যদুনাথ সরকারঃ বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকার

যদুনাথ সরকারঃ বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকার

যদুনাথ সরকার (Jadunath Sarkar) একজন খ্যাতনামা বাঙালি ঐতিহাসিক। ভারতে তাঁর হাত ধরেই প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইতিহাস গবেষণা শুরু হয়। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে ভারতবর্ষের মধ্যযুগের ইতিহাস গবেষণার কাজে, মূলত মুঘল সাম্রাজ্যের অতীতের পুঙ্খনাপুঙ্খ চর্চা ও বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন অগ্রদূত।

পাঁচ খণ্ডে রচিত ‘হিস্ট্রি অব ঔরঙ্গজেব’ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। ঐতিহাসিক ই. শ্রীধরন যদুনাথ সরকারকে ‘তাঁর সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ ভারতীয় ইতিহাসবিদ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক রূপে বিবেচনা করেছেন। ১৯২৬-১৯২৮ সাল পর্যন্ত যদুনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনিই প্রথম অধ্যাপক উপাচার্য। ১৯২৯ সালে যদুনাথ ইংরেজ সরকারের নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৩৫ সালে প্রথম ভারতীয় ইতিহাসবিদরূপে তিনি আমেরিকান হিস্টরিকাল অ্যাসোসিয়েশনে সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেছিলেন।

ইতিহাসবিদ হওয়ার পাশাপাশি যদুনাথ ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। এমনকি প্রবাসী, প্রভাতী, ভারতবর্ষ এবং সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার মতো তৎকালীন বাংলার নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর নিয়মিত অবদানও দেখা যায়। ১৮৭০ সালের ১০ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার করচমারিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে যদুনাথ সরকারের জন্ম হয়।

তাঁর বাবা রাজকুমার সরকার ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা দৃঢ় চরিত্রের মানুষ। তিনি ইতিহাস এবং ইংরেজি সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বহরমপুর কলেজে ফার্স্ট আর্টস (F.A.) নিয়ে ভর্তি হন। কিন্তু পারিবারিক কারণে তা ছেড়ে দিয়ে তাঁকে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বে আত্মনিয়োগ করতে হয়।

তবে ইতিহাস ও ইংরেজি সাহিত্যানুরাগ জন্মসূত্রে ছড়িয়ে পড়েছিল যদুনাথের মধ্যেও। যদুনাথ সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের সূচনা হয়েছিল রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে। এরপর কলকাতার হেয়ার স্কুল ও সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। ১৮৮৭ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি সহ উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৮৯তে রাজশাহী কলেজ থেকে ফার্স্ট আর্টস (F.A.) ডিগ্রীলাভ করেন।

তারপর ১৮৯১ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইতিহাস এবং ইংরেজি বিষয়ে নিয়ে মাসিক পঞ্চাশ টাকা বৃত্তি সহ বি.এ.(B.A) পাশ করেন। ১৮৯২তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অভূতপূর্ব ফলাফল সহ এম.এ.(M.A.) পাশ করেন। অসাধারণ মেধার জন্য নানা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য সরকারী বৃত্তি প্রদান করার প্রস্তাবনা এলেও যদুনাথ সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সদস্য হিসেবে ১৮৯৩ সালের মার্চে যদুনাথ সরকার কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) ও ১৮৯৩তে মেট্রোপলিটন কলেজের (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) সঙ্গে যুক্ত হন। ১৮৯৮ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল এডুকেশন সার্ভিসের মাধ্যমে সরকারি চাকরি সূত্রে ১৮৯৮ ও ১৯০১ সালের কিছু সময় পর প্রেসিডেন্সী কলেজের ইতিহাস ও ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন।

তখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা একটি প্রভিন্স রূপে গণ্য করা হত। তাই ১৮৯৮-১৯১৭সাল পর্যন্ত পাটনা কলেজে স্থানান্তরিত হয়ে প্রথমে ইতিহাস ও ইংরেজি বিভাগে ও ১৯০৮ সাল থেকে কেবলমাত্র ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপনা করেন। এরপর সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম প্রধানরূপে যোগ দেন ১৯১৭সালে। কিন্তু সেখানে তৃপ্তি না পেয়ে পরের বছর পুনরায় সরকারি চাকরিতে ফিরে আসেন।

