কিরীটেশ্বরী মন্দির | হিন্দু ধর্মের অন্যতম মন্দির কিরীটেশ্বরী

কিরীটেশ্বরী মন্দির  | হিন্দু ধর্মের অন্যতম মন্দির কিরীটেশ্বরী

কিরীটেশ্বরী Kiriteshwari মন্দির হল Hindu হিন্দুধর্মের পবিত্র তীর্থ শক্তিপীঠ গুলির মধ্যে অন্যতম হল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ কোর্ট রোড রেলওয়ে স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে কিরিটকনা গ্রামে অবস্থিত কিরীটেশ্বরী মন্দির। জানা যায়, মুর্শিদাবাদের কিরীটকোণা গ্রামে পড়েছিল দেবীর মাথার মুকুট। তাই দেবীকে এখানে কিরীটেশ্বরীর পাশাপাশি মুকটেশ্বরী নামেও ডাকা হয়।

রাঢ় বাংলার প্রাচীন পীঠস্থানগুলির মধ্যে অন্যতম হল এই কিরীটকোণা গ্রামের কিরীটেশ্বরী সতীপীঠ। তান্ত্রিকমতে, জানা যায়, এখানে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর ‘কিরীট’ অর্থাৎ মুকুটের কণা পড়েছিল।যেহেতু এখানে দেবীর কোনও অঙ্গ পড়েনি তাই এই স্থানকে অনেক তন্ত্রবিদ্ ‘পূর্ণ পীঠস্থান’ না বলে ‘উপপীঠ’ বলে থাকেন।দেবী এই সতীপীঠে ‘বিমলা’ নামে পূজিত হন।

আর তাঁর ভৈরব পূজিত হন ‘সম্বর্ত’ নামে। শাক্তধর্মে এই স্থান একটি প্রাচীন মহাপীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ। পাঠান-মুঘল শাসনকালেও এই স্থানের খ্যাতি ছিল বলে জানা যায়। রেনেলের কাশীমবাজার দ্বীপের মানচিত্রে কিরীটকোণাকে ‘তীরতকোণা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা যায়। ১৪০৫ সালে আদি দক্ষিণমুখী মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। আদি মন্দিরটি বর্তমানে লুপ্ত। গ্রামের দক্ষিণ অংশের কয়েক বিঘা জায়গা জুড়ে কিরীটেশ্বরী বর্তমান মন্দির এবং আরও কয়েকটি মন্দির অবস্থিত।

আঠার শতকের প্রথম দিকে পশ্চিমমুখী বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করান কানুনগো বঙ্গাধিকারী দর্পনারায়ণ রায়। মন্দিরের গর্ভগৃহে বিগ্রহ নেই, মন্দিরের ভিতরে একটি মর্মরবেদীর ওপর কালো পাথরের পীঠিকা। সম্ভবত তার উপর ছিল দেবীর কিরীট। বর্তমানে ওই কিরীট ( মতান্তরে কপালের হাড় ) গ্রামের একধারে ‘গুপ্তমঠ’ নামে একটি মন্দিরে লাল রেশমি কাপড়ে মুড়ে একটি কলসে রাখা আছে। নাটোরের সাধন অনুরাগী রাজা রামকৃষ্ণ বড়নগর থেকে শক্তি সাধনার জন্য এখানে আসতেন।

তিনি যে দুটি পাথরে বসে সাধনা করতেন সেই পাথর দুটি এখনও মন্দির প্রাঙ্গনের সামনে রাখা রয়েছে। হিন্দু দেওয়ানের পরামর্শে নবাব মীরজাফর আলি মৃত্যুকালে কিরীটেশ্বরী মায়ের চরণামৃত পানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন বলেও শোনা যায়। জনশ্রুতি রয়েছে, বর্তমানে যে স্থানে গুপ্তমঠ রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে ওই স্থানে ১৭২ ঘর পাণ্ডা এবং অন্যান্য জাতি-উপজাতির বসবাস ছিল। প্রায় ৩০০ বছর আগে আফগান আক্রমণের আশঙ্কায় পান্ডারা মূল পশ্চিমমুখী মন্দির থেকে দেবীকে বর্তমান গুপ্তমঠে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু নিয়ে আসার সময় পাণ্ডারা মায়ের রুপ দেখার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করে সহমত হয়। প্রথমে জনা কয়েক পাণ্ডা মায়ের রুপ দেখেন। মায়ের রুপ দেখা মাত্রই মায়ের রুপ দর্শনকারী পাণ্ডারা অন্ধ হয়ে যান। এই ঘটনার পরেই অন্যান্য পাণ্ডারা মায়ের রুপ দর্শনে বিরত থাকেন। কিন্তু মায়ের রোষানলে পড়ে ১৭২ ঘর পান্ডা পরিবার বিনাশ হয়ে যায়। গুপ্তমঠে প্রতিদিন সকালে দেবীর নিত্যপুজো হয়। দুপুরে ভাজা, তরকারী ও মৎস্য সহযোগে অন্নভোগ হয়। মন্দিরের পুরোহিত নেপাল ভট্টাচার্য বলেন, ৩৬৫ দিন দেবীর অন্নভোগে মাছ দিতে হয়।

