পলাশী | ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক Plassey

পলাশী  | ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক Plassey

নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত একটি গ্রাম (অধুনা সেন্সাস টাউন) পলাশী Plassey। কলকাতা থেকে ১৭২ কিলোমিটার দূরে পলাশী Plassey। বহরমপুরগামী এক্সপ্রেস বাসে করে মীরা পলাশী স্টপেজ। সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত টোটো গাড়িতে চেপে সোজা পলাশী যাওয়া যায় । টোটোটি বাঁ দিকের পথ ধরে চলে গেল ভাগীরথীর তীরে রামনগর নদীঘাট । শিয়ালদহ - লালগোলা লাইনে পলাশী নদীয়া জেলার শেষ স্টেশন।

কলকাতা হতে একাধিক লালগোলা প্যাসেঞ্জার, ভাগিরথী এক্সপ্রেস বা হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস/ধনধান্য এক্সপ্রেস পলাশীর ওপর দিয়ে যায়। ৩৪ নং জাতীয় সড়ক পলাশীর প্রধান রাস্তা। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের সংযোগকারী এই মূল সড়কপথ ধরেও পলাশী আসা যায়। পলাশীর ভৌগোলিক অবস্থান ২৩.৮০° উত্তর ৮৮.২৫° পূর্ব। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই অঞ্চলের উচ্চতা ১৭ মি (৫৬ ফু)। ভাগীরথী নদীর অপর প্রান্তে মুর্শিদাবাদ জেলার বাজারসাউ গ্রামটি অবস্থিত। তার ১১ কি.মি. দূরে রয়েছে বড় চাঁদ ঘর ঠাকুর পাড়া গ্রাম। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন Plassey পলাশীর আমবাগানে মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ Plassey পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে ইংরেজরা আস্তে আস্তে সারা ভারতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।

Plassey পলাশীর যুদ্ধই পলাশী গ্রামকে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ইংরেজ রাজত্বে পলাশী বাংলা প্রদেশের (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের) নদিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। যুদ্ধের স্মৃতিতে পলাশীতে একটি স্তম্ভ প্রোথিত করা হয় যা পলাশী মনুমেন্ট নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কিছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলী, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ও পলাশীতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তারা কেউ ইংরেজদের পথ রোধ করে নি। ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বুঝতে পারেন, তার সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল।

বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সিরাজ মীর জাফরকে বন্দি করার চিন্তা পরিত্যাগ করেন। তিনি মীর জাফরকে ক্ষমা করে তাকে শপথ নিতে বলেন। মীর জাফর পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে অঙ্গীকার করেন যে, তিনি শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না। গৃহবিবাদের মীমাংসা করে নবাব রায় দুর্লভ, ইয়ার লুৎফ খান, মীর জাফর, মীর মদন, মোহন লাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁকে সৈন্য চালানোর দায়িত্ব দিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেন। ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আমবাগানে ব্রিটিশ সৈন্য, নিচে বাঙালি সৈন্যদের গুলি করছে ২৩ জুন সকাল থেকেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। ১৭৫৭ সালের ২২ জুন মধ্যরাতে রবার্ট ক্লাইভ কলকাতা থেকে তার বাহিনী নিয়ে পলাশী মৌজার লক্ষবাগ নামে আম্রকাননে এসে তাঁবু গাড়েন। বাগানটির উত্তর-পশ্চিম দিকে গঙ্গা নদী। এর উত্তর-পূর্ব দিকে দুই বর্গমাইলব্যাপী আম্রকানন।

বেলা আটটার সময় হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লুৎফ খান ও রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মীর মদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীর মদন এবং অপর সেনাপতি মোহন লাল ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন।

কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মীর মদন মারাত্মকভাবে আহত হন ও মারা যান। নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খান প্রমুখ গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধানও একইসাথে মৃত্যুবরণ করেন। মীরমদন, নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খানের স্মারকস্তম্ভ,পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান নিহত হওয়ার পর সিরাজউদ্দৌলা মীর জাফর ও রায় দুর্লভকে তাদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তীব্র বেগে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। কিন্তু উভয় সেনাপতি তার নির্দেশ অমান্য করেন। তাদের যুক্তি ছিল গোলন্দাজ বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া অগ্রসর হওয়া আত্মঘাতী ব্যাপার। কিন্তু কোম্পানি ও নবাবের বাহিনীর মধ্যে তখন দূরত্ব মাত্র কয়েকশত গজ। বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহন লাল নবাবকে পরামর্শ দেন যুদ্ধবিরতি ঘটলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী কিন্তু সিরাজ মীর জাফর প্রমুখের পরামর্শে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন।

