হিংলাজ শক্তিপীঠ | একান্ন সতীপীঠের এক সতীপীঠ হিংলাজ শক্তিপীঠ

হিংলাজ  শক্তিপীঠ |  একান্ন সতীপীঠের এক সতীপীঠ হিংলাজ  শক্তিপীঠ

সতীর ৫১ পীঠের পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দক্ষের যজ্ঞে মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুন্ডে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। তারপর সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডবলীলায় মাতেন স্বয়ং মহাদেব। মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে বিশ্ব সংসারকে রক্ষা করতে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেন শ্রীবিষ্ণু।

বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সতীর দেহ খন্ডগুলি। পৃথিবীর বুকে পড়া মাত্রই প্রস্তরখন্ডে পরিণত হয় সতীর দেহের খন্ডগুলি। সেই বিশেষ বিশেষ স্থানগুলি পরিণত হয় এক একটি সতীপীঠে। সতীর ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম হল সতীপীঠ হিংলাজ। করাচি থেকে ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বালুচিস্তান প্রদেশের মাকরান মরুভূমির উপর অবস্থিত হিংলাজ মন্দিরটি।

এই মন্দিরে কোনও মূর্তি পুজা হয় না। হিঙ্গলাজ দেবী হিসেবে একটি পাথরের পুজো করা হয়। এখানে সতীর মাথা পড়েছিল বলে হিন্দুধর্মের প্রচলিত বিশ্বাস। শুধু হিন্দুরা নন, এই মন্দিরে নিয়মিত আরাধনা করেন মুসলিমরাও। মুসলিমদের কাছে এটি পরিচিত 'নানি' অথবা 'বিবি নানি'র মন্দির হিসেবে। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে চার দিনের জন্য হিঙ্গলাজে তীর্থযাত্রার আয়োজন করা হয়। শুধু হিন্দুরা নন, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষজন সেই সময় হিঙ্গলাজ দেবীর দর্শনে যান।

 

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায়, এখানে সতীর মস্তকের ব্রহ্মরন্ধ পড়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী কোট্টরা বা হিংলাজ নামে পূজিতা হন। অন্যদিকে, মুসলিমদের কাছে তিনিই আবার পরিচিত হন "নানী বিবি" নামে। দেবীর ভৈরব হলেন ভীমলোচন। জানা যায়, হিন্দুদের কাছে যা হিংলাজ তীর্থ ,তাই আবার মুসলিমদের কাছে "নানী কি হজ" নামে বিখ্যাত।

দেহের প্রথম অংশ হল মস্তক। আর এই সতীপীঠে দেবীর মস্তকের ব্রহ্মরন্ধ পড়েছিল বলে, বলা হয় হিংলাজই সর্বশ্ৰেষ্ঠ ও সর্বপ্রথম সতীপীঠ। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত পাকিস্তানের এই অঞ্চল বেলুচিস্তানের সঙ্গে মিলিত রয়েছে ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত।এরই মধ্যে মাকরান মরুভূমির মধ্যে রয়েছে চারহাজার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট হিংলাজ পর্বত। মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে হিঙ্গুলা নদী। এই নদীর পাশে হিঙ্গল অভয়ারণ্যের মধ্যেই গুহার ভিতর অবস্থিত দুর্গম এই সতীপীঠ হিংলাজ।

জানা যায়, হিংলাজের মন্দিরটি যে গুহার মধ্যে অবস্থিত, সেটি আসলে একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের অগ্নিকুণ্ড। অগ্নিজ্যোতিকেই হিংলাজদেবীর রূপ বলে মানা হয়। গুহার সামনে রয়েছে গোলাকৃতি বেদির উপর কাপড় জড়ানো সিঁদুর মাখানো দুটি শিলামূর্তি। পুরোহিতদের মতে এই দুটি শিলামূর্তি হল হিংলাজ মা ও তার মেয়ে।

এর পাশের সুড়ঙ্গ দিয়েই রয়েছে গুহায় ঢোকার দরজা। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভারতীয়দের ভিসা পেতে সমস্যা হওয়ার কারনে হিংলাজ পৌঁছানো যেমন কঠিন তেমনই আগেকার দিনেও এই যাত্রা অত্যন্ত কঠিন ছিল বলে জানা যায়। প্রায় একমাস সময় ধরে শুকনো মরু পেরিয়ে তবেই পৌঁছানো যেত সতীপীঠ হিংলাজে।

জানা যায়, নাগনাথের আখড়া থেকেই উঠের পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু হত হিংলাজের উদ্দ্যেশে। এরপর করাচিতে হাব নদীর কাছে পৌঁছে গেরুয়া রঙের কাপড় হাতে বেঁধে সন্ন্যাস নেওয়া ও একে অপরকে জল না দেওয়ার শপথ সহ বেশ কিছু শপথ গ্রহণ করতে হত তীর্থযাত্রীদের। এরপর, চন্দ্রকূপ উষ্ণকুন্ডের সামনে নিজেদের পাপ স্বীকার করে অনুমতি নিয়ে তারপরই হিংলাজ মায়ের উদ্দ্যেশে রওনা হত সবাই।

অবশেষে, পথে অঘোর নদী পার করে "মোহন্ত মহারাজের" পুজো করে দেবী হিংলাজের কাছে পৌঁছতেন তীর্থযাত্রীরা। মহাভারতেও হিঙ্গলাজ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। সিন্ধ প্রদেশের রাজা জয়দ্রথ হিঙ্গলাজ মন্দিরের আশেপাশে অনেক মন্দির স্থাপন করেছিলেন। এই মন্দিরে প্রতি বছর এপ্রিল মাসে চার দিনের জন্য যে তীর্থযাত্রা হয়, তাতে অংশ নেন মুসলিমরাও। একে তাঁরা বলেন 'নানি কি হজ'।