হাঙ্গেরি| মধ্য ইউরোপের একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হাঙ্গেরি

হাঙ্গেরি| মধ্য ইউরোপের একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হাঙ্গেরি

মধ্য ইউরোপের একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হাঙ্গেরি।  হাঙ্গেরি কিছুটা ডিম্বাকৃতির। দেশটি পূর্ব-পশ্চিমে সর্বাধিক প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এবং উত্তর দক্ষিণে সর্বাধিক প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত। হাঙ্গেরির উত্তরে স্লোভাকিয়া, উত্তর-পূর্বে ইউক্রেন, পূর্বে রোমানিয়া, দক্ষিণে সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া, এবং পশ্চিমে অস্ট্রিয়া। হাঙ্গেরির ভূমির মোট আয়তন ৯৩,০৩০ বর্গকিলোমিটার। হাঙ্গেরি মধ্য ইউরোপের দেশ। এটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এদেশের সিংহভাগ অঞ্চল দানিউব উপত্যকা তথা হাঙ্গেরীয় সমভূমিতে অবস্থিত।

এই সমতলভূমির ভেতর দিয়েই মূলত দানিউব নদী প্রবাহিত হয়েছে। হাঙ্গেরির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর বুদাপেস্ট। শহরটি পূর্ব মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। হাঙ্গেরির জনগণ নিজেদেরকে "মজর" নামে ডাকে। মজরেরা ছিল এশিয়া থেকে আগত যাযাবর গোষ্ঠী। ৯ম শতাব্দীর শেষভাগে আরপাদের নেতৃত্বে মজরেরা দানিউব ও তিসজা নদীর মধ্যবর্তী সমভূমি জয় করে, যা বর্তমান হাঙ্গেরীয় সমভূমির মধ্যভাগ।

১১শ শতকের শুরুর দিকেই মজরেরা রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হয় এবং খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। হাঙ্গেরির প্রথম রাজা ছিলেন প্রথম স্টিফেন (১০০০ খ্রিস্টাব্দ)। ১০৮৩ সালে তাঁকে সাধু ঘোষণা করা হয়। দেশটিতে ৬৫ লাখ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। কৃষিপণ্যের মধ্যে আছে - গম, রাই, বার্লি, ভুট্টা, আলু, সূর্যমুখি বীজ প্রভৃতি। দেশটির ১৬লাখ ৭০ হাজার হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে সবুজ বনভূমি।  সমভূমিগুলিকে পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বে দিকে পর্বতের সারি ঘিরে রেখেছে।

উত্তর সীমান্তের উচ্চভূমিগুলি Esztergom-এ দানিউব নদীর গিরিখাত থেকে পূর্বে বিস্তৃত হয়েছে এবং মাত্রা পর্বতমালা গঠন করেছে, যা কার্পেথীয় পর্বতমালার একটি অংশ। দানিউবের পশ্চিমের অঞ্চলটি আন্তঃদানিউবিয়া নামে পরিচিত। এখানে উত্তর-পশ্চিমের ক্ষুদ্র সমভূমি ছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায়। দক্ষিণে রয়েছে Mecsek পর্বতমালা, উত্তরে অরণ্যাবৃত বাকোনি পর্বতমালা, যার কাছেই রয়েছে বালাতন হ্রদ।

 হাঙ্গেরি মোটামুটি সমৃদ্ধ দেশ। শিল্পসমূহের মধ্যে আছে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প, সিমেন্ট কারখানা, সার কারখানা, চিনি শিল্প, রাসানিক শিল্প, চামড়া শিল্প প্রভৃতি। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল। হাঙ্গেরিতে তেল ও গ্যাস ছাড়া অন্যান্য খনিজ দব্যের মধ্য আছে কয়লা, লিগনাইট, বক্সাইট প্রভৃতি।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে ট্রিয়ানন চুক্তির আওতায় হাঙ্গেরির বর্তমান সীমান্ত নির্ধারিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দেশটির ৭১ শতাংশ ভূখণ্ড হাতছাড়া হয়ে যায়, নিহত হয় প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। লোকসংগীত ও ক্লাসিক্যাল সংগীতের তীর্থভূমি হাঙ্গেরি। জিডিপি অনুসারে হাঙ্গেরির অবস্থান ১৮৮টি দেশের মধ্যে ৫৭তম। দেশটি বিশ্বের ৩৬তম বৃহৎ পণ্য রপ্তানিকারী রাষ্ট্র। আয় ও জীবনযাপন ব্যয় দুই-ই বেশি। তবে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বপর্যায়ের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া অবৈতনিক। জীবনযাপন মানের দিক থেকে দেশটির অবস্থান ২৫তম। সামাজিক প্রকল্প সূচকে ৩২তম এবং নিরাপত্তার দিক থেকে বিশ্বে ১৯তম।

