পুজোয় ভ্রমণ করতে চাইলে আদর্শ জায়গা জোশীমঠ

পুজোয় ভ্রমণ করতে  চাইলে আদর্শ জায়গা জোশীমঠ

পুজোর ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানে সাহায্য করতে আজবাংলা আপনাদের জন্য সাজিয়ে দিচ্ছে ভ্রমণ-ছক। ভারতের নানা প্রান্তে শৈলশহরও তো আর কম নেই। পশ্চিমঘাট, সহ্যাদ্রীতে তো প্রায়শই চলে যাই। তবে আমার পছন্দ হিমালয়। এ বার যেমন গাড়োয়াল উত্তরাখণ্ডের যাওয়ার জন্য  ট্রেনে বা বিমানে যেতে চান, আগে টিকিট কাটুন উত্তরাখণ্ডের জোশীমঠ । গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার এক পবিত্র শহর জোশীমঠ। পাহাড়ি এই শহরটি সাগরপৃষ্ঠ থেকে ৬১৫০ ফুট উচ্চতায়।

আগে অঞ্চলটির নাম ছিল জ্যোতির্মঠ। পরে লোকমুখে হয়ে যায় জোশীমঠ। জ্যোতির্মঠ হল ‘উত্তরামণ্য মঠ’ বা বলা যেতে পারে উত্তরের মঠ। আদি শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত চার মঠের মধ্যে অন্যতম। আদি শঙ্করাচার্য ভারতে মোট চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অন্য প্রসিদ্ধ তিনটি মঠ হল পুরী, দ্বারকা ও শ্রীনগিরি। আদি শঙ্করাচার্যর সনাতন নীতি মতে জ্যোতির্মঠ হল বেদের ‘অথর্ববেদ’। কথিত আছে আদি গুরু শঙ্করাচার্য উত্তরাখণ্ড যাত্রাকালে প্রথম পৌঁছন জোশীমঠ। আজ শঙ্করাচার্যের আশ্রমের নামও হয়েছে জ্যোতির্মঠ।

এখানেই শঙ্করাচার্য ব্যাসমুণির বেদান্ত দর্শনের ওপর ভাষ্য দেন। এখান থেকেই শঙ্করাচার্য বদ্রীনারায়ণ ধাম দর্শনের জন্য রওনা হন। সেখানে পৌঁছে বদ্রীনারায়ণ শিলার ওপর মূর্তি এবং মন্দির স্থাপন করেন। অলকানন্দা ও ধৌলিগঙ্গার অপরূপ মিলিত রূপ প্রকাশ পেয়েছে জোশীমঠের পাদদেশে বিষ্ণুপ্রয়াগে। অপাপবিদ্ধা প্রকৃতির রংমহলে সে এক মুগ্ধ দৃশ্যময়তা রচনা করেছে। চার পাশে হিমালয়ের উদাত্ত প্রকৃতি। সুউচ্চ গিরিশোভিত দৃশ্যপট আর নদীসঙ্গমের স্বপ্নবিধৃত নীল পরিবহ। অপার মুগ্ধতায় চেয়ে থাকি হিমালয়ের ওই নদী-জোড়ার মিলনদৃশ্যের দিকে।  হরিদ্বার  থেকে গাড়িতে জোশীমঠ প্রায় ঘণ্টা পাঁচেকের পথ। দূরত্ব জাতীয় সড়ক-৫৮ ধরে প্রায় ২৭৬ কিমি।