বিকেল পাঁচটায় সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী নির্দেশনার অভাবে এবং ইংরেজ বাহিনীর গোলন্দাজি অগ্রসরতার মুখে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে অর্থাৎ পরাজয় স্বীকার করে। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে ৭ জন ইউরোপীয় এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য ২,০০০ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাকে সাহায্য করেনি। সিরাজউদ্দৌলা তার সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ও ভৃত্য গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে পদ্মা ও মহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা করেন।

তার আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সেনাপতি মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রাজা রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তার সে আশা পূর্ণ হয়নি। সিরাজ পথিমধ্যে বন্দি হন ও মিরনের হাতে বন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।সেদিনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই । রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন ছবিতে প্রদশি’ত এই স্মৃতিস্তম্ভ । পলাশী যুদ্ধের স্মৃতিবাহী মনুমেন্ট। ১৫ মিটার উঁচু স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেখা: ‘ব্যাটল ফিল্ড অব পলাশী, জুন ২৩, ১৭৫৭’। এ স্তম্ভ ইংরেজরা তৈরি করেছে পলাশীর যুদ্ধের বিজয়ের স্মারক হিসেবে । এটি এখন দেশবাসীর কাছে ‘বিশ্বাসঘাতকতার স্তম্ভ’।

পলাশী যুদ্ধের ২৫০ বছর পূর্তিতে এই স্মৃতিস্তম্ভের পাশে ছোট্ট আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয় । তাতে লেখা: ‘পরদেশগ্রাসীদের বিজয়স্তম্ভ নয়; সিরাজ, মীর মদন, মোহনলালের নাম হোক অক্ষয় ।’ এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান পিপলস ফোরাম । একটু দূরে স্মৃতিস্তম্ভে ঢোকার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে আছে নবাব সিরাজের আবক্ষ মূর্তি । এই মূর্তির নিচে লেখা ‘বিদেশী বেনিয়া বশ্যতা বিরোধী জোহাদি নায়ক সিরাজদৌল্লা’ । মনুমেন্টটির চারদিকে অযত্নের ছাপ। চারদিকে জঙ্গল জন্মেছে । পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে এই স্মৃতিস্তম্ভ । স্মৃতিস্তম্ভের কাছের চায়ের দোকানদার অশোক বাজোয়াল বললেন, এই জায়গায় একসময় প্রচুর আমগাছ ছিল ।

রানি ভবানীর আমবাগান ছিল এটি । এখন রাস্তা হয়েছে । একটু দূরে চিনিকল হয়েছে ।ওই যুদ্ধে ইংরেজ সেনাদের মোকাবিলা করার জন্য কামানের গোলায় আগুন দিতে গিয়ে কামান ফেটে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন নবাব সিরাজের সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান মীর মদন । স্মৃতিস্তম্ভের পেছনের পথ ধরে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে গেলে মীর মদনের সমাধিস্থল । চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হলেও সমাধি ঢেকে আছে জঙ্গলে । এখানে সমাধিস্থ করা হয় নবাবের আরও দুই বীর কমান্ডার বাহাদুর আলী খান এবং ক্যাপ্টেন নৌয়ে সিং হাজরাকে । বন্দুকধারী ইউনিটের অধিনায়ক ছিলেন বাহাদুর আলী খান। আর গোলন্দাজ বাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন নৌয়ে সিং হাজরা । যুদ্ধের পরপরই এখানে গোপনে তাঁদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল । সমাধিস্থলে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই । পাটখেতের আল ধরে যেতে হয় । স্থানীয় চাষি বিশ্বনাথ মণ্ডল বললেন, পলাশী স্মৃতিস্তম্ভ থেকে এই এক কিলোমিটার কাঁচা পথকে পাকা করে রাস্তার দুই ধারে আলো দিলে পর্যটকেরা এখানে সহজভাবে আসতে পারতেন । কারণ, বর্ষাকালে জমির আলে কাদা জমে যায় । হাঁটা দুষ্কর হয়ে পড়ে ।