ইন্দিরা গান্ধী | Indira Gandhi

ইন্দিরা গান্ধী  | Indira Gandhi

শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম  ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর এলাহাবাদে এক কাশ্মীরী পণ্ডিত পরিবারে। ইলাহাবাদের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল মোতিলাল নেহরুর আনন্দ ভবনে রাত্রি ৯টা ১৪ মিনিটে জন্মগ্রহণ করেন ইন্দিরা। পিতা পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর বয়স তখন ২৮ বছর, মাতা কমলা নেহরুর ১৮। নেহরু দম্পতির একমাত্র কন্যা ইন্দিরা। পিতামহ মোতিলাল তাঁর জননীর নামে পৌত্রীর নামকরণ করেন, ইন্দিরা। Indira Gandhi ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় অধিরাজ্য (ও পরে প্রজাতন্ত্রের) প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। Indira Gandhi ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন জওহরলালের একমাত্র সন্তান (ইন্দিরার একমাত্র ছোটো ভাই অত্যন্ত অল্প বয়সে মারা যায়)। এলাহাবাদের বৃহৎ পারিবারিক এস্টেট আনন্দ ভবনে মা কমলা নেহেরুর সঙ্গে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। তাঁর শৈশব ছিল একাকীত্বে ভরা ও নিরানন্দময়।

জওহরলাল রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিচালনায় বাইরে থাকতেন অথবা কারারুদ্ধ থাকতেন, অন্যদিকে কমলা নেহেরুও প্রায়শই অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় থাকতেন। পরবর্তীকালে তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রয়াত হন। পিতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রক্ষিত হত প্রধানত চিঠিপত্রের মাধ্যমেই। ইন্দিরা প্রধানত বাড়িতেই গৃহশিক্ষকদের নিকট শিক্ষালাভ করেছিলেন এবং ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বে মাঝে মাঝে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি পড়াশোনা করেন দিল্লির মডার্ন স্কুল, এলাহাবাদের সেন্ট সিসিলিয়া’জ ও সেন্ট মেরি’জ ক্রিস্টিয়ান কনভেন্ট স্কুল, জেনেভার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বেক্সের একোল নউভেল এবং অধুনা মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত পুণা ও বোম্বাইয়ের পিউপিল’স অন স্কুলে।

তিনি ও তাঁর মা কমলা নেহেরু কিছুকাল রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠে বাস করেন। সেখানে ইন্দিরার অভিভাবক ছিলেন স্বামী রঙ্গনাথানন্দ।এছাড়া তিনি কিছুকাল শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতেও পড়াশোনা করেছিলেন, যা ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় রবীন্দ্রনাথই তাঁর নাম ‘প্রিয়দর্শনী’ (সংস্কৃত ভাষায় যার অর্থ ‘যিনি দয়াপূর্ণ দৃষ্টিতে সব কিছু দেখেন’) রাখেন এবং ইন্দিরা পরিচিত হন ‘ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু’ নামে।

যদিও এক বছর পরেই ইন্দিরাকে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে ইউরোপে তাঁর মুমূর্ষু মায়ের পরিচর্যা করতে যেতে হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে ইন্দিরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন।মায়ের মৃত্যুর পর ইন্দিরা অল্পকাল ব্যাডমিন্টন স্কুলে পড়াশোনা করেন, তারপর ১৯৩৭ সালে ইতিহাস অধ্যয়নের জন্য সমারভিল কলেজে ভর্তি হন। ইন্দিরাকে দুই বার প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। কারণ প্রথম পরীক্ষায় লাতিনে তাঁর ফল খারাপ হয়েছিল।অক্সফোর্ডে তিনি ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে ফল ভালো করলেও আবশ্যিক বিষয় লাতিনে তাঁর গ্রেড কমই থাকে।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জীবনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতেন, যেমন তিনি অক্সফোর্ড মজলিস এশিয়ান সোসাইটির সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। ইউরোপে অবস্থানের সময় ইন্দিরার স্বাস্থ্যভঙ্গ হয়েছিল। সেই সময় তাঁকে ঘন ঘন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হত। স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য তাঁকে বারবার সুইজারল্যান্ড যেতে হয়। যার ফলে তাঁর পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। ১৯৪০ সালে জার্মানি যখন দ্রুত গতিতে ইউরোপ দখল করতে শুরু করে তখন ইন্দিরা সুইজারল্যান্ডেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি পর্তুগালের পথ ধরে ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করেন।

কিন্তু প্রায় দুই মাস আটকে থাকেন। অবশেষে ১৯৪১ সালের গোড়ার দিকে তিনি ইংল্যান্ডে প্রবেশ করতে সক্ষম হন এবং তারপর অক্সফোর্ডে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই ভারতে ফিরে আসেন।স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। শৈশবে তিনি ‘বাল চড়কা সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে, ১৯৩০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় কংগ্রেসকে সাহায্য করার জন্য ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘বানর সেনা’। তাঁকে কারাবন্দী করা হয় ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর নির্দেশে তিনি দিল্লির দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকাগুলিতে কাজ করেছিলেন। ব্রিটেনে থাকাকালীন ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর ভাবী স্বামী ফিরোজ গান্ধীর প্রায়শই দেখা হত। ফিরোজকে ইন্দিরা এলাহাবাদ থেকেই চিনতেন। সেই সময় ফিরোজ লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসে পাঠরত ছিলেন। এলাহাবাদে দুই জনে ব্রাহ্ম মতে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যদিও ফিরোজ ছিলেন গুজরাতের এক জরথুস্ট্রবাদী পার্সি পরিবারের সন্তান। ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে ইন্দিরা বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ২৬ মার্চ ।