সেন্ট্রেনড্রে হচ্ছে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট এবং পিলিস-ভিশেগ্রিড পর্বতমালার মাঝামাঝি পেস্ট কাউন্টির একটি নদীতীরে অবস্থিত। এই শহরটির নানা চত্বরে অনেকগুলো বেশ পুরোনো জাদুঘর রয়েছে। বলা হয়ে থাকে শহরটি ওপেন-এয়ার এথনোগ্রাফিক জাদুঘর এবং শিল্পী ও মানুষের ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন ধরনের গ্যালারির জন্য বেশ পরিচিত। সেন্ট্রেনড্রের ছোট শহরের আয়তন প্রায় ৪৪ বর্গকিলোমিটার বা প্রায় ১৭ বর্গমাইল। এই নির্দিষ্ট আয়নের শহরে মোটা জনসংখ্যা প্রায় ২৬ হাজারের ওপরে।

মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯২ ভাগ হচ্ছে হাঙ্গেরীয়। সেই সাথে জার্মান, স্লোভাক, রোমান এবং সার্বিয়ার জনগোষ্ঠী রয়েছে। একই সাথে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ হচ্ছেন রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী। পাশাপাশি এই শহরে ক্যালভিনিস্ট, লুথারিয়ান এবং গ্রিক ক্যাথলিকসহ অন্যান্য ধর্মের লোকজন বসবাস করেন। এই শহরকে এক কথায় জাদুঘর এবং গ্যালারির শহর বললে ভুল হয় না। ছোট আয়নের এই শহরে ১০টি জাদুঘর রয়েছে। মোট গ্যালারী আছে ৬টি। জাদুঘর এবং গ্যালারিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির অবদান হিসেবে এই শহর জন্ম নিয়েছে হাঙ্গেরির কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি।

তাদের মধ্যে আছেন হাঙ্গেরি ছাড়াও সার্বিয়ার ঔপন্যাসিক এবং কবি, ভাস্কর ও চিত্রশিলী। রেল থেকে নেমে পায়ে হাঁটার পথে সেন্ট্রেনড্রে পৌছানো যায়। এই শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করলে বেশ সাজানো বাড়িঘর দেখতে পাবেন। কয়েকশ বছরের পুরোনো বাড়িঘরের আশপাশ বেশ পরিষ্কার-পরিছন্ন। সেই সব বাড়িঘরের কোনটা যে জাদুঘর আর কোনটা যে মানুষের বসত বাড়ি, নামফলক না দেখলে বুঝে ওঠা কঠিন।

একনজরে

পুরো নাম : হাঙ্গেরি।

রাজধানী ও সর্ববৃহৎ শহর : বুদাপেস্ট।

সরকারি ভাষা : হাঙ্গেরীয়।

জাতিগোষ্ঠী : হাঙ্গেরীয় (৮৩.৭%), রোমা (৩.১%), জার্মান (১.৩%)।

প্রেসিডেন্ট : জানোস এডাব।

প্রধানমন্ত্রী : ভিক্টর অরবান।

আইনসভা : জাতীয় পরিষদ।

আয়তন : ৯৩ হাজার ৩০ বর্গকিলোমিটার।

জনসংখ্যা : ৯৮ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭১।

ঘনত্ব : প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০৫.৯ জন।

গড় আয়ু : ৭১ (পুরুষ), ৭৮ (নারী)।

জিডিপি : মোট ২৬৫.০৩৭ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু ২৬ হাজার ৯৪১ ডলার।

মুদ্রা : ফোরিন্ত।

জাতিসংঘে যোগদান : ১৪ ডিসেম্বর ১৯৫৫।