জয়ন্তী শক্তিপীঠঃ একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ সতীপীঠ জয়ন্তী শক্তিপীঠ

জয়ন্তী শক্তিপীঠঃ  একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ সতীপীঠ জয়ন্তী শক্তিপীঠ

জয়ন্তী পীঠ ঠিক কোথায়- তা নিয়ে পণ্ডিত দের বিতর্ক আছে । উইকিপিডিয়া ও কিছু প্রাচীন শাস্ত্র বাংলাদেশের শ্রীহট্টে এই পীঠ বলে চিহ্নিত করেছেন । অপরদিকে কিছু শাস্ত্রের মত পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে আলিপুরদুয়ার সংলগ্ন ভূটান পাহাড়ের এক গুহায় এই পীঠ অবস্থিত বলে বর্ণনা করেছেন । দুই পীঠের নাম জয়ন্তী । তবে ঐতিহাসিক বিচারে বর্তমান বাংলাদেশের শ্রীহট্ট জেলার কালজোর বাউরভোগ গ্রামে এই পীঠ অবস্থিত বলে মনে করা হয় ।

সতীর ৫১ পীঠের কাহিনী অনুসারে, দক্ষের যজ্ঞে মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুন্ডে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। আর তারপরই সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডবলীলায় মাতেন স্বয়ং মহাদেব। মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে বিশ্ব সংসারকে রক্ষা করতে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেন শ্রীবিষ্ণু। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সতীর দেহ খন্ডগুলি।

পৃথিবীর বুকে পড়া মাত্রই প্রস্তরখন্ডে পরিণত হয় সতীর দেহের খন্ডগুলি। সেই বিশেষ বিশেষ স্থানগুলি পরিণত হয় এক একটি সতীপীঠে। প্রত্যেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্রের জায়গা সতীর এই ৫১ পীঠ। দেবী সতীর ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম হল সতীপীঠ জয়ন্তী। কালাজোড় গ্রাম, জয়ন্তীয়া থানা, সিলেট জেলা, বাংলাদেশ : শ্রী বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র দ্বারা ছেদনের পর দেবী দাক্ষায়ণী বাম জঙ্ঘা এই “স্থানে” পতিত হয়েছিল এবং সকল শক্তিপীঠ মতো এখানেও মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । পূজিত হন দেবী জয়ন্তী রুপে। পাশে পূজিত হয় মহেশ্বর শিবের অবতার রুপ ক্রমদীশ্বর নামে।

দেবীর মন্দিরের বলতে জানা যায়- চারকোণা অগভীর গর্তের মধ্যে একটি চৌকো পাথরের মধ্যে দেবীর পীঠ। অনেকের মতে দেবী জয়ন্তী তাঁর ভৈরব ক্রমদীশ্বরের সাথে এই কুণ্ডে বিরাজ করেন । মন্দিরের অনতিদূরে আর একটি কুণ্ড আছে। এখানে জল অল্প হলেও স্বচ্ছ। এই জল দিয়ে দেবীর পূজো হয় । মন্দিরের থেকে অল্প দূরে আর একটি শিবলিঙ্গ দেখা যায়। সেখানকার মন্দির জয়ন্তীর রাজা বানান । প্রথমে স্বপ্নাদেশ পেয়ে স্থানীয় আদিবাসী মেয়েরা খড় বাঁশের মন্দির নির্মাণ করে ভগবান শিবের পূজা করতো। রাজা এখানে মন্দির নির্মাণ করেন । “অসমের ইতিহাসের” রচয়িতা জৈনেক ব্রিটিশ সাহেব তাঁর লেখনীতে জানিয়েছেন- জয়ন্তী পীঠ জয়ন্তীয়া পরগণার ফাজলপুরে অবস্থিত । এখানে দেবীর বাম চরণের নিম্নাংশ পড়েছিল ।

কিছু শাস্ত্রের মত অনুসারে জানা যায়, মেঘালয়ের জয়ন্তী পাহাড়ে পড়েছিল দেবীর বাম ঊরু বা বামজঙ্ঘা। দেবী এখানে জয়ন্তী নামে পরিচিত। ভৈরব হলেন ক্রমদীশ্বর। এখানে দেবীর ভার ধরে রেখেছেন স্বয়ং মহাকাল। দেবী জয়ন্তীর থেকে এখানে মহাকালের প্রাধান্যই বেশি। তন্ত্রের মতে শক্তিই প্রকৃতি, সব শক্তি প্রকৃতিতে বিরাজমান। আর শিব ছাড়া কোনো শক্তিরই অস্তিত্ব নেই। এখানে শক্তির সঙ্গে মিলন হয়েছে প্রকৃতির। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার থেকে ৩৭ কিমি দূরে পাহাড় জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে জয়ন্তী নদী।

এখান থেকে অনেক পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় সতীপীঠ জয়ন্তীতে। জয়ন্তীর উত্তরে রয়েছে দার্জিলিং, দক্ষিণে রয়েছে গাঙ্গেও সমভূমি। এর মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা তোর্সা। এরই অববাহিকায় জয়ন্তী অবস্থিত। পাহাড় জঙ্গলের রাস্তা পেরিয়ে ট্রেকিং করে পৌঁছাতে হয় মহাকালের মন্দিরে। সমতল থেকে প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচুতে জঙ্গল আর পাহাড়ে ঢাকা ভারত ও ভুটান সীমান্তে, ভুটানের মহাকাল পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই মহাকাল মন্দির। জঙ্গলে ঘেরা এই পাহাড়ের চূড়ায় তিনটি গুহা অবস্থিত।

এই তিনটি গুহা বেষ্টিত মন্দিরকে একসঙ্গে মহাকাল মন্দির বলা হয়। প্রথম গুহায় রয়েছেন ব্রহ্মা- বিষ্ণু- মহেশ্বর । দ্বিতীয়টিতে রয়েছেন বাবা ভোলানাথ ও তৃতীয় গুহায় রয়েছেন মা মহাকালী। চুনা পাথরের পাহাড়ের উপর এই গুহা প্রকৃতির সৃষ্টি। গুহায় নানা দিক থেকে জল বেয়ে পড়ে। গুহার অদ্ভূত প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার মতো। গুহার ভিতর গর্ভগৃহে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়। সেখানে সারাক্ষণ প্রদীপ জ্বালানো থাকে। এই প্রকৃতির সৃষ্টির মধ্যেই দেবী জয়ন্তীর অবস্থান।প্রতি বছর শিবরাত্রির সময় মহাকালের মন্দিরে পুজো দিতে ঢল নামে ভক্তদের। এই স্থান খুব দুর্গম । যানবাহন খুব একটা নেই । পাহাড়ের মধ্যে জঙ্গলে ঘেরা পরিবেশ – সন্ধ্যার পর নিস্তব্ধ হয়ে যায় । মহাকালীর গুহাতে প্রাকৃতিক ভাবে নির্মিত শিলাঝুরির মহাকালী বিগ্রহ দেখা যায় ।