জগন্নাথের স্নানযাত্রা

জগন্নাথের স্নানযাত্রা

 জগন্নাথের স্নানযাত্রা Jagannath Deb Snan Yatra  এক পবিত্র উৎসব। মনে করা হয় এই দিনেই নাকি জগন্নাথের জন্ম হয়েছিল। তাই এই জন্মতিথিতে জগন্নাথদেবের কাছে মনস্কামনা পূরণের আশায় বহু বহু ভক্ত সমাগম হয় পুরীর মন্দিরে কিংবা মায়াপুরের ইস্কনে। প্রতি বছর রথযাত্রার আগে এই স্নানযাত্রার অনুষ্ঠানকে ঘিরে ভক্তদের এক আলাদা অনুভব গড়ে উঠেছে যুগ যুগ ধরে।

জগন্নাথের জন্ম, তাঁর দেবমূর্তি নির্মাণকে ঘিরে যে পৌরাণিক আখ্যান রয়েছে এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সেই কাহিনির স্রোতে ভেসে ‘জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী’ ভক্তদের দিশা দেখান। জগন্নাথদেবের স্নানের উৎসব এই স্নানযাত্রা। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই জগন্নাথের স্নানযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। রথযাত্রার ১৫ দিন আগে সাধারণত এই উৎসব হয়ে থাকে।

এই পূর্ণিমা তিথিকে ‘দেবস্নান পূর্ণিমা’ বলা হয়ে থাকে। এই তিথির এই বিশেষ দিনটি জগন্নাথদেবের জন্মদিন হিসেবেও অনেকে পালন করে থাকেন। স্কন্দপুরাণ অনুসারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন কাঠ দিয়ে এই জগন্নাথের মূর্তি প্রথম নির্মাণ করিয়েছিলেন। পুরাণ মতে এই দিনেই ভগবান বিষ্ণু দারু কলেবরে পুরীধামে আবির্ভূত হন। বিষ্ণু ইন্দ্রদ্যুম্নকেই প্রথম জানিয়েছিলেন কাঠের মূর্তিতে আবির্ভূত হওয়ার বাসনা। অনেকেই মনে করেন, বিষ্ণুর ইচ্ছেতেই সমুদ্রে কাঠ ভেসে আসে আর সেই কাঠ দিয়েই বিষ্ণুর নতুন এক রূপ নির্মাণে উদ্যত হন ইন্দ্রদ্যুম্ন।

কিন্তু তিনি নিজে তো আর নির্মাণ করতে পারবেন না। ফলে খোঁজ করতে থাকলেন দক্ষ শিল্পীর। স্বর্গলোক থেকে স্বয়ং বিশ্বকর্মা আসেন কাঠ দিয়ে বিষ্ণুর নবরূপ নির্মাণের জন্য। কিন্তু তিনি শর্ত দেন যে যতক্ষণ না পর্যন্ত মূর্তি নির্মাণ শেষে বিশ্বকর্মা কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেন, তার আগে দরজা খুলে ঘরে ঢোকা যাবে না।

এই শর্তে কাজ শুরু করেন বিশ্বকর্মা। বহু দিন পর ঘরের ভিতর থেকে কোনও রকম সাড়া-শব্দ আসছে না দেখে ইন্দ্রদ্যুম্ন চিন্তিত হয়ে ঘরের দরজা খুলে দেওয়া মাত্র বিশ্বকর্মা অদৃশ্য হন। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার হাত-বিহীন কাষ্ঠমূর্তি অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে দণ্ডায়মান ছিল সেই সময়। ফলে সেভাবেই জগন্নাথের মূর্তিকে আমরা আজ দেখতে পাই। পুরাণের গল্পে রয়েছে, সুদূর গুজরাত থেকে জগন্নাথের স্নানযাত্রা উপলক্ষ্যেই সাধক গণপতি ভট্ট জগন্নাথ দর্শনে এসেছিলেন পুরী ধামে। তাঁর ইষ্টদেব বিষ্ণু জানতেন যে জগন্নাথ হস্তিমুখ।

তাই সেই রূপ দর্শন করার বাসনা নিয়ে এলেও হস্তিমুখ দেখার সাধ মেটে না তাঁর। জগন্নাথ নাকি তাঁর ভক্তের মনের বাসনা বুঝতে পেরে ইন্দ্রদ্যুম্নকে নির্দেশ দেন তাঁকে হস্তিমুখে সজ্জিত করার এবং তারপর গণপতিকে আবার ডেকে এনে সেই রূপ দর্শন করানো হয়। জগন্নাথ নাকি সেদিন গণপতির হাত থেকে শুঁড় দিয়ে নৈবেদ্য গ্রহণ করেছিলেন। শাস্ত্রে বলে স্বয়ং মনুই নাকি এই তিথিকে জগন্নাথের জন্মতিথি হিসেবে পালন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্নানযাত্রার পরের ১৫ দিন দর্শনার্থীদের জগন্নাথের রূপ দেখতে না দেওয়ার পিছনে এক পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে।

মনে করা হয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে নাকি জগন্নাথ বলেছিলেন যে স্নানের পর তাঁর বেশ-বাসহীন নিরলঙ্কার রূপ যেন কেউ না দেখতে পায়। তাই ১৫ দিন যাবৎ জগন্নাথের দর্শন পাওয়া যায় না।   স্নানযাত্রার আগের সন্ধ্যায় প্রতি বছর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এবং সুদর্শন চক্র, মদনমোহন বিগ্রহকে একটি বিশাল শোভাযাত্রা করে মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বের করে স্নানবেদিতে নিয়ে রাখা হয়।

মহাস্নানের সময় প্রতি বছর জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহকে রত্নবেদী থেকে নামানোর আগে মন্দিরের সেবায়েতরা সেই বিগ্রহের উদ্দেশ্যে পুষ্পাঞ্জলি দেন। তারপর এই তিন বিগ্রহকে নিয়ে যাওয়া হয় স্নানবেদিতে। সেখানে মঙ্গলারতি, সূর্যপূজার পরে স্নানের জন্য প্রস্তুত করা হয় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে।

পুরীর মন্দিরের দক্ষিণের দরজার পাশে থাকা সোনায় বাঁধানো কুয়ো থেকে জল এনে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তারপর ১০৮ কলসি জল দিয়ে মহাস্নান সম্পন্ন হয়। স্নানের পর জগন্নাথ ও বলরামকে গজবেশ পরানো হয় অর্থাৎ গণেশের মত হস্তি-মুখযুক্ত বেশ পরানো হয়। এই সময় ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী জগন্নাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তার জ্বর আসে।

ফলে রাজবৈদ্যের পরামর্শে তাঁকে এই সময় একটি সংরক্ষিত কক্ষে রাখা হয়। দীর্ঘ ১৫ দিন যাবৎ জগন্নাথ বন্দি থাকেন এবং ভক্তরা তাঁর দর্শন পান না। এই সময়টিকে বলা হয় ‘অনসর’। ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য এই সময় মূল মন্দিরে জগন্নাথের বিগ্রহের বদলে তিনটি পটচিত্র রাখা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস অনসর চলাকালীন জগন্নাথ অলরনাথ রূপে ব্রহ্মগিরিতে অবস্থান করেন। মনে করা হয়, রাজবৈদ্য জগন্নাথকে যে পাঁচন খাওয়ান, তার প্রভাবেই মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই সেরে ওঠেন জগন্নাথ। এই ১৫ দিন পর আবার মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে জগন্নাথের দর্শন পাওয়া যায়।