আরব উপদ্বীপের মুসলিম দেশ ইয়েমেনে হিন্দু ধর্ম

আরব উপদ্বীপের মুসলিম দেশ ইয়েমেনে হিন্দু ধর্ম

ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ। এটি আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ইয়েমেনের জনসংখ্যা অল্প। দেশের অর্ধেকের বেশি অংশ বসবাসের অযোগ্য। সানা’আ ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০ অব্দের দিকে উত্তর ইয়েমেনে প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের দিকে এ অঞ্চল ব্যবসায়ীদের জন্য অতি উত্তম রুট হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। খ্রিস্টের সময়ে এ অঞ্চলের স্বাভাবিক গতি মন্থর হয়ে পড়ে।আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি দেশ ইয়েমেন। দেশের নাম: ইয়েমেন মহাদেশ: আফ্রিকা সরকারী নাম: রিপাবলিক অফ ইয়েমেন রাজধানী: সানা রাষ্ট্র ভাষা: আরবী জায়গার পরিমান: ৫,৫৫,০০০ বর্গকিলোমিটার স্বাধীনতা দিবস: ২২ মে ১৯৯০

সুউচ্চ পর্বতমালা ইয়েমেনের উপকূলীয় সমভূমিকে অভ্যন্তরের জনবিরল মরুভূমি থেকে পৃথক করেছে। দেশটির প্রায় অর্ধেকের বেশী মানববসতির অনুপযোগী। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে অনেকগুলো সমৃদ্ধ সভ্যতার অবস্থান ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এলাকাটির গুরুত্ব হ্রাস পায় এবং প্রায় এক হাজার বছরের বেশী সময় এটি একটি দরিদ্র দেশে পরিণত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে এখানে খনিজ তেল আবিষ্কার হলে, ইয়েমেনের অর্থনৈতিক উন্নতি ও জনগণের জীবনের মান উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

১৯৯০ সালে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র (উত্তর ইয়েমেন) এবং গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন (দক্ষিণ ইয়েমেন) দেশ দুইটিকে একত্রিত করে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়। ইয়েমেনের পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। এটি আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বাব এল মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বে সৌদি আরব এবং পূর্বে ওমান অবস্থিত। সৌদি আরব ও ওমানই ইয়েমেনের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ইয়েমেন একটি মুসলিম রাষ্ট্র। প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ইয়েমেনের বেশীরভাগ অধিবাসী সুন্নী ও শিয়া মুসলিম। 

ইয়েমেনে প্রায় দুই লক্ষ হিন্দু ধর্মানুসারী বসবাস করে। স্বাভাবিকভাবেই এদের বেশীরভাগই ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দু। প্রাচীনকাল থেকেই ইয়েমেনের সাথে ভারতবর্ষের সংযোগ ছিল। তবে ১৮৩৯ সালে ইয়েমেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলে এই সংযোগ আরো গভীর হয়। কেননা তখন ইয়েমেনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বোম্বে প্রেসিডেন্সী থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তখন ইয়েমেনের এডেনে ২০০০ সদস্য বিশিষ্ট ভারতীয় সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলা হয়। এছাড়া ভারতের মুদ্রাকে ইয়েমেনের অফিসিয়াল কারেন্সী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৮৫৫ সালে এডেন বন্দরের সাথে বোম্বের একটি পাক্ষিক স্টিমার সার্ভিস চালু করা হয়। এর ফলে এই সুযোগে অনেক ভারতীয় হিন্দু ইয়েমেনে পাড়ি জমান। এডেনের ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ সিস্টেমকে উন্নত করা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ১৯০৬ সালে একদল ভারতীয় প্রকৌশলীকে ব্রিটিশ সরকার এডেনে নিয়ে যায়।  ১৮৩৯-১৯৩২ সাল পর্যন্ত ইয়েমেনকে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশরা শাসন করেছে। ফলে এই দীর্ঘ সময়ে ইয়েমেনের সাথে ভারতীয়দের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়েছিল।  

