কার্ল মার্ক্স: পণ্ডিত থেকে পুঁজিবাদের এক কট্টর সমালোচক কার্ল মার্ক্স

কার্ল মার্ক্স:  পণ্ডিত থেকে পুঁজিবাদের এক কট্টর সমালোচক কার্ল মার্ক্স

আমেরিকার এক প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি একবার এক আলোচনায় বলেছিলেন, বামপন্থী হলেন যারা মার্কস পড়েন, আর ডানপন্থী হলেন যারা মার্কস বোঝেন।তবে মার্কসবাদ যে আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে এখনও বহু আলোচিত বিষয় সে ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

সারা বিশ্বে এই মতবাদ ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হওয়ার পাশে বহুদেশ শুধুমাত্র মার্কসবাদ বা মার্কসীয় অর্থনীতি মেনে কিভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সে ব্যাপারেও যথেষ্ট আলোচনা চারদিকে হচ্ছে।আবার অন্যদিকে চীন সহ বেশ কিছু দেশ প্রথাগত মার্কসীয় দর্শন বা অর্থনীতি ছেড়ে এক উদার, দক্ষিণ পন্থী ও বামপন্থী অর্থনীতির মাঝামাঝি এক অর্থনীতির পথ মানছে। 

 চীনের গৃহযুদ্ধে মাও সে-তুংয়ের কমিউনিস্ট বাহিনী ১৯৪৯ সালে জয়ী হওয়ার ৪০ পর বার্লিন দেয়াল ভাঙা পর্যন্ত কার্ল মার্ক্সের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল অলঙ্ঘ্যেয়। পৃথিবীর প্রতি দশজনের প্রায় চারজনই এমন সরকারগুলোর অধীনে ছিল যে সরকারগুলো নিজেদের মার্ক্সবাদী বলে দাবি করত। এর বাইরে বহু দেশে বামপন্থীদের অনুকরণীয় আদর্শ ছিল মার্ক্সবাদ এবং মার্ক্সবাদকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, সেটিই ছিল সেসব দেশের ডানপন্থীদের মূলনীতি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার পরও সেখানে মার্ক্সের প্রভাব রয়ে যায়।

কার্ল মার্ক্স ১৮১৮ সালে ৫ মে জার্মানির ট্রিয়র শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মসূত্রে ইহুদিদের পণ্ডিত সম্প্রদায়ভুক্ত হলেও জার্মান সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য মার্ক্সের বয়স যখন মাত্র ৬ বছর তখন তার পুরো পরিবারই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে মার্ক্স দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। মদ্যপান এবং দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাকে হাজতবাসও করতে হয়।

ইচ্ছা ছিল, একজন নাট্য সমালোচক হবেন। কার্লের উপর ত্যাক্ত -বিরক্ত হয়ে তার পিতা তাকে কঠিন অনুশাসনের বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি ভিড়ে যান একদল ‘তরুণ হেগেলিয়ান’দের  সংশয়বাদে বিশ্বাসী দলে। কার্ল মার্ক্স পরবর্তীতে শ্রেণী ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অবিশ্বাসীদের ছোট একটি বুদ্ধিজীবীদের দলে যোগ দেন। দলটির নাম- কমিউনিস্ট পার্টি।

এই দলের একজন গোপন সাংবাদিক দিসেবে কাজ করার সময় জেনি ভন নামের অভিজাত এক মহিলার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। রাজনৈতিক কারণে জার্মানি থেকে পালাতে হয় তাদের। পরবর্তীতে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন তারা। জীবিতাবস্থায় জনপ্রিয়তা না পেলেও পরবর্তীতে কার্ল মাক্সের ধারণাগুলো সমগ্র পৃথিবীজুড়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। 

