কোলকাতার জাগ্রত কালীবাড়ির অজানা কাহিনীর শেষ পর্ব

কোলকাতার জাগ্রত কালীবাড়ির অজানা কাহিনীর শেষ পর্ব

আজবাংলা  আমরা কালী মায়ের মন্দির বলতেই বুঝি সেই দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মা নাহলে তারাপীঠের তারা মা। কিন্তু আমাদের কলকাতা শহরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক কালী মায়ের মন্দির।এই মন্দিরগুলির মধ্যে বেশির ভাগ মন্দিরগুলি অনেক পুরনো এবং সেই সঙ্গে ভীষণ জাগ্রত। আসুন জেনে নিন তেমনই কিছু মায়ের মন্দিরের সন্ধান ও সেইসঙ্গে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে ঘটনা।

জয় মিত্র কালীবাড়ি, শোভাবাজার- ১৮৫০ সালে শোভাবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা জয়নারায়ণ মিত্র বরাহনগর-মালপাড়ার কুঠিঘাট অঞ্চলে বারোটি আটচালা শিবমন্দির-সহ কৃপাময়ী কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।মন্দিরটি নবরত্ন শৈলীর হলেও প্রথাগত নবরত্ন শৈলীর থেকে কিছুটা আলাদা। বাঁকানো চালের পরিবর্তে দেখা যায় দোতলা দালান মন্দিরের কোণে কোণে চূড়া রয়েছে। শোনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীকে ‘মা’ বলে আর ‘কৃপাময়ী’ ও ‘ব্রহ্মময়ীকে’ মাসি বলে ডাকতেন।

সিদ্ধেশ্বরী কালী, বেহালা-  বেহালা ট্রাম ডিপোর কাছে ডায়মন্ড হারবার রোডের উপরেই সিদ্ধেশ্বরী মা কালীর মন্দির। ১১৭০ বঙ্গাব্দের ১২ জৈষ্ঠ্য ফলহারিণী কালীপুজোর দিন মন্দির স্থাপিত হয়। দেবী মাটির তৈরি।মাথায় রুপোর মুকুট। জিভটি সোনার। গলায় রুপোর মুণ্ডমালা। হাতে সোনার বালা। বিশেষ পুজোর দিনে মায়ের নিচের ডান হাতে রাখা হয় পানপাত্র, তাতে থাকে কারণবারি। এই মন্দিরে মহা ধুমধামের সঙ্গে হয় দীপান্বিতা কালীপুজো।

ওইদিন মাকে দেওয়া হয় খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, লাবড়া, আলুর দম, নানা সবজির তরকারি, চাটনি, পায়েস। এছাড়াও মায়ের ভোগে থাকে রুই, কাতলা, ভেটকি, বাটামাছ ও পাঁঠার মাংস। কালীপুজোর দিন সারা রাত মন্দির খোলা থাকে। ভক্তরা দেখেন মায়ের পুজো।সকাল থেকে ভক্তরা আসেন মায়ের পুজো দিতে। প্রতি বছর কালীপুজোর আগে মায়ের অঙ্গরাগ হয়। এই মন্দিরে দীপান্বিতা কালীপুজো ছাড়াও ফলহারিণী কালীপুজো এবং রটন্তী কালীপুজোও মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়।আগে পুজোর সময় বলি হত। এখন তা বন্ধ। তবে কোনও ভক্ত প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এলে বলি হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মায়ের যখন আরতি হয়,  ভক্ত থেকে শুরু করে পথচলতি সব মানুষ মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে যান। আরতি দেখতে দেখতে মায়ের কাছে মনোবাসনাও জানিয়ে ফেলেন।

দয়াময়ী কালী, কলেজ স্কয়ার-   ১৭৭১ সালে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে গুরুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় কলেজ স্কোয়্যারের কাছে রাধানাথ মল্লিক লেনে দালান রীতির এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেবীর বিগ্রহটি কষ্টিপাথরের তৈরি। প্রায় দু’ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তি কাঠের সিংহাসনের উপর অধিষ্ঠিত। দীপান্বিতা কালীপুজোয় আজও অসংখ্য ভক্তসমাগম হয়।

পুঁটে কালী, কালীকৃষ্ণ টেগোর স্ট্রিট- এখানে পুজো হয় তন্ত্র মতে। পুজোয় ভোগে থাকে খিচুড়ি, লুচি, পোলাও, নানা ধরনের তরকারি, পাঁচ রকমের মাছ, চাটনি, পায়েস। এ ছাড়াও থাকে খাস্তা কচুরি আর চানাচুর। কালীপুজোর পরের দিন হয় কুমারী পুজো ও অন্নকূট উৎসব। 

নিস্তারিনী কালী, বেথুন রোড-  নানেদের কালীমন্দির বলে পরিচিত হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে একটি কাহিনি।সিমলা অঞ্চলে অবস্থাপন্ন ব্যক্তি কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী বিগ্রহের আদলে বারাণসী থেকে নিস্তারিণীর বিগ্রহ তৈরি করিয়ে আনলেও নানা কারণে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় তাঁর প্রতিবেশী ঈশ্বরচন্দ্র নানের কাছে বিগ্রহটি হস্তান্তর করেছিলেন। পরে ঈশ্বরচন্দ্র নবরত্ন মন্দির তৈরি করে ১৮৬৫ সালে রথযাত্রার দিনে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজও প্রতি বছর সাড়ম্বরে এই মন্দিরে কালীপুজো হয়।