এই সময়কালে ইয়েমেনে বসবাসকারী ভারতীয়দের আর্থিক অবস্থারও বেশ উন্নতি হয়েছিল। ইয়েমেনের সরকারী নথি থেকে জানা যায়, ১৮৫৬ সালে ইয়েমেনে ৮৫৬৩ জন ভারতীয় হিন্দু ছিলেন, যা ১৯৫৫ সালে দাঁড়ায় ১৫৮১৭ জনে। বর্তমানে ইয়েমেনের এডেন, মুকাল্লা, শিহর, লাহাজ, মোকা এবং হোদেইদা শহরে সবচেয়ে বেশী হিন্দু বসবাস করে। এদের মধ্যে অনেকেই ইয়েমেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে এবং ইয়েমেনের স্থানীয় নাগরিকদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করছে।ইয়েমেনের এডেনে ৫টি হিন্দু মন্দির রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হিন্দু মন্দির হলো শ্রী তারিচমার্গ মন্দির, যা ১৮৬২ সালে নির্মিত হয়েছিল। আরো দুটি প্রাচীন মন্দির হলো শ্রী রামজি মন্দির এবং হনুমানজি মন্দির, যা যথাক্রমে ১৮৭৫ ও ১৮৮২ সালে নির্মিত হয়। অন্য মন্দিরগুলো হলো, শ্রী হিংরাজ মাতাজি মন্দির এবং শ্রী শঙ্কর হনুমান মন্দির। ইয়েমেনের স্থানীয় মুসলমান ও ভারতীয় হিন্দুরা পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। ফলে একে-অপরের সংস্কৃতি ও জীবনাচরণের এক ব্যতিক্রমী সংমিশ্রণ ঘটেছে ইয়েমেনে। পাবলিক বিদ্যালয়গুলো ইসলাম শিক্ষা দেয় তবে অন্যান্য ধর্মগুলো শিক্ষা দেয়া হয় না, যদিও মুসলিম নাগরিকদের এমন বেসরকারি স্কুলে থাকার অনুমতি দেওয়া হয় যেখানে ইসলাম শিক্ষা দেয় হয় না।

বিদ্যালয়গুলোতে মতাদর্শগত ও ধর্মীয় চরমপন্থাকে চাঙ্গা করার প্রচেষ্টার আশংকায় বেসরকারি ও জাতীয় বিদ্যালয়গুলোতে সরকারিভাবে অনুমোদিত পাঠ্যক্রমের বাইরে সরকার কোনও কোর্সকে অনুমতি দেয় না। কারণ সরকার উদ্বিগ্ন যে অনিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় স্কুল আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত চাহিদাগুলো থেকে বিচ্যুত এবং জঙ্গি মতাদর্শকে উৎসাহিত করে। তাই সরকার ৪,৫০০-এরও বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে এবং অধ্যয়নরত বিদেশী শিক্ষার্থীদেরকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ইয়েমেন একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গরিব দেশ। দেশটিতে ২০১১ সালে আরব বসন্ত বা গণজাগরণের পর থেকে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং প্রেসিডেন্ট সালেহের সংবিধান সংশোধন পরিকল্পনা এবং তার আজীবনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ বাতিলের প্রতিবাদে রাস্তায় প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এই সংকট শুরু হয়। অতঃপর, চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট সালেহ পদত্যাগ করেন এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বুহ মনসুর হাদির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

হাদি ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি একক প্রার্থীর নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু শিয়া মতাবলম্বী হুথি, আলকায়দা ও আল ইসলাহের মধ্যে সংঘাতের কারণে ক্ষমতার উত্তরণপ্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা সানা দখল করে এবং পরে তারা এক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে নিজেদেরকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার ঘোষণা দেয়। এরপর সৌদি আরব ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে কিন্তু তাতে গৃহযুদ্ধ থামেনি।