মাছ ছাড়া দেবীর ভোগ হয় না। দেবীর ভোগের মাছ ভক্তরা যোগান দেয়। প্রতিদিন কেউ না কেউ ভোগের আগে মন্দিরে মাছ দিয়ে যায়। কালীপুজো দিন সারা রাত ধরে মায়ের পুজো হয়। পুজো শেষে ছাগ বলি দেওয়া হয় এখানে। এছাড়াও দূর্গা পুজোর অষ্টমীর পুণ্য তিথিতে গুপ্তমঠে মায়ের মহাপুজো হয়। মহাপুজো উপলক্ষ্যে মন্দিরকে রং করার পাশাপাশি আলো দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়।

ওইদিন বহু মানুষ মানতের পুজো দিতে আসেন। মহাপুজোর দিন সকালে প্রথমে মায়ের মহাস্নান হয়। এরপরে দিনভর চলে যাগযজ্ঞ। যজ্ঞ শেষে মানতের ছাগ বলিদান দেওয়া হয়। মহাপুজো দেখতে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হয় গুপ্তমঠ প্রাঙ্গনে। মন্দিরে উপস্থিত সকলকেই মায়ের মহাপুজোর প্রসাদ দেওয়া হয়।

কিরীটেশ্বরী মহাপীঠ না উপপীঠ এই নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও কিরীটেশ্বরী হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থস্থান এই বিষয় নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। পাশের জেলা বীরভূমের তারাপীঠে তারা মায়ের দর্শনে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। কিন্তু সঠিক প্রচারের অভাবে কিরীটেশ্বরীতে সেইভাবে লোকের সমাগম হয় না। তবে পৌষ মাসের প্রতি মঙ্গলবার মূল মন্দিরের সামনের মাঠে মেলা বসে। পৌষ মাসে কিরীটেশ্বরীর মেলা দেখতে মুর্শিদাবাদ সহ পাশের জেলা মালদা, নদীয়া ও বীরভূম থেকেও প্রচুর মানুষের সমাগম হয়।

মুর্শিদাবাদ থেকে ৬ কিমি দূরে কিরীটেশ্বরী মন্দির। কিরীটেশ্বরী একান্ন পীঠের অন্যতম। এই দেবীর পূর্ব নাম ছিল কিরীটকণা। দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহ একান্ন অংশে বিভক্ত হয়ে ভারতে নানা স্থানে পতিত হয়েছিল। কিরীটেশ্বরী পীঠে সতীর কিরীটের এক কণামাত্র পড়েছিল বলে প্রবাদ আছে। মন্দিরটি পশ্চিমমুখী; মন্দিরের মধ্যে কোনও মূর্তি নেই। মূল মন্দিরটি ধ্বংস হলেও কারুকার্যময় প্রস্তর বেদিটি এখনও বর্তমান।

প্রাচীন এই বেদির উপর আরও একটি বেদি আছে এবং এটিই দেবীর কিরীটরূপে পূজিত হয়। এই পীঠস্থানের দেবী বিমলা ও ভৈরব সম্বর্ত নামে খ্যাত। কিরীটেশ্বরী ভৈরব বলে যে মূর্তি পূজিত হয় তা প্রকৃত পক্ষে একটি বুদ্ধমূর্তি। সম্ভবত কিরীটেশ্বরীর মূল মন্দিরটি পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বে নির্মিত হয়েছিল। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাধিকারী দর্পনারায়ণ এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন। এই মন্দিরের পিছনে দু’টি শিবমন্দির রাজা রাজবল্লভের প্রতিষ্ঠিত বলে কথিত।