এবার তিনি উন্নীত হন ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসে এবং ১৯১৯-১৯২৩এর জুলাই পর্যন্ত কটকের র‍্যাভেনশ কলেজে ইতিহাস ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রূপে নিযুক্ত হন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি স্বেচ্ছায় বাংলা শিক্ষকতাও করেছিলেন। শেষে ১৯২৩-১৯২৬ সাল পর্যন্ত পুনরায় পাটনা কলেজে অধ্যাপনা করে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯২৬-১৯২৮ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদের ভার সামলেছেন যদুনাথ সরকার।

১৯২৮ সালে পুনরায় সেই দায়িত্ব পালনের অনুরোধ এলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ঐ বছরই ‘স্যার ডব্লিউ মেয়ার লেকচারার’ রূপে তৎকালীন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হন। এরপর তিনি সম্পূর্ণ রূপে গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ইতিহাস গবেষণার প্রথম দিকে যদুনাথের আদর্শ ছিলেন উইলিয়াম আরভিন। কর্মব্যস্ত জীবনেও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন যদুনাথ সরকার।

১৯১১সালে আরভিনের মৃত্যুর পর ‘হিস্ট্রি অব দ্যা বঙ্গাশ নবাবস অব ফারুখাবাদ,ফ্রম ১৭১৩-১৭৭১ এ.ডি’.(History of the Bangash Nawabs of Farrukhabad, from 1713-1771 A.D.)ও ‘দ্যা আর্মি অব দ্যা ইন্ডিয়ান মুগলস : ইটস্ অর্গানাইজেশন অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন'(The army of the Indian Mughals:It’s organization and administration) বইতে তাঁর শুরু করা গবেষণার কাজ যদুনাথ সম্পূর্ণ করেন ‘ল্যাটার মুঘলস্ ১৭০৭-১৭৩৯:ভল্যুম ১-২'(Later Mughals: Volume 1-2) প্রকাশ করে।১৯০৪ সাল থেকে মারাঠি ইতিহাসবিদ গোবিন্দ সখারাম সরদেশাই এর সঙ্গে গবেষণার জন্য যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন যদুনাথ।

মারাঠি ভাষায় মোগল ও ঔরঙ্গজেব সংক্রান্ত ইতিহাস,নথি সংগ্রহ করতেন তিনি। ফার্সি ভাষায় থাকা মোঘল ও মারাঠা ইতিহাস খুঁজে পেতে দুজনে উত্তর,পশ্চিম ভারত ঘুরে বেড়িয়েছেন। এই দুই বন্ধুর যৌথ গবেষনার ফসল মারাঠা ইতিহাসের ইংরেজি তথ্যপঞ্জী( Maratha History Records in English) এবং পুণা রেসিডেন্সী করেসপন্ডেন্স সিরিজ ১-১৪(Puna Resedency Correspondence series: Volume-1-14)।

“সত্য প্রিয়ই হউক , আর অপ্রিয়ই হউক ,সাধারণের গৃহীত হউক, আর প্রচলিত মতের বিরোধী হউক,তাহা ভাবিব না। আমার স্বদেশ গৌরবকে আঘাত করুক আর নাই করুক তাহাতে ভ্রূক্ষেপ করিবনা। সত্য প্রচার করিবার জন্য সমাজের বা বন্ধুবর্গের নিকট উপহাস ও গঞ্জনা সহ্য করিতে হয়,করিব। কিন্তু তবুও সত্যকে খুঁজিব,বুঝিব, গ্রহণ করিব।”এই দায়বদ্ধতা নিয়ে ইতিহাস চর্চা করেছিলেন যদুনাথ।

ইসলাম শাসন, এমনকি ইংরেজ শাসনকেও তিনি অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা বা দেশপ্রেমের নজর দিয়ে একপেশে ভাবে নয়, ইতিহাসের মতো নিরপেক্ষ ভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে ভালো ও মন্দ উভয় দিকেই দৃষ্টিগোচর করার প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছেন। মারাঠি ইতিহাস লিখতে গিয়ে তাঁদের লুণ্ঠন নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি দ্বিতীয় বার ভাবেননি। এখানেই তাঁর ইতিহাসচর্চার স্বকীয়তা, সর্বকালীন প্রয়োজনীয়তা।