মার্ক্স মনে করতেন, বংশগত বা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাবের মতো আর কিছু নেই। ‘থিসিস অন ফয়েরবাখ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভে তিনি লিখেছেন, ‘সামাজিক সম্পর্কগুলোর যূথবদ্ধতাই মনুষ্যচরিত্রের সার।’ পরে তিনি বলছেন, ধরা যাক, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে ফেলার মাধ্যমে আপনি সামাজিক সম্পর্কগুলো পাল্টে দিলেন এবং পুঁজিবাদী ও শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক বিলুপ্ত করে দিলেন; তাহলে দেখা যাবে পুঁজিবাদী সমাজে বেড়ে ওঠা মানুষের চেয়ে এই নতুন সমাজের মানুষ একেবারে আলাদা ধরনের হয়ে উঠেছে।

ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে থাকা মনুষ্য-প্রকৃতির ওপর বিশদ পড়াশোনা করে মার্ক্স এমন সিদ্ধান্তে এসেছেন বলে মনে হয় না। বরং তিনি ইতিহাস সম্পর্কে হেগেলের দৃষ্টিভঙ্গিকেই এখানে প্রয়োগ করেছেন। হেগেলের মতে, মনুষ্য-চেতনার মুক্তিই ইতিহাসের অভীষ্ট লক্ষ্য। তিনি মনে করতেন, যখন আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারব যে আমরা বিশ্বজনীন মানবসত্তার একেকটি অংশ, তখনই সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

মাও সে-তুংয়ের আমলে চীনের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র ছিল। মাওয়ের পর ১৯৭৮ সালে তাঁর উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং (যিনি বলেছিলেন ‘বিড়াল সাদা কি কালো সেটা বড় কথা নয়, সেটি ইঁদুর ধরছে কি না, সেটাই বড় কথা’) ক্ষমতায় বসায় চীনের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। এর কারণ হলো দেং জিয়াওপিং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎপাদন অনুমোদন করেছিলেন। তাঁর এই সংস্কারের কারণেই চীনের ৮০ কোটি দরিদ্র মানুষ উঠে দাঁড়িয়েছে।

একই সঙ্গে এই সংস্কার চীনে ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। যদিও চীন এখনো বলে যাচ্ছে তারা ‘চীনের নিজস্ব আদলের সমাজতন্ত্র’ গড়ে তুলছে। যদিও সেই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের মিল প্রায় নেই বললেই চলে।

পশ্চিমা পুঁজিবাদ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং রক্ষণশীল। মৃত্যু পরবর্তীকালীন কয়েক যুগ পর থেকে শুরু করে এমনকি বর্তমান সময়েও মার্ক্স প্রবর্তিত ধারণাগুলো নিয়ে সমালোচকদের আগ্রহের কমতি নেই। তার লেখায় ‘পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা’ নিয়ে বেশ কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা উঠে এসেছে। আজ তারই কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করা হবে। 

চীন যদি মার্ক্সের চিন্তাভাবনার দ্বারা এখন আর প্রভাবিত না হয়, তাহলে আমরা এই উপসংহারে আসতে পারি যে চীনের অর্থনীতির মতো রাজনীতিতেও তিনি এখন আর প্রাসঙ্গিক নন। তারপরও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব রয়েই গেছে। ইতিহাস সম্পর্কে দেওয়া তাঁর বস্তুবাদী তত্ত্ব আমাদের মানবসমাজের চালিকাশক্তির গতি-প্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে মার্ক্সের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি। 

কার্ল মার্ক্সের সবচেয়ে বড় তত্ত্ব ছিল পুঁজিবাদ নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে। কিভাবে? তিনি বলছেন, যখন সবাই বুঝতে পারবে যে এই পদ্ধতিতে গলদ আছে, তখন তারা নিজেরাই বিদ্রোহ করে বিপ্লব ঘটাবে। কিন্তু সেটি এখনো বাস্তবে ঘটেনি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কম্যুনিস্ট আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপ্লবের অনেক নজির আছে। এসব বিপ্লব যে ব্যর্থ হয়েছে সেজন্যে কেউ কেউ দুর্নীতিকে দায়ী করে থাকেন। তবে অন্যরা বলেন মার্ক্সের তত্ত্বই আসলে ভুল।