বাংলার অচিন্ত্যর হাত ধরে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সোনা

বাংলার অচিন্ত্যর হাত ধরে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সোনা

  কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয় বাংলার অচিন্ত্য শিউলির। এ বারের গেমসে তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি কমনওয়েলথে সোনা জিতলেন। ভারোত্তোলনে সোনা জিতলেন অচিন্ত্য। একাদশতম বাঙালি হিসাবে কমনওয়েলথে সোনা জিতলেন তিনি। গেমস রেকর্ডও গড়লেন অচিন্ত্য। কমনওয়েলথ গেমসে সোনার পদক জয়ের স্বপ্ন দেখাটা অনেকেই হয়ত বলবেন বামন হয়ে চাঁদ ধরার সামিল!

কিন্তু সেই অসাধ্য স্বপ্নকেই আজ হাতের মুঠোয় ধরে ফেলেছেন পাঁচলার দেউলপুরের বাসিন্দা অচিন্ত্য শিউলি। রবিবার মধ্যরাতে (ভারতীয় সময় অনুসারে) শিউলি পরিবারে তখন উৎসবের আমেজ। ঘরের ছেলে সোনা জিতেছে যে! আজ্ঞে হ্যাঁ, ২০ বছর বয়সি অচিন্ত্য শিউলি পুরুষদের ৭৩ কিলোগ্রাম ভারোত্তলন বিভাগে সোনার পদক জয় করলেন।

অচিন্ত্য স্ন্যাচ বিভাগে ১৪৩ কেজি ওজন তুলেছেন। পাশাপাশি ক্লিন অ্যান্ড জার্ক বিভাগে তিনি ১৭০ কিলোগ্রাম ওজন তুলে দেশের হয়ে এক নয়া ইতিহাস কায়েম করলেন। মোট ৩১৩ কেজি ওজন তোলার পাশাপাশি তিনি সোনার পদকও জয় করলেন।আজ হাওড়ার অচিন্ত্যকে চেনে গোটা দেশ। তবে সোনা জয় করলেও পুরস্কার গ্রহণ করতে এসে খানিকটা হতাশই দেখাল পাঁচলার এই ওয়েট লিফটারকে! কিন্তু কেন?

প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন, "এই লড়াইটা ছিল আমার নিজের সঙ্গে। সোনা জিততে আমি আসিনি। এসেছিলাম নিজের রেকর্ডটা টপকে যেতে। চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু, শেষপর্যন্ত সেটা আর করতে পারলাম না। তাই খানিকটা খারাপই লাগছে।" সেইসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেছেন, "বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে দাদাই আমার জন্য সবকিছু করেছে।

আর তাই এই পুরস্কার আমি আমার দাদা এবং কোচকে উৎসর্গ করতে চাই। দাদা নিজে ওয়েট লিফটিং করত। কিন্তু আমার দিকে তাকিয়ে ও ছেড়ে দিয়েছে।" ইতিপূর্বে অচিন্ত্যর দাদা অলোক শিউলি বলেছিলেন, "পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপের জন্য আমরা দুই ভাই পড়াশুনার পাশাপাশি জরির কাজ করতাম। ২০১০ সালে আমি অষ্টম দাসের কাছে ভারোত্তোলন প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করার পর ২০১১ সাল থেকে ভাইকে সেখানে নিয়ে যাই।

২০১৩ সালে আমরা দুইভাই একসঙ্গে ন্যাশানাল ভারোত্তলক প্রতিযোগিতায় অংশ নিই।" এই প্রসঙ্গে আপনাদের জানিয়ে রাখি, অচিন্ত্যর বাবা পেশায় একজন ভ্যান চালক ছিলেন। ৯ বছর আগেই তিনি প্রয়াত হন। তারপর সংসারে কার্যত নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সাংসারিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই চালিয়েছিলেন অচিন্ত্যর মা।

তিনি জরির কাজ করে কোনওক্রমে সংসার চালাতেন। জানা গিয়েছে, তাঁর সাপ্তাহিক আয় ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। সেই টাকাতেই চলত সংসার। যদিও অচিন্ত্য সময় পেলেই মা'কে জরির কাজে সাহায্য করতেন।  তবে ন্যাশনাল ওয়েট লিফটিং প্রতিযোগিতায় অচিন্ত্য চতুর্থ হওয়ার পরেই সেনাবাহিনীর নজরে পড়ে যান। পরে অল ইন্ডিয়া ট্রায়ালে অংশ নিয়ে সে সেখানে সুযোগ পান। পরে ২০১৪ সালে হরিয়ানায় ন্যাশানাল গেমসে তৃতীয় হয়ে সেনাবাহিনীর স্পোর্টস ইন্সটিটিউটে (Military Sports Institute) যোগ দেন।

পরে পাতিয়ালায় ভারতীয় শিবিরে ডাক পান অচিন্ত্য। বাংলা ও দেশের অন্যতম সেরা সেই ভারোত্তোলক অচিন্ত্যর সংগ্রামের জীবনে হঠাৎই আলো এসে পড়ে ২০২০ সালে। ২০২৪-এর প্যারিস অলিম্পিক্সের সম্ভাব্য পদকজয়ী হিসেবে টার্গেট অলিম্পিক্স পোডিয়ামে (টপ্‌স) তালিকায় নাম ওঠে তাঁর। সাই থেকে আসা সেই ই-মেল দেখে আপ্লুত আঠারো বছরের অচিন্ত্য বলেছিলেন, ‘‘এ বার আমার আর কোনও সমস্যা হবে না।

টাকা পাব। পুষ্টিকর খাবার কিনে খেতে পারব। তা ছাড়া সার্ভিসেসের চাকরিটাও পাচ্ছি। এ বারের অলিম্পিক্সে তো হল না। তাই আমার লক্ষ্য ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক্স পদক।’’ সেই লক্ষ্যে নামার আগে কমনওয়েলথ গেমসের পদক আত্মবিশ্বাস দেবে অচিন্ত্যকে।

 ইতিমধ্যেই অচিন্ত্য ২০১৫ সালে ভারতে যুব কমনওয়েলথ গেমসে রূপো, ২০১৭ সালে ইউথ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ানশিপে রূপো, ২০১৯ সালে জুনিয়র বিভাগে সোনার পদক, ২০২১ সালে ওয়ার্ল্ড জুনিয়র প্রতিযোগিতায় রূপো এবং জুনিয়র ও সিনিয়র বিভাগে জোড়া সোনার পদক জয় করেন তিনি।