ফিরোজ ও Indira Gandhi ইন্দিরা গান্ধীর দুই পুত্রের জন্ম হয়: রাজীব গান্ধী (জন্ম: ১৯৪৪) ও সঞ্জয় গান্ধী (জন্ম: ১৯৪৬)।  । ১৯৫৫ সালে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির জাতীয় সংহতি পরিষদের সভানেত্রীর পদও তিনি অলঙ্কৃত করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সংসদীয় পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত হন | ১৯৫৬ সালে তিনি নিযুক্ত হন সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী হিসেবে। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির মহিলা শাখার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।

পরে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী নির্বাচিত হন ১৯৫৯ সালে। পরবর্তী এক বছর তিনি ঐ পদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি আবার কংগ্রেস সভানেত্রী হন ১৯৭৮ সালে। ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে ইন্দিরা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। সেই সূত্রে ১৯৫৯ সালে কেরলের কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করায় তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এই সরকার ছিল ভারতের প্রথম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার। ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর প্রে তাঁকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয় এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ক্যাবিনেটে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচনে তিনি মোরারজী দেশাইকে পরাজিত করে প্রধানমন্ত্রী হন।কেন্দ্রীয় সরকারে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হিসেবে তিনি কাজ করেন ১৯৬৪-৬৬ পর্যন্ত। এরপর ১৯৬৬-র জানুয়ারি থেকে ১৯৭৭-এর মার্চ পর্যন্ত একটানা তিনি ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬৯-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদেশ মন্ত্রকের দায়িত্বও তিনি সামলেছিলেন। ১৯৬৭ -র সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৭-এর মার্চ পর্যন্ত তিনি পরমাণু শক্তি বিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রী পদেও কাজ করে গেছেন।

তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৭০-এর জুন থেকে ১৯৭৩-এর নভেম্বর পর্যন্ত। এছাড়া, মহাকাশ দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন ১৯৭২-এর জুন থেকে ১৯৭৭-এর মার্চ পর্যন্ত। ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তিনি যোজনা কমিশনের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও পালন করে এসেছেন। পরে, ১৯৮০ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর প্রথম এগারো বছরের শাসনকালে দেখা যায় কীভাবে তিনি কংগ্রেস নেতাদের ধারণায় তাঁদের ক্রীড়ানক থেকে এক শক্তিশালী নেত্রীতে উন্নীত হয়েছিলেন। তাঁর নীতিগত অবস্থানের জন্য কংগ্রেস বিভক্ত হয়। তাছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তিনি জয়ী হন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৭ সালের শেষে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে এমন এক প্রাধান্যবিস্তারকারী নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন যে কংগ্রেস সভাপতি ডি. কে. বড়ুয়া “ইন্দিরাই ভারত ও ভারতই ইন্দিরা” কথাটির প্রবর্তন ঘটান।

শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আগ্রহ ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। জীবনকে তিনি দেখতেন একটি সুসংহত চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে যেখানে সমস্ত দিক এবং বিষয় পৃথক পৃথকভাবে না থেকে সামগ্রিক হয়ে উঠত। জীবনকে তিনি কখনই বিচ্ছিন্ন কোন কিছু হিসেবে কল্পনা করতেন না, বরং তিনি জীবনকে দেখতেন বহুবিধ বিষয়ের এক সমষ্টি হিসেবে। কর্মজীবনে বহু কৃতিত্ব ও সাফল্যের নজির রেখে গেছেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭২ সালে তাঁকে ভারতরত্ন ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে তিনি লাভ করেন মেক্সিকান অ্যাকাডেমি পুরস্কার (১৯৭২)।

১৯৭৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয় এফ .এ.ও.-র দ্বিতীয় বার্ষিক পদক। ১৯৭৬ সালে লাভ করেন নাগরী প্রচারিনী সভার সাহিত্য বাচস্পতি (হিন্দি) পুরস্কার। ১৯৫৩ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদার্স অ্যাওয়ার্ড-এ সম্মানিত হন। কূটনীতিতে বিচক্ষণতার জন্য ইতালির আইবেলা ডি এস্ট পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হন পরবর্তীকালে। এছাড়াও লাভ করেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির হোল্যান্ড মেমোরিয়াল প্রাইজ। ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক ওপিনিয়ন-এর এক জনমত সমীক্ষার নিরিখে ১৯৬৭ এবং ১৯৬৮ সালে পরপর দু’বার ‘বিশ্বের সেরা মহিলা’ খেতাবে সম্মানিত হন।

