ইজরায়েলঃ মধ্যপ্রাচ্যের নকশা বদলে দেওয়া দেশের নাম ইজরায়েল

ইজরায়েলঃ মধ্যপ্রাচ্যের নকশা বদলে দেওয়া দেশের নাম ইজরায়েল

সপ্তম শতকে মুসলিমরা ইসরায়েল ভূখণ্ডটি তাদের দখলে নিয়ে নেয়, ১০৯৯ সালে এটি খ্রিস্টানদের দখলে যায়, ১১৮৭ সালে এটি আবার আইয়ুবীয় রাজবংশ এর অধীনে চলে যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইসরায়েল মিশরের মামলুক সুলতান এর নিয়ন্ত্রণে আসে, ১৫১৭ সালে এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যভুক্ত হয়; ইহুদীরা সপ্তম শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়িয়েছে এবং পরে তারা ইউরোপ মহাদেশে পাড়ি জমায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ইসরায়েল ভূখণ্ডটি ব্রিটিশরা তাদের অধীনে নিয়ে নেয় এবং নাম রাখে 'মেন্ডেটরি প্যালেস্টাইন'।১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বালফোর ইহুদীবাদীদেরকে লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন।

বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয় এবং বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। ১৯২৩ সালে স্বাধীন তুরস্কের জন্ম হলে এই অঞ্চলে ইহুদীরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদগ্রীব হয়ে যান। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে, পোল্যান্ড, গ্রীস এবং সুইজাল্যান্ডে বসবাসকারী ইহুদীদেরকে নেতারা আহ্বান জানান ইসরায়েলে বসতি গড়তে।

তাছাড়া ব্রিটিশ সরকার ইহুদীদেরকে তাদের নিজস্ব ভূমি ছেড়ে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে প্রায় আড়াই লাখ ইহুদী মানুষ ইসরায়েল ভূখণ্ডে পাড়ি জমায়।১৯২১ সালে ইহুদীরা 'হাগানাহ' নামের এক বাহিনী তৈরি করে। এ বাহিনী ইহুদীবাদীদের রাষ্ট্র তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইহুদীবাদীদের সহায়তা করা হাগানাহ বাহিনীর দায়িত্ব হলেও পরবর্তীকালে তারা আধা-সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয় এবং স্বাধীনতার পরে এই বাহিনী ইসরায়েলের মূল সামরিক বাহিনী গঠন করে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ইউরোপ থেকে আরো ইহুদী মানুষ ইসরায়েলে আসে এবং তাদের অনেককেই হাগানাহ সহ অন্যান্য বাহিনীতে নেওয়া হয় ভবিষ্যৎ যুদ্ধের মোকাবেলা করার জন্য।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব পাশ করে ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনীদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।এভাবে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ড্যাভিড বেন গুরিয়ন ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ১৭ মে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ইসরায়েলকে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে তুরস্ক সরকার ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ছিলো।

সালটা ১৯৬৭ । জুন মাস। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া ইজরায়েল তখন বয়সে মাত্র ১৯ বছরের দেশ। জন্ম থেকেই যাঁদের অস্তিত্ব মানতে পারেন না আরবরা, তাঁরা এর আগে দু'বার আক্রমণ করেছিলেন ইজরায়েলকে। দুবারই শেষ হাসি হেসেছিল ইজরায়েল। শিক্ষা হয়নি তাতেও। এবার একাধিক আরব দেশ মিলে পরিকল্পনা করল ত্রিমুখী আক্রমণ করার। এখন যেটা ইজরায়েল সেই স্থান পুরোটাই প্যালেস্তাইনের ছিল, এ কথা মিথ্যা নয়। কিন্তু আরবদের থেকেই দ্বিগুণ মূল্যে জমি কিনেছিল ইহুদিরা।

পরে সামরিক শক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে অনেক এগিয়ে যাওয়া দেশটি ক্রমশ প্যালেস্তিনীয়দের নিজভূমে পরবাসী করে দিতে থাকে। অবশ্যই গাজোয়ারি ব্যাপার। কিন্তু পাশাপাশি বুদ্ধি এবং সাহসের প্রশংসা করতে হবে এই ছোট্ট দেশটির। মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসেরের নেতৃত্বে তৈরি করা হল বিশেষ যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি। দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল, পশ্চিম দিক থেকে মিশর, পূর্ব থেকে জর্ডান এবং উত্তর দিক থেকে সিরিয়া একযোগে আক্রমণ করবে, তৈরি হল নীল নকশা।

মার্কিন এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের মাধ্যমে রিপোর্ট পেল ইজরায়েল। হাতে বেশি সময় নেই। জনসংখ্যার তুলনায় বাকিদের থেকে কম ইজরায়েল সেনা। যৌথ আরব সেনার সংখ্যা যেখানে ৩ লাখের কিছু বেশি, সেখানে মেরেকেটে ইজরায়েলের হাতে ৬৫,০০০ সেনা। যুদ্ধবিমান এবং ট্যাংকের সংখ্যাতেও এগিয়ে আরব জোট। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক ভয় পায়নি ইজরায়েল। সেনা প্রধান মোশে দায়ান বুঝতে পারলেন যদি মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডান আগেই হামলা করে দেয় তাহলে ইজরায়েলের হার নিশ্চিত। তাই দাবার পাল্টা চাল দিলেন তিনি। ওয়ার রুমে কয়েক ঘণ্টা বৈঠকের পর স্ট্র্যাটেজি চূড়ান্ত করে ফেলল ইজরায়েল।

ঠিক হয়ে গেল আরব জোট আক্রমণ করার আগেই আক্রমণ করবে ইজরায়েল। পরের দিনই ১৬০ টি ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান মিশর, জর্ডান এবং সিরিয়ার ওপর একসঙ্গে হামলা চালাল। মিশরের হাতে রাশিয়ার থেকে পাওয়া মিগ ফাইটার জেট ছিল। কিন্তু আকাশে ওড়ার আগেই ২০০ টি মিশরীয় জেট মাটিতেই ধ্বংস করে দিল ইজরায়েল বিমান বাহিনী। ৮০ টি ইজরায়েলি জেট মাত্র কুড়ি মিনিটেই মিশরের কোমর ভেঙে দিল। বাকি ৮০ টি সিরিয়া এবং জর্ডান বিমানবাহিনীকে ধুলিস্যাত্‍ করে দিল।

প্রেসিডেন্ট নাসের সিনাই অঞ্চল দিয়ে ইজরায়েলের জাহাজ যেতে দেবেন না পণ করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল আর্থিক দিক থেকে ইজরায়েলকে পিছিয়ে দেওয়ার। কিন্তু শোচনীয় পরাজয়ের পর নাসের নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হন। তারপর থেকে ছোটখাটো হামলা চালালেও একযোগে আরব দেশগুলোর সাহস হয়নি ইজরায়েলকে আক্রমণ করার। ওই হারের পর মিশরের দিক থেকে সিনাই এবং গাজা, জর্ডানের দিক থেকে ওয়েস্ট ব্যাংক এবং সিরিয়ার গোলান উপত্যাকা ছিনিয়ে নেয় ইজরায়েল। একসময় যে জায়গায় প্যালেস্তাইন ছিল ১০০ শতাংশ, আজ কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে ইজরায়েল জানিয়েছে তাঁদের দেশের সীমা এখনও চূড়ান্ত নয়।