রেস নেতারা ব্রিটেনের বিরুদ্ধে একজোট হন। তাঁরা ভেবেছিলেন জার্মানির এই গদর দলের সঙ্গে তাঁদের মিত্রতা পরিবর্তে ভারতকে স্বশাসন এনে দেবে। অন্যদিকে ভারতের বিপ্লবীরা বিপ্লবের নতুন পথ উন্মোচন করার চেষ্টা করতে থাকে।

মাইয়া রামনাথ এবং সীমা গান্ধীর মতো ঐতিহাসিকরা ভারতে এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবীদের মতাদর্শ বিষয়ে বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে মার্কিন শক্তি নিরপেক্ষ থাকলেও মার্কিন সরকার এবং মার্কিন সংবাদপত্রগুলি সন্দেহ করেছিল যে জার্মানি হয়ত আমেরিকার নিউ জার্সির অস্ত্র-ঘাঁটি বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে এই নাশকতা ব্রিটিশের কাজ বলে দেখানোর চেষ্টা করছে। ১৯১৫ সালের মাঝামাঝি জার্মানির আর্থিক সহায়তায় চিন থেকে অস্ত্র ভর্তি জাহাজ ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে নিয়োজিত বিপ্লবীদের কাছে।

মার্কিন প্রদেশের পশ্চিম উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে ভারতে বিপ্লবী এবং অস্ত্র-শস্ত্র পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। ১৯১৭ সালের জুন মাসে সুকুমার চ্যাটার্জি নামের এক বিপ্লবীকে ব্যাঙ্ককে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। তিনি ম্যানিলা এবং ব্যাঙ্ককে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রেরণের কথা স্বীকার করে নেন পুলিশের কাছে। জার্মানির রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের কাছ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় এক বৃহত্তর গণ অভ্যুত্থান সংগঠিত করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন সুকুমার চ্যাটার্জি। ঠিক এই ঘটনার পরপরই ‘এ স্কুনার’ এবং ‘অ্যানি লারসেন’ নামের দুটি জাহাজ ওয়াশিংটনের হকুয়াম বন্দরে ধরা পড়ে আর একইসঙ্গে সিঙ্গাপুরের এস এস মাভেরিক জাহাজও বাজেয়াপ্ত হয় ব্রিটিশদের দ্বারা।

জার্মান কনস্যুলার অফিসিয়াল ফ্রানজ ভন প্যাপেন জার্মান ‘ক্রাপ’ কোম্পানির কর্মচারী হ্যান্স টাউসারকে অস্ত্র কিনে ভারত এবং নিউ ইয়র্কে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে অনেকের মতে আইরিশ বিপ্লবী জোসেফ ম্যাকগারিটি এই অস্ত্র কেনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। টেক্সাস থেকে প্রথমে সান দিয়েগোতে রাইফেল, পিস্তল, গোলা বারুদ ইত্যাদি সব অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন প্রদেশের সান পেড্রো বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের সোকোরো দ্বীপের কাছে অ্যানি লারসেন জাহাজের সঙ্গে এস এস মাভেরিক জাহাজটি একত্রিত হত।

যাতে কেউ কোনো সন্দেহ করতে না পারে তাই এই দুটি জাহাজকেই আমেরিকান কোম্পানির অধীনে সুপার কার্গো হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছিল। মাভেরিক জাহাজটি সিঙ্গাপুরে ধরা পড়ে যেখানে পাঁচজন গদর কর্মী পারসিদের ছদ্মবেশে উপস্থিত ছিলেন। এই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও। জাপান ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদের নিন্দা করেন এবং তাতে প্রবাসী ভারতীয়রা খুবই ক্ষুন্ন হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আমেরিকা যাত্রাকে তাই তারা হিন্দুদের বিপ্লবের পরিপন্থী বলে মনে করেছিলেন এবং সেই জন্য আমেরিকায় তাঁর বক্তৃতা বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করা হয়।

১৯১৮ সালের শেষদিকে গদর দলের এক সদস্য চন্দ্রকান্তের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয় যা থেকেই হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে যায় তাঁর নাম। যদিও পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে তিনি একটি চিঠি এবং টেলিগ্রাম পাঠিয়ে নিজের স্বীকারোক্তি জানান এবং ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের হস্তক্ষেপে মামলা থেকে রবীন্দ্রনাথ নিষ্কৃতি পান। এই মামলার রায় ঘোষণার দিন আদালত প্রাঙ্গনে রাম সিং তাঁর সহকারী রামচন্দ্রকে পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।

সেই সময়ই আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সশস্ত্র মার্শাল রাম সিংকে গুলি করেন। মামলার বিচারে তারকনাথ দাস ও ভগবান সিং দুই বছরের কারাবাসে দণ্ডিত হন। ব্রিটিশ সরকার চেয়েছিল তাঁদেরকে ভারতে নির্বাসিত করতে কিন্তু আমেরিকার বিচারবিভাগ এই সিদ্ধান্ত মানতে চায়নি। ১৯১৯ সালে গদর দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতে তাঁদের আসার পথ বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। যদিও ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে তারকনাথ এবং ভগবান সিং দুজনেই ভারতে আসেন এবং হিমাচল প্রদেশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অতিবাহিত করেন।