একইভাবে ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালাপ পোল সার্ভের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে সম্মান জানানো হয়। প্রাণী ও জীবজন্তুর প্রতি তাঁর বিশেষ যত্নের স্বীকৃতিতে আর্জেন্টাইন সোসাইটি তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন (১৯৭১)। হাজারো কর্মব্যস্ততার মধ্যেও শ্রীমতী গান্ধী লিখে গেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ। ‘দ্য ইয়ার্স অফ চ্যালেঞ্জ’ (১৯৬৬-৬৯), ‘দ্য ইয়ার্স অফ এনডেভার’ (১৯৬৯-৭২), ‘ইন্ডিয়া (লন্ডন)’ (১৯৭৫) এবং ‘ইন্ডে (লুসানে)’ (১৯৭৯) – হল এমনই কয়েকটি সঙ্কলন গ্রন্থ যেখানে তাঁর বহু লেখা ও বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত ভাষণ স্থান পেয়েছে।

দেশ-বিদেশে তিনি সফর করেছেন প্রচুর। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, বার্মা, চিন, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলিতেও বিভিন্ন সময়ে তিনি সফরে গেছেন। সরকারিভাবে সফর করেছেন ফ্রান্স, তৎকালীন দুই জার্মানি, গুয়ানা, হাঙ্গেরি, ইরান, ইরাক ও ইতালি। এছাড়াও আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, কানাডা, চিলি, চেকোস্লোভাকিয়া, বলিভিয়া এবং ইজিপ্টও তিনি সফর করেছেন। ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জামাইকা, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মরিশাস, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ওমান, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, সিঙ্গাপুর, স্যুইজারল্যান্ড, সিরিয়া, স্যুইডেন, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ, টোবাগো, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, বৃটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র, উরুগুয়ে, যুগোস্লাভিয়া, জাম্বিয়া এবং জিম্বাবোয়েও ছিল তাঁর সফর তালিকায়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদর দপ্তরে তাঁর ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি।

নিজের মৃত্যুর আগের দিন ভুবনেশ্বরে শেষ ভাষণ দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। শোনা যায়, সেখানে তিনি নিজের মতো করে ভাষণ দিয়েছিলেন। প্রথমে এইচ ওয়াই শারদা প্রসাদের লেখা ভাষণ পড়তে শুরু করলেও তিনি শেষে নিজের কথা বলতে শুরু করেন। তিনি ভাষণে বলেন, 'আমি জীবিত থাকি অথবা না থাকি, আমার জীবন যথেষ্ট দীর্ঘ হয়েছে। এই জীবনে আমরা গর্ব রয়েছে, পুরো জীবনটাই আমি মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে পেরেছি। নিজের শেষ নিশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত এই কাজটাই করে যাব। আমার রক্তের প্রতিটা বিন্দু ভারতকে আরও মজবুত করার কাজে লাগবে।

'স্পষ্টতই ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তব্যে সকলেই যথেষ্ট অবাক করে দিয়েছিলেন। তবে কি সেদিনই কোনও আঁচ পেয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (PM)? ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করে খুন করেন তাঁর নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে একাধিক গুলি চালানো হয়। এছাড়া কংগ্রেস নেত্রীকে গুলি করেছিলেন সতবন্ত সিংও। গুলির পর ইন্দিরা গান্ধীর অন্য নিরাপত্তা কর্মীরা ছুটে এলে বন্দুক মাটিতে ফেলে আত্মসমর্পন করেন বিয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং। তাঁরা বলেন, 'আমরা আমাদের কাজ করেছি।'

উল্লেখ্য, অপারেশন ব্লুস্টারের পর প্রধানমন্ত্রীর উপর হামলার আশঙ্কা করেছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। এমনকি একবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে সমস্ত শিখ নিরাপত্তা কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। যদিও সেই প্রস্তাব শুনেই রেগে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। শোনা যায়, তিনি বলেছিলেন, 'আমরা কি ধর্মনিরপেক্ষ নই? আমরা কি ধর্মনিরপেক্ষ দেশে থাকি না?' প্রধানমন্ত্রীর এই আপত্তির পর শিখ নিরাপত্তা কর্মীদের পুরোপুরি সরিয়ে না ফেলা গেলেও একসঙ্গে দু'জন শিখ নিরাপত্তা-কর্মীকে প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি ডিউটি দেওয়া হত না।

তবে সেদিন নিজের পেট খারাপ বলে সতবন্ত সিং ডিউটি বদল করেছিল। ১৯৮৪ অক্টোবর ৩১ সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে দফতরে যাওয়ার সময় নতুন দিল্লিতে বাসগৃহ সংলগ্ন উদ্যানপথে নিরাপত্তারক্ষী বিয়ন্ত সিংহ ও সতবন্ত সিংহের আতর্কিত আক্রমণে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান হয়।  ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন দেশের সবচেয়ে দ্বিতীয় দীর্ঘ সময় থাকা প্রধানমন্ত্রী। তিনিই ভারতের একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।