ভারতে আজও ব্রাত্য এই কনিষ্ঠতম বাঙালি বিপ্লবী!

ভারতে আজও ব্রাত্য এই কনিষ্ঠতম বাঙালি বিপ্লবী!

আজবাংলা  ক্ষুদিরাম বসু ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর শহরের কাছাকাছি (বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা) কেশপুর থানার অন্তর্গত মৌবনী (হাবিবপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের তহসিলদার। তার মার নাম লক্ষ্মীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করেন। অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড়ো দিদির কাছে তিন মুঠো খুদের (চালের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন।

খুদের বিনিময়ে কেনা হয়েছিল বলে শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরামের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তিনি তার মাকে হারান। এক বছর পর তার পিতার মৃত্যু হয়। তখন তার বড়ো দিদি অপরূপা তাকে দাসপুর থানার এক গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায় ক্ষুদিরামকে তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলএ ভরতি করে দেন। ১৯০২ এবং ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করেন। তারা স্বাধীনতার জন্যে জনসমক্ষে ধারাবাহিক বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন অধিবেশন করেন, তখন কিশোর ছাত্র ক্ষুদিরাম এই সমস্ত বিপ্লবী আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

স্পষ্টভাবেই তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন এবং কলকাতায় বারীন্দ্র কুমার ঘোষের কর্মতৎপরতার সংস্পর্শে আসেন। তিনি ১৫ বছর বয়সেই অনুশীলন সমিতির একজন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ওঠেন এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী পুস্তিকা বিতরণের অপরাধে গ্রেপ্তার হন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম থানার কাছে বোমা মজুত করতে থাকেন এবং সরকারি আধিকারিকদেরকে আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করেন। 

 ক্ষুদিরাম বোস যখন যৌবনের আসনে ছিলেন তখন “হাসি মুখে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর মাতৃভূমির প্রতি তাঁর যে ভালবাসা ছিল সে সম্পর্কে গল্পগুলি বহু প্রজন্ম ধরে আমরা শুনে আসছি, বাংলার জনপ্রিয় লোককাহিনীগুলির মাধ্যমে।  তবে রাজ্যের বাইরেও তাঁর নাম ছায়ায় রয়ে গেছে। এটি হতে পারে কারণ বোস কখনই অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতো লাইমলাইট পায়নি।

মৃত্যুর পরেও, তাঁর গল্পটি জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এটিকে স্থান পায়নি,তা চলচ্চিত্র, বায়োপিকস, টিভি শো বা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে সুপরিচিত বইগুলিই হোক না কেন। মহাত্মা গান্ধী, ভগত সিং, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এবং অন্যদের সম্পর্কে প্রত্যেকেই জানেন, তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয়ে মূলধারার আলোচনায় খুদিরাম বোসের উল্লেখ খুব কমই হয়েছিল।অবাক করা বিষয়ও যে বাংলা থেকে কেবল নেতাজিই জাতীয় মনোযোগ পেয়েছিলেন।

রাজ্যটি স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও, এবং মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রফুল্ল চাকী, মাতঙ্গিনী হাজরা,বিখ্যাত ত্রয়ী বিনয় বাদল দীনেশ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা দিয়েছেন - কিন্তু এখনও তারা অনেকের কাছে অজানা, ঠিক ক্ষুদিরাম বোসের মতো।১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম বোসকে কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস এইচ কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মম শাস্তি দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন।

ডগলাস যে গাড়ীতে যাত্রা করছিলেন বলে মনে করা হয়েছিল, সেখানে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন ক্ষুদিরাম বোস, তার ফলে ব্যারিস্টার প্রিংল কেনেডি-র স্ত্রী এবং কন্যাকে হত্যা মারা গিয়েছিলো।পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং ক্ষুদিরাম বোস নিজেই কার্যক্রমের পুরো দায়িত্ব নিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত হবার পরে বোস হাসি মুখে রায়টি মেনে নিয়েছিলেন। শেষ অবধি ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।