কাশীকান্ত মৈত্রঃ নদীয়ার শান্তিপুরের বিখ্যাত মৈত্র পরিবারের সুসন্তান Kashi Kanta Maitra

কাশীকান্ত মৈত্রঃ  নদীয়ার শান্তিপুরের বিখ্যাত মৈত্র পরিবারের সুসন্তান Kashi Kanta Maitra

শান্তিপুরের বিখ্যাত মৈত্র পরিবারের পণ্ডিত লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র’র পুত্র তিনি ।কৃষ্ণনগরকে কেন্দ্রে করে রাজনৈতিক বৃত্তে উঠে আসা কাশীকান্তের প্রধান কাজ ছিল মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো। আইনজীবী হিসেবে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে বহু দরিদ্র বিচারপ্রার্থীকে সাহায্য করেছেন। ’৬৬ সালে কৃষ্ণনগরে খাদ্য আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন কাশীকান্ত।

তিনি তখন কৃষ্ণনগরের বিধায়ক। চালের দাম বেড়ে গিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। চাল ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে চাল গুদামজাত করেন। তখন কাশীকান্তবাবু সেই চাল উদ্ধার করে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করেন এবং  সমস্ত অর্থ চালের মালিকদের হাতে তুলে দেন।  পিতার মত তাঁর কর্ম জীবনও ছিল বর্ণময়। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত তিনি কৃষ্ণনগর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচিত বিধায়ক ছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ভক্ত এবং সমাজতন্ত্রী তরুণ কাশীকান্ত বাবু ১৯৬২ সালে প্রথম প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে বিজয়ী হন।

এরপর ১৯৬৭, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালে সংযুক্ত সোস্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী, ১৯৭২ সালে কংগ্রেস এবং ১৯৭৭ সালে জনতা দলের প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের নির্বাচনে জনতা দলের প্রার্থী কাশীকান্ত মৈত্র Kashikanta Maitra পরাজিত হন। ১৯৮২ সালের ১৯ মে নির্বাচনের আগে একটি ঘটনা ঘটে। ১৪ মে নির্বাচন প্রার্থী কাশীকান্ত মৈত্র, কংগ্রেস (জ) প্রার্থী গোপালচন্দ্র সরকার এবং জনতা দলের কর্মী ও কৃষ্ণনগর পুরসভার উপ-পৌরপতি শিবনাথ চৌধুরী নকশাল নেতা রমেন সাহার নেতৃত্বে দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক অপহৃত হন।

এর প্রতিবাদে ১৬  মে কৃষ্ণনগরে  Krishnanagar বন্ধ পালিত হয়। ভোট বয়কটের ডাক দেওয়া নকশালপন্থীরা ভেবেছিল প্রার্থীর অনুপস্থিতিতে ভোট বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু প্রার্থীর মৃত্যু হলেই একমাত্র নির্বাচন বন্ধ বা স্থগিত হতে পারে সেটা তাদের ধারণায় ছিল না।  পাশাপাশি বিরুদ্ধপ্রার্থী শিবির থেকে ইস্তাহার প্রচার করে বলা হয় পরাজয়ের ভয়ে  তিনি আত্মগোপন করেছেন।

এর আগের নির্বাচনে কাশীবাবু অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে যথাসময়েই নির্বাচন হয় এবং তিনি এবার পরাজিত  হন। এই ১৯৮২ সালের পর তিনি রাজনীতির জগত থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। বিধানসভার ভিতরে এবং বাইরে বাগ্মীতার জন্য কাশীকান্ত মৈত্র বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৬৫-৬৬ সালে রাজ্যের খাদ্য সংকটের দিগুলিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে দুরন্ত প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছেন।

খাদ্য আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে  নিহত শহীদ ছাত্রের মরদেহ নিয়ে পথে মিছিলে হেঁটেছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন। খাদ্য ও  পশুপালন দপ্তরের মন্ত্রী থাকাকালীন ভূষি কেলেঙ্কারিতে তাঁর আপ্ত সহায়কের নাম তথা দপ্তরের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন।দুর্নীতি প্রমাণে তাঁর ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় গ্রহণে ব্যর্থ হন। আজকের দিনে দেখা যায় রাজনৈতিক নেতারা একটিদল থেকে ভোটে জিতে জার্সি পাল্টে দলবদল করে  অন্য দলে চলে যান।