হরিদ্বার-হৃষিকেশ-দেবপ্রয়াগ-শ্রীনগর-রুদ্রপ্রয়াগ-কর্ণপ্রয়াগ-চামোলি-গোপেশ্বর হয়ে জোশীমঠ। সমস্ত যাত্রাতেই পথশোভা যে অপূর্ব, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় আলোচনায় তছনছ হয়ে যায় আবেগ জড়ানো ভ্রমণরসিক ভাবুক মন।  জোশীমঠ ব্যস্ত পাহাড়ি শহর। খুবই প্রাচীন শহর। কার্তিকেয় পুরাণেও জোশীমঠের উল্লেখ পাওয়া যায়। পার্বতীপুত্র কার্তিকের নামে এই শৈল শহরটির নাম ছিল কার্তিকেয়পুরা। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষ ‘কল্পবৃক্ষ’ গাছটিরও সন্ধান পাওয়া যায় এই জোশীমঠেই। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে ১২০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই কল্পবৃক্ষ গাছটি। স্থানীয়রা হিন্দিতে কথা বললেও এদের উচ্চারণে গাড়োয়ালি টান রয়েছে।

প্রচুর হোটেল, রিসর্ট, রেস্তোরাঁ, দোকানপাঠ, মন্দির, গ্যারেজ, যানবাহন নিয়ে জমজমাট জোশীমঠ। এখান থেকেই বদ্রীনাথধাম এবং গুরুগোবিন্দ ঘাটের ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার সড়কপথ। পাহাড় সংলগ্ন হোটেলগুলির অবস্থানও বেশ সুন্দর। প্রায় প্রতিটি হোটেলের ঘরের জানালা বা বারান্দা থেকেই গাড়োয়াল হিমালয়ের পাহাড়চুড়ো দৃশ্যমান। জোশীমঠে প্রচুর দেবদেবীর মন্দির। হনুমান, গৌরীশঙ্কর, গণেশ, সূর্য, নৌদেবীর মন্দির রয়েছে। অষ্টম শতকে নির্মিত আদি শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত মঠটি উত্তর ভারতের প্রসিদ্ধ মঠ।

এখানে বদ্রীনারায়ণ ও রাজেশ্বরী দেবীর মন্দিরও রয়েছে। অদূরে একটি পবিত্র গুহার সন্ধান পাওয়া যায়। কথিত আছে সেই গুহায় আদি শঙ্করাচার্য তপস্যা করতেন। ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার তথা নরসিংহরূপী নারায়ণমূর্তি সংবলিত উল্ল‌েখযোগ্য মন্দির নরসিমা মন্দির। শতাব্দীপ্রাচীন মন্দির। এখানে নরসিমা ভগবানের মূর্তিটির দক্ষিণ হস্ত চুলের মতো সরু। জনশ্রুতি, এমন একটা সময় আসবে যখন সেটি ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যাবে—তখন বদ্রীনাথের কাছে জয়-বিজয় পর্বত দুটিও ধুলিসাৎ হবে।

এবং বদ্রীনাথধামের বদ্রীনারায়ণ মূর্তিটিও অদৃশ্য হয়ে যাবে বর্তমান মূল মন্দির থেকে। প্রবল তুষারপাত ও শৈত্যর দিনে যখন বদ্রীনারায়ণ মন্দির বন্ধ থাকে ছয় মাসের জন্য—সেই সময়টুকু এই নরসিমা মন্দিরেই ভগবান বদ্রীনারায়ণের পুজো অনুষ্ঠিত হয়। জোশীমঠকে সেই জন্য বদ্রীনারায়ণের ‘শীতকালীন প্রার্থনাস্থলও’ বলা হয়ে থাকে।  স্থানীয় পুরোহিত ও ধর্মগুরু সম্প্রদায় মনে করেন, ভবিষ্যতে যখন বদ্রীনারায়ণ মন্দিরটি থাকবে না, তখন জোশীমঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে কালো কষ্টিপাথরে নির্মিত শালগ্রাম শিলার আদলে ‘ভবিষ্য বদ্রী’ হিসেবে পুনর্প্রতিষ্ঠিত হবে। স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস, বর্তমান কেদারধামের মূর্তিও একদিন অনুরূপ ভাবেই অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং ‘ভবিষ্য কেদার মন্দির’ নামে এই স্থানে পুনর্জন্ম হবে ছোট এক শিবলিঙ্গ হিসাবে।