ইন্দ্র কুমার গুজরালঃ ভারতের দ্বাদশতম প্রধানমন্ত্রী Indra Kumar Gujral

ইন্দ্র কুমার গুজরালঃ ভারতের দ্বাদশতম প্রধানমন্ত্রী Indra Kumar Gujral

ইন্দ্র কুমার গুজরাল (Inder Kumar Gujral) একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন যিনি ভারতের দ্বাদশতম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিদেশ মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ভারতের সাথে প্রতিবেশী দেশের সুসম্পর্ক যা ‘গুজরাল ডক্ট্রিন’ নামে পরিচিত।

১৯১৯ সালে ৪ ডিসেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাবের পরী দারওয়াজা গ্রামে একটি ক্ষেত্রী পরিবারে ইন্দ্র কুমার গুজরালের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম অবতার নারায়ন এবং মায়ের নাম পুষ্পা গুজরাল। তাঁর দুই বোনের নাম উমা নন্দা এবং সুনীতা জাজ। তাঁর ভাই সতীশ গুজরাল একজন বিখ্যাত চিত্রকর ছিলেন।

১৯৪৫ সালে ২৬শে মে শীলা গুজরালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের দুই সন্তান- নরেশ গুজরাল এবং বিশাল গুজরাল। ইন্দ্র কুমার গুজরাল ডিএভি কলেজ, হেইলি কলেজ অফ কমার্স এবং লাহোরের ফরম্যান খ্রিষ্টান কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন। তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

গুজরাল স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত হয়ে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদানের কারণে কারাবরণও করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে ইন্দ্র কুমার গুজরাল নিউ দিল্লি মিউনিসিপাল কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৬৪ সালে তিনি ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিতে যোগদান করেন। সেই বছরের এপ্রিল মাসে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। ১৯৭৫ সালে ভারতের যখন জরুরি অবস্থা জারি হয় তখন তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী ছিলেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং দূরদর্শন সেসময় তাঁরই দায়িত্বে ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি আবার রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি কিছুদিন জল সম্পদ মন্ত্রীও ছিলেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর তত্ত্বাবধানে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে রাশিয়ায় নিযুক্ত ছিলেন। সঞ্জয় গান্ধীর সাথে গুজরালের নানা বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে আশির দশকে তিনি কংগ্রেস পার্টি ত্যাগ করে জনতা দলে যোগ দেন।

১৯৮৯ সালে পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে তিনি নির্বাচনে জয়ী হন এবং ভি পি সিং এর মন্ত্রিসভায় বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে তাঁকে শ্রীনগরে রুবাইয়া সাঈদ অপহরণ বিষয়ে সুরাহা করতে পাঠানো হয়। এছাড়াও উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তাঁকে অনেক সমালোচনার সম্মুখীনও হতে হয়।

১৯৯২ সালে লালু প্রসাদ যাদবের সাহায্যে তিনি আবার রাজ্যসভার সদস্য হন।ইউনাইটেড  ফ্রন্ট এর এইচ ডি দেবেগৌড়ার সরকারের বিদেশ মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ভারতের সাথে তার প্রতিবেশী দেশের সুসম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন। তাঁর এই পদক্ষেপকে ‘গুজরাল ডক্ট্রিন’ (Gujral Doctrine) বলা হয়। ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকারের প্রতি কংগ্রেসের সমর্থন সরিয়ে নেওয়ার পর ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে সেই সরকার ভেঙে যায়।

নতুন নির্বাচনী প্রক্রিয়া আয়োজন করা তখন সম্ভব না হওয়ায় নতুন প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে আবার ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার তৈরি করা হয়। ১৯৯৭ সালে ২১শে এপ্রিল ইন্দ্র কুমার গুজরাল প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োজিত হন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ইন্দ্র কুমার গুজরালকে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই (Central Bureau of Investigation, CBI) পরামর্শ দেয় বিহারে লালু প্রসাদ যাদবের সরকারকে দুর্নীতির অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য।

বিহারের তৎকালীন রাজ্যপাল আর কিদোয়াই এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। ইউনাইটেড ফ্রন্টের ভেতর থেকে এবং বাইরে লালু প্রসাদ যাদবের পদত্যাগের দাবি উঠলে লালু প্রসাদ যাদব গুজরালের সমর্থন চান বিহারে সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু ইন্দ্র কুমার গুজরাল এব্যাপারে প্রথম দিকে মৌন ছিলেন। পরে তিনি সিবিআই ডিরেক্টর যোগিন্দর সিংকে বদলি করে তাঁর জায়গায় আর সি শর্মাকে নিযুক্ত করেন।

সেই সময়ে তাঁর পদক্ষেপ বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল কারণ যোগিন্দর সিং বিহার সরকারের দুর্নীতির তদন্ত করছিলেন। লালু প্রসাদ যাদব রাষ্ট্রীয় জনতা দল নামে একটি স্বতন্ত্র দল গড়েন এরপর। ১৯৯৭ সালে গুজরাল সরকার উত্তরপ্রদেশে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন সেই প্রস্তাবে সম্মত হননি।

এছাড়াও এলাহাবাদ হাইকোর্ট রাষ্ট্রপতি শাসনের বিরুদ্ধে রায় দেয়। গুজরাল সেই সময়ে পারমাণবিক চুক্তি সই করতে অস্বীকার করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর সৃষ্টি করা গুজরাল ডক্টট্রিন খুব সমাদৃত হয়। এর পাঁচটি পন্থা ছিল যার দ্বারা ভারতের সাথে তার প্রতিবেশী দেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখা হত।  পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য ছিল।

তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জৈন কমিশন রাজীব গান্ধী হত্যা মামলার রিপোর্ট সরকারকে জমা দেয়। তিনি পরে সেই রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটি তৈরি করেন। রাজীব গান্ধী হত্যা মামলার শুনানির জন্য রাজনৈতিক মহল বেশ টালমাটাল হয়ে পড়ে। সেই সময় অনেকেই সেই হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত দ্রাবিড় মুননেত্র কাঝাগাম (Dravida Munnetra Kazhagam, DMK) পার্টির সদস্যদের পদত্যাগের দাবি করে।

কিন্তু গুজরাল সেই দাবিকে সমর্থন জানাননি। সেই কারণে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন তুলে নেন। গুজরাল সরকার এর জন্য তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং এরপর বাধ্য হয়ে ইন্দ্র কুমার গুজরালকে পদত্যাগ করতে হয়। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৪ সালের মে মাসে তৃতীয়বারের জন্য রাজ্যসভার সদস্য হন গুজরাল।

শেষ জীবনে তিনি ক্লাব দে মাদ্রিদ (Club De Madrid) এর একজন সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের কৃতিত্বের জন্য তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন যার মধ্যে অন্যতম – বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা। ২০১১ সালে তিনি “ম্যাটারস অফ ডিসক্রিশন” (Matters of Discretion) নামে একটি আত্মজীবনী লেখেন।

তিনিই প্রথম  প্রধানমন্ত্রী যিনি তাঁর আত্মজীবনী লিখেছেন। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে তাঁকে গুরগাঁও এর মেদান্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।২০১২ সালের ৩০ নভেম্বর ৯২ বছর বয়সে ইন্দ্র কুমার গুজরালের মৃত্যু হয়। ভারত সরকার তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য সাত দিন ধরে শোক পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সব সরকারী অনুষ্ঠান বাতিল করে। তাঁর শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করা হয়।