কিন্তু কাশীকান্ত বাবু তা করেননি।আগে দলত্যাগী হয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে এসেছেন। সংবিধান সংশোধনের জন্য যখন ইন্দিরা গান্ধী সংসদে বিল আনেন এবং প্রত্যেকটা বিধানসভা থেকেও পাস করিয়ে নেবার চেষ্টা করেন, সেই সময় কাশীকান্তবাবু  কংগ্রেস দলের সদস্য হয়েও সংবিধান সংশোধন বিলের বিপক্ষে ভোট দেন।

বিশিষ্ট বাগ্মী কাশীকান্ত ছিলেন মানবিক মূল্যবোধের ধারক ও বাহক,  মননশীল ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও করোনা মোকাবিলায় কয়েক লক্ষ টাকা দান করে গিয়েছেন। নদিয়া জেলার বহু দরিদ্র মানুষকে লোকচক্ষুর আড়ালে মাসিক ভাতা দিতেন। কল্যাণীতে Kalyani ক্ষুদ্র শিল্পের আওতায় স্কুটার কারখানা স্থাপন করেছিলেন।

জেলায় জেলায় দুগ্ধ সংগ্রহকে কেন্দ্র করে দুগ্ধ ব্যবসায়ীদের আয় বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করেন তিনি। ১৯৭৮ সালে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে দণ্ডকারণ্য থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তুদের বসবাসের ক্ষেত্রে বামপন্থীদের বিরোধিতার বিরুদ্ধে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে গর্জে উঠেছিলেন তিনি। উদ্বাস্তুদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। এর জন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।  

১৯৫১ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেন। ২০২০ সালে লকডাউন শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত নিয়মিত হাইকোর্টে হাজির থেকেছেন। পুরসভাকর্মী সহ বহু শ্রমিক কর্মচারীর বিপদের দিনে আদালতে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন। তিনি আইন বিষয়ে বই লিখেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার, প্রাবন্ধিক হিসাবেও গ্রন্থরচনা করেছেন।

‘মার্কসবাদঃ কৃষক ও কৃষিনীতি’ (১৯৮৪), ‘মার্কস ও সমাজতন্ত্র’ (১৯৮৯), ‘রাজনীতি কূটনীতি বিপ্লব’’, ‘মার্কসবাদ লেনিনবাদ মতবাদ ও প্রয়োগে’, ‘মরিচঝাঁপির কান্না’, ‘গণতন্ত্র মুখ মুখোশ’  ইত্যাদি অনেকগুলি গ্রন্থের রচয়িতা তিনি । রবীন্দ্রসংগীত ছিল তাঁর বড়  প্রিয়। একসময় ভালো গাইতেও পারতেন। তাঁর চিকিৎসক পুত্র সুব্রত মৈত্র ১৭ মার্চ ২০১৬সালে প্রয়াত হন।

বৃদ্ধবয়সে  পুত্রশোক সহ্য করেও ভেঙে না পড়ে সামাজিক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। প্রচারবিহীন দাতা কাশীকান্ত মৈত্র সারাবছরই নীরবে অনেক অসহায় মানুষকে  আর্থিক সাহায্য করতেন।তেমনি গ্রন্থাগারসহ বিভিন্ন  শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে  দান করতেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিধায়কদের পেনশন প্রথার বিরোধী ছিলেন।

দুই দশক নিজে বিধায়ক থাকলেও কোনদিন পেনশন না নিয়ে ভারতের সংশোধীয় রাজনীতিতে এক অনন্য নজীর সৃষ্টি করে গেছেন। তিনি মনে করতেন সমাজসেবার জন্যই রাজনীতিতে আসা। ২৯ আগস্ট ২০২০ সাধারণ মানুষ হারালেন তাঁদের একজন প্রিয়জনকে আর নদীয়া তথা বাংলা হারালো তার এক কৃতী সন্তানকে।