ইতিহাস গবেষণায় কি অবিশ্বাস্য পরিশ্রমী ছিলেন তিনি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমার জীবনের তন্ত্র’ নামক রচনায় নিজেই লিখেছেন- “কোনো একজন দিল্লীর বাদশা অথবা মারাঠা রাজার ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমাকে প্রথমে দশ বছর ধরে তার উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়েছে; সেগুলি সাজিয়ে, সংশোধন করে, আলোচনা করে, মনের মধ্যে হজম করে, দশ বৎসর পরে ঐ পুস্তকের লেখা আরম্ভ করি, তার আগে নয়।

…এছাড়া ঐ উপকরণসমূহ রীতিমত বুঝবার জন্য আমাকে ফার্সী, মারাঠী ও পর্ত্তুগীজ প্রভৃতি নূতন ভাষা শিখতে হয়।” যদুনাথ বিশ্বাস করতেন প্রকৃত ইতিহাস গবেষণায় মাতৃভাষার ভূমিকা সর্বাগ্রে জরুরি। ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় ‘কনফেশানস অব অ্যা হিস্ট্রি টিচার’ এবং ‘দ্য ভার্নাকুলার মিডিয়াম: ভিউজ় অব অ্যান ওল্ড টিচার’ নামক প্রবন্ধ দুটিতে নিজের এই মতের কথা লিখে গেছেন। গবেষক জীবনে ইতিহাস, অর্থনীতি নানা বিষয়ে যদুনাথ সরকারের অনেকগুলি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।

তবে ‘হিস্ট্রি অব ঔরঙ্গজেব,ভল্যুম ১-৫'( History of Aurangzeb: Volume 1-5) এবং ‘ফল অব দ্যা মুঘল এম্প্যায়ার ভল্যুম ১-৪'(Fall of the Mughal Empire: Volume 1-4) ছিল তাঁর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর কয়েকটি বই হল ‘পাটনার কথা’ (১৯১৬-১৭), শিবাজী (১৯২৯) এবং মারাঠা জাতীয় বিকাশ (১৯৩৬)। দীর্ঘ কর্মজীবনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সাম্মানিক পদমর্যাদা, উপাধি ইত্যাদি নানা ধরনের সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন যদুনাথ সরকার।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৯৭ সালে তাঁকে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্টুডেন্টশিপ সম্মাননা এবং ১৯০৪ সালে গ্রিফিথ পুরস্কার প্রদান করে। ১৯১৯-এ ইন্ডিয়ান হিস্টরিকাল রেকর্ডস কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯২৩ সালে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অফ ব্রিটেনে ও আয়ারল্যান্ডের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন। এইসময় রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলের সাম্মানিক ফেলোও ছিলেন।

ব্রিটিশ সরকার ১৯২৬ সালে তাঁকে কম্প্যানিয়ন অব দ্যা অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার নিযুক্ত করে এবং ১৯২৯ সালে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৩৫ সালে তিনি ইংল্যান্ডের রয়্যাল হিস্টরিকাল সোসাইটির সংশ্লিষ্ট সদস্যপদ (Corresponding membership)। মৃত্যুর ছয় বছর আগে অ-মার্কিন হিসেবে আমেরিকান হিস্টরিকাল অ্যাসোসিয়েশনে আজীবনের সাম্মানিক সদস্যপদের বিরল সম্মান লাভ করেন।

১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট(Hounoris Causa) উপাধি লাভ করেন। পাটনা বিশ্ববিদ‌্যালয় ১৯৪৪ সালে তাঁকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং বঙ্গীয় ইতিহাস পরিষদ তাঁর ৮০ বছর বয়সে যথাক্রমে ১৯৪৯ ও ১৯৫০ সালে তাঁকে সম্বর্ধনা দেয়। তাঁর কলকাতার বাসভবনটি তাঁর স্ত্রী সরকারকে দান করেছিলেন এবং বর্তমানে সেখানে দ্যা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস (The Centre for Studies In Social Sciences) নামক স্বয়ংশাসিত গবেষণা সংস্থা গড়ে উঠেছে।

এই প্রতিষ্ঠান ঐস্থানে যদুনাথ ভবন মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার নামক যাদুঘর ও সংগ্রহশালাটির তত্ত্বাবধান করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘অচলায়তন’ নাটকটি যদুনাথ সরকারকে উৎসর্গ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, তর্কবিতর্ক লেগেই থাকত। যদুনাথের হাত ধরেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির আগেই। ১৯৫৮ সালের ১৯ মে তৎকালীন কলকাতার লেক টেরেসে নিজের বাসভবনে ঘুমের মধ্যেই যদুনাথ সরকারের মৃত